নিজেকে উদ্ধারের জন্য বার বার আকুতি জানিয়েছেন শাহীনা। ধসে পড়া ভবনে টানা ১০০ ঘন্টা বেঁচে থাকার লড়াই করেছিলেন তিনি। উদ্ধারকর্মীদের চেষ্টা ছিল অন্তহীন। গত রবিবার রাত ৯টা থেকে টানা চেষ্টা চালিয়ে ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা নারী গার্মেন্টস শ্রমিক শাহীনাকে উদ্ধারের প্রাণপণ চেষ্টা করেছেন উদ্ধারকারীরা। অবশেষে গতকাল বিকাল ৪টা ২০মিনিটে শাহানাকে বের করে আনা হয় ধ্বংসস্তূপ থেকে। তবে ততক্ষণে শাহীনা আর জীবিত নেই। ধ্বংসস্তূপ থেকে বের করতে হলো শাহীনার মরদেহকে। সারাদেশ তোলপাড় করে ফেলা এই মর্মস্পর্শী ঘটনার অবসান ঘটে গতকাল সোমবার বিকালে। আপ্রাণ চেষ্টা করেও এই মাকে সন্তানের কাছে তুলে দিতে পারেননি উদ্ধারকর্মীরা।
শাহীনার সঙ্গে যারা কথা বলেছেন, তারা সুড়ঙ্গ থেকে বেরিয়ে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন। শাহীনাকে বাঁচাতে না পারায় চিত্কার করে কেঁদে ফেলেছেন লেফটেন্যান্ট আশরাফ ও ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি আবুল খায়ের। শাহীনা লেফেটেন্যান্ট আশরাফকে ভাই বলে সম্বোধন করেছিলেন। শাহীনাকে বাঁচানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন লেফেটেন্যান্ট আশরাফ। তার সাথে কথা বলে জানা যায়, উদ্ধার কাজের শেষ পর্যায়ে রাত সাড়ে ১০টায় ধ্বংস্তূপের নিচে আগুন ধরে গেলে মারা যায় শাহীনা। আশরাফ বলেন, ধ্বংসস্তূপের ভেতর রবিবার সকাল ৯টায় যে চারজন জীবিত মানুষের সন্ধান পাওয়া যায় তাদেরই একজন শাহীনা। সকালে চারজন জীবিত থাকলেও দুপুর ২টার মধ্যেই তাদের তিনজন নিস্তেজ হয়ে পড়েন। কিন্তু শাহীনা হাল ছাড়েননি। দাঁতে দাঁতে কামড়ে মৃত্যুর সঙ্গে যুদ্ধ করছিলেন তিনি। বারবার তাকে বলতে শোনা গেছে, ‘‘ভাই আমার জন্য নয়, আমার ঘরে দেড় বছরের সন্তান রয়েছে তার জন্য হলেও আমাকে একটু বাঁচান।’’ শাহীনার মনোবল এতোই শক্ত ছিল যে নিজেই নিজেকে বাঁচাতে পায়ের কাছে আটকে থাকা তিনটি রড কেটেছিল আমাদের দেওয়া যন্ত্রদিয়ে।’ তিনি আরো বলেন, ‘আমাদের অত্যন্ত দুর্ভাগ্য যে রড কাটার সময় আগুন লেগে সে আগুন ছড়িয়ে পড়ার কারণে আমরা তাকে উদ্ধার করতে পারিনি। কারণ আমাদের সঙ্গে ছিল অক্সিজেন। আমি নিজেও সে আগুনে আহত হয়েছি। আগুনের তাপ ছিল প্রচণ্ড। আমরা কোনো রকমে সেখান থেকে বেঁচে আসি।’
অপর দিকে এ উদ্ধারকাজে অংশগ্রহণকারী উদ্ধারকর্মী আবুল খায়ের, রব, জলিল এবং হারুন রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হয়ে এসে অনেকটাই অপ্রকৃতিস্থ হয়ে পড়েন। তারা শিশুর মতো কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত গিয়েও আমরা মেয়েটিকে বাঁচাতে পারলাম না। কত সুন্দর করে কথা বলছিল আমাদের সঙ্গে। সে নিজে তিনটা রড কেটেছে। বের হবার তার কী আকুতি। আমরা উদ্ধারের একেবারে শেষ পর্যায়ে ছিলাম। দেড় বছরের ছেলেকে চারদিন কোলে নিতে পারেনি শাহীনা, বুকের দুধও খাওয়াতে পারেনি। ছেলের জন্যই শত চেষ্টা করে ধ্বংস্তূপ থেকে বের হতে চেয়েছিলেন সংগ্রামী নারী। কিন্তু আগুন রুদ্ধ করে দেয় শাহীনার পথ, আর বের হতে পারেনি তিনি। এর মধ্যদিয়ে হারিয়ে যায় আরো একটি প্রাণ।
উদ্ধারকর্মী আবুল খায়ের বলেন, টানা ১০০ ঘণ্টা মৃত্যুর সাথে যুদ্ধ করতে করতে ক্লান্ত হয়ে পড়েন শাহীনা। দীর্ঘ পাঁচদিন পর হঠাত্ উদ্ধারকারীদের দেখা পান তিনি। কিন্তু তখনো রডের মধ্যে আটকে ছিলো শাহীনার দেহ। চিত্কার করে সে জানায়, ‘কুষ্টিয়ার মেয়ে তিনি। ঘরে আছে তার দেড় বছরের সন্তান।’ একমাত্র শিশুর ভবিষ্যত্ হয়ে গেল মায়ের মতোই অন্ধকার!
