এখন শুধু লাশের অপেক্ষা

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৫৪
রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের উদ্ধার তত্পরতার ষষ্ঠ দিন ছিল গতকাল সোমবার। এখন জীবিত উদ্ধারের সম্ভাবনা ক্ষীণ। উদ্ধারকর্মীরা গতকাল আর কোন প্রাণের স্পন্দনের খোঁজ পাননি। তারা জানিয়েছেন, ‘এখানে আর কোন জীবিত মানুষ রয়েছে, এমন আশা করা যাচ্ছে না।’ উদ্ধারকর্মীদের এ ঘোষণা শোনার পর নিখোঁজদের অনেক স্বজনই কেদে ওঠেন। এ পরিস্থিতিতে স্বজনরা এখন শুধু লাশের জন্য অপেক্ষা করছেন। অনেকেই লাশ বাড়িতে নিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে প্রস্তুতি নিয়ে ধসে পড়া ভবনের পাশে বসে রয়েছেন। এদিকে রবিবার রাত সাড়ে ১১টা থেকে ধ্বংসস্তূপ সরাতে হাইড্রোলিক ড্রিল মেশিন এবং ক্রেনসহ ভারি যন্ত্রপাতির ব্যবহার শুরু করা হয়েছে। তবে যন্ত্রের ব্যবহারের পাশাপাশি ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে জীবিতদের খোঁজ করছেন ফায়ারের উদ্ধারকর্মীরা। আধুনিক যন্ত্রপাতি দিয়ে প্রথমে ভবনের ওপরের একটি করে কংক্রিট সরানো হচ্ছে। এরপর জীবিতদের সন্ধান করতে মেশিনের মাধ্যমে ক্যামেরা পাঠিয়ে স্ক্যান করা হচ্ছে। প্রাণের স্পন্দন না পেলে পরের কংক্রিটের স্ল্যাপটি সরানো হচ্ছে। গতকাল বিকাল চারটার দিকে রানা প্লাজার সামনের দিকের অংশ বুলডোজার দিয়ে ভাঙ্গা শুরু হয়েছে। উদ্ধারকর্মীরা জানিয়েছেন, রানা প্লাজার সামনের অংশ ভালো করে খোঁজা হয়েছে। এ অংশে কোন জীবিত মানুষ নেই। গতকাল রানা প্লাজার সামনে স্বজনরা নিখোঁজদের ছবি ও ঠিকানা হাতে নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিলেন। কেউ কেউ স্বজনদের পরনের কাপড়ের নমুনা হাতে নিয়ে অপেক্ষা করছেন। লাশ যদি চেনা না যায় অন্তত কাপড় দেখে হলেও প্রিয়জনের লাশ সনাক্ত করতে হবে। এদের অনেকে টেলিভিশনে ও পত্রিকাতে খবর পেয়ে দূর দূরান্ত থেকে ঢাকায় ছুটে এসেছেন। নিখোঁজ গার্মেন্টস শ্রমিক সীমার ভাই মনিরুল, পারভীনের ভাই ইসরাফিল, রাকিবের বাবা উজ্জ্বল মিয়া, আকবরের ভাই মিরাজের সঙ্গে কথা হয়। সীমার ভাই মনিরুল ইসলাম বলেন, তাদের বাড়ি নাটোর। তার বোন সীমাকে পাঁচ মাস আগে বিয়ে দেয়া হয়েছে। ওর স্বামীও গার্মেন্টস কর্মী। অন্য গার্মেন্টসে কাজ করে। এই গার্মেন্টসে সীমার সাথে ফুফু শাশুড়ি সুর্যু বেগমও কাজ করতেন। ঘটনার দিন সুর্যু বেগমের ঠিক দুই জনের পেছনে দাঁড়িয়ে কাজ করছিলেন সীমা। ধ্বংসস্তূপের ভেতর থেকে সুর্যু বেগমকে উদ্ধার করা হয়েছে। তার আঘাত ততটা গুরুতর না। কিন্তু সীমাকে উদ্ধার করা যায়নি। ভবন ভেঙ্গে যাওয়ার পর সুর্যু বেগম তাকে দেখেনি। মনিরুল জানায়, তিনি একা নন বোনের খোঁজে রয়েছে সাত থেকে আটজন। কেউ রানা প্লাজার সামনে, কেউ হাসপাতালে কিন্তু কোনো খোঁজ পাইনি। তিনি বলেন, ‘এখন আমরা সীমার লাশের জন্য অপেক্ষা করছি।’ এ কথা বলতে বলতে তিনি কেদে ফেলেন। চতুর্থ তলায় সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছিলেন আলী আকবর। আটজনের সংসারে তিনি একমাত্র উপার্জনকারী। কোনো সন্ধান না পাওয়ায় ধ্বংসস্তূপের পাশে দাঁড়িয়ে আছেন তার ভাই মিরাজ। মিরাজ জানান, দুর্ঘটনার পর আকবরের মোবাইল ফোনে কল করা হয়। একবার ফোন বেজেছিলো। তারপর আর বাজেনি। তার সঙ্গে কোন কথাও হয়নি। ধারণা করা হচ্ছে ভাই মারা গেছে। এখন ভাইয়ের লাশের অপেক্ষায় রয়েছি। পারভীন আক্তার নামে একজন কাজ করতেন তিন তলায়। ঘটনার পর তার সাথে কাজ করা আরেকজনের সন্ধান মিললেও তার সন্ধান মিলেনি। তাকে খুঁজতে বোন পারুল ঘুরছেন ধসে পড়া ভবনের পাশে। বার বার উদ্ধারকর্মীদের কাছে গিয়ে জানার চেষ্টা করছেন। তার বোনের কোন খোঁজ আছে কিনা? স্বামী হারিয়ে নির্বাক চেয়ে আছেন শাহেরা খাতুন। স্বামী মনোয়ারুল ইসলামকে খুঁজছেন তিনি। তাই তো হাজারো বন্ধুর পথ পাড়ি দিয়ে গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ি থানার মনোহরপুর গ্রাম থেকে এসেছেন তিনি। এক বছর আগে বিয়ে করেছিলেন তারা। এখন শাহেরার একটাই চাওয়া জীবিত হোক মৃত হোক স্বামীকে যেন ফিরে পান। সাহেরা খাতুনের মতো হাজারো স্বজন অপেক্ষা করছেন গত ক’দিন ধরে। এদিকে উদ্ধার কাজের দ্বিতীয় ধাপে ভারি যন্ত্রপাতি ব্যবহারের জন্য বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর স্ট্রাকচারাল ইনজিনিয়ারিং ইউনিট, ফায়ার ব্রিগেড, রেড ক্রিসেন্ট ও কমিউনিটি ভলান্টিয়াররা অংশ নেন। এর পাশাপাশি বাইরে থেকে বিমানবাহিনী, নৌবাহিনী, পুলিশ, র্যাব, বিজিবি, স্থানীয় প্রশাসনসহ স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী এই উদ্ধার কাজে সহযোগিতা দিচ্ছেন। এ ব্যাপারে নবম পদাতিক ডিভিশনের জিওসি মেজর জেনারেল চৌধুরী হাসান সারওয়ার্দী বলেন, ধ্বংসস্তূপ সরাতে আমাদের সাবধানতা অবলম্বন করতে হচ্ছে। অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে ধ্বংসাবশেষ সরানো হচ্ছে। এরপর যদি কেউ জীবিত থাকেন, হাইড্রোলিক ক্রেনের সাহায্যে উদ্ধারকর্মীরা তাদের উদ্ধার করবেন। তিনি আরো বলেন, যেসব স্তরে প্রাণের অস্তিত্ব পাবো সেখান থেকে জীবিতদের উদ্ধারের বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ব্যবহার করবো। তবে এখন পর্যন্ত কোন প্রাণের স্পন্দনের খোঁজ পাওয়া যায়নি। তিনি বলেন, এ ধরনের উদ্ধার কাজ করতে হয় তিনটি পর্যায়ে। প্রথম পর্যায়ে জীবিতদের উদ্ধারের জন্য ‘ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে’ কাজ হয়। পরের দুটি পর্যায়ে পুরো ধ্বংসস্তূপ অপসারণ করা হয়। তাছাড়া ধসের ৫ দিন পর এই অবস্থায় এখনো ‘ম্যানুয়ালি’ কাজ চালিয়ে গেলে ভেতরে আটকে পড়াদের সঙ্গে উদ্ধারকর্মীরাও ঝুঁকির মধ্যে পড়বেন। এ পর্যায়ে ইকুইপমেন্টের ব্যবহার ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। সেনাবাহিনীর আন্ত:বাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) বেলা সাড়ে ৩টার দিকে সংবাদ সম্মেলনে জানায়, রবিবার রাত সাড়ে ১১টা থেকে এখন পর্যন্ত ৪টি লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। মোট উদ্ধার ২ হাজার ৮১৮ জন। এর মধ্যে ২ হাজার ৪৩৭ জন জীবিত এবং ৩৮১ জনকে মৃত উদ্ধার করা হয়েছে। এখন ধ্বংসস্তূপের সামনে ও পেছনে বুলডোজার এবং ক্রেন দিয়ে দেয়াল ভেঙে বের করা হচ্ছে। বেক্সিমকো ও ওরিয়ন গ্রুপের ক্রেন দিয়ে কংক্রিটের চাঁই টেনে বের করে সাভার সিটি করপোরেশন ও সেনাবাহিনীর গাড়িতে করে পার্শ্ববর্তী নদীতে ফেলা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ৯০ টন কনক্রিট সরানো হয়েছে বলে জানায় আইএসপিআর। তবে ঢাকা জেলা প্রসাশন সূত্র জানিয়েছে, ৩৮৭ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এরমধ্যে ৩৫২ জনের লাশ স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এছাড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে এ পর্যন্ত মোট জীবিত মানুষ উদ্ধারের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ২৫১৮ জনে। অবশ্য তৃতীয় দিন থেকে যারা উদ্ধার হচ্ছে তাদের অনেকের অবস্থাই গুরুতর। অনেকে হাসপাতালে মারা গেছেন। উদ্ধারকর্মীরা জানান, নিহতদের মধ্যে বেশিরভাগের লাশ ধ্বংসস্তূপের মধ্য থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। ধসে যাওয়া ওই ভবনের নিচে আরও কয়েক শ’ মানুষের মৃতদেহ আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তারা বলছেন, দিন যত বাড়বে মৃত দেহ উদ্ধারের সংখ্যা তত বাড়বে। এদিকে সাভার মডেল থানা ইন্সপেক্টর জানান, সাভারের অধর চন্দ্র বিদ্যালয় মাঠে পুলিশের কাছে স্বজনদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে তৈরি তালিকায় নিখোঁঁজ হিসাবে গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত ১ হাজার ২২৫ জনের নাম পরিচয় লেখা হয়েছে।