উদ্ধার তত্পরতা দেখতে ধ্বংসস্তূপে প্রধানমন্ত্রী

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০১৩, ২২:৫৫
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভারের ভবন ধসের ঘটনাকে জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, যখন ধসে পড়া ভবন থেকে হতাহতদের উদ্ধার, চিকিত্সা ও পুনর্বাসনের কাজ চলছে, তখনই হরতাল দেয়া হয়েছে। বিপর্যয়ের এই সময়ে হরতাল আহবান অত্যন্ত দুঃখজনক। মানবিক কারণে আগামী ২ মে’র হরতাল প্রত্যাহার করার জন্য তিনি বিরোধী দলের প্রতি আহ্বান জানান। গতকাল সোমবার সকালে সাভারে ধসে পড়া ভবন রানা প্লাজার ধ্বংসস্তূপের উদ্ধার তত্পরতা সরেজমিন পরিদর্শন, এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও সাভারের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ভবন ধসে আহতদের শয্যাপাশে গিয়ে তাদের খোঁজ-খবর নেয়ার পর বিমর্ষ প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বিরোধী দলের উদ্দেশ্যে বলেন, কেন এই হরতাল দেয়া হলো, কার উপকারের জন্য? হরতালের পেছনে যে টাকা খরচ করবেন তা যদি অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করা হয় তাহলেও কাজে লাগবে। এ সময় ভবন ধসে আহতদের চিকিত্সায় সব ধরনের সহায়তার পাশাপাশি সুস্থ হলে তাদের চাকরির ব্যবস্থা করারও আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, সাভার ভবন ধসে হতাহতের ঘটনার সঙ্গে যারা জড়িত ছিল তাদের ইতিমধ্যে গ্রেফতার করা হয়েছে। রানা প্লাজার মালিক সোহেল রানাকে গ্রেফতারের জন্যে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আমি নিজেই নির্দেশ দিয়েছিলাম। সে যাতে বিদেশে পালিয়ে যেতে না পারে সে জন্য সজাগ থাকার নির্দেশ দেয়া হয়। এমনকি ভারতে পালিয়ে গেলেও তাকে ফিরিয়ে আনার ব্যবস্থা নেয়া হতো। বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময়ে এই সাভারে স্পেকট্রাম ভবন ধসের ঘটনায় অনেক গামেন্টর্স শ্রমিক হতাহত হয়। কিন্তু তখন কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। এছাড়া বিগত সেনাসমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে র্যাংগস ভবন ধসে অনেক শ্রমিকের মৃত্যু হয়। নিহত কিছু শ্রমিকের লাশও ঝুলে ছিল। তখন তো কেউ কোন কথা বলেনি। উদ্ধার তত্পরতার চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সোমবার সকাল পর্যন্ত ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপ থেকে দুই হাজার ৮১১ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত হয়েছেন ৩৮১ জন। তিনি বলেন, যে যেখানে ছিল-সবাইকে উদ্ধার কাজে লাগানো হয়। কেউ এক সেকেন্ড সময়ও নষ্ট করেনি। এতো বড় ভবন ধ্বংস হলো, এতো লোক উদ্ধার পৃথিবীর ইতিহাসে নেই। যারা ভবন ধসের পর সর্বাত্মক সহযোগিতা দিয়ে গেছেন তাদের সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, অনেকেই সাহায্য পাঠিয়েছেন। সকলেই আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে। এটা অভূতপূর্ব ঘটনা। আর বাঙালি বলেই আমাদের পক্ষে এটা সম্ভব হয়েছে। রানা প্লাজার মতো ঘটনা যেন আর না ঘটে সেজন্য সরকারের পক্ষ থেকে কোনো উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে কিনা সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আইন ও প্রস্তুতি সবই আছে। দুর্ঘটনা কেন ঘটল? সাভার সিএমএইচে আহতদের দেখে বেরিয়ে আসার সময় প্রধানমন্ত্রী সাংবাদিকদের আরো বলেন, ভবনে ফাটল ধরেছে জানার পরও কেন কর্মীদের সেখানে কাজে পাঠানো হলো? এটা একটা গর্হিত কাজ। ওই ঘটনায় দায়ী কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। রানা প্লাজা নির্মাণে অনিয়মের বিষয় তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০০৪ সালে ৬ তলা ভবনের অনুমতি নিলেও ২০০৬ সালে রানা প্লাজার ওপর আরো চারতলা উঠানো হয়। স্থানীয় পৌরসভা কেন এই অনুমতি দিল? প্রধানমন্ত্রী বলেন, গার্মেন্টস নেতৃবৃন্দ আমার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। আমি তাদের বলেছিলাম, আমি ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত মালিকদের ধরব। সাভার এবং এর আশপাশের এলাকাকে ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা হিসেবে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, মৃদু ভূকম্পন হলেই দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। আর তাই প্রতিটি দালানের কাঠামো এবং গ্যাস, পানি ও বিদ্যুত্ সংযোগ পরীক্ষা করা উচিত। যথাযথভাবে বিল্ডিং কোড মেনে দালান তৈরি করার পরামর্শ দেন তিনি। গতকাল হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আহত প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে দেন প্রধানমন্ত্রী। এর আগে নিহতদের লাশ পরিবহনের জন্য ২০ হাজার করে এবং আহত প্রত্যেককে পাঁচ হাজার করে টাকা দেয়া হয়েছে বলে প্রধানমন্ত্রী জানান। তিনি বলেন, রানা প্লাজা ধসে যারা চাকরি হারিয়েছেন, তাদের মধ্যে এক হাজার শ্রমিককে কাজ দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন চামড়া শিল্পের কারখানা মালিকরা। একজনও চাকরিহারা হবে না। গার্মেন্টস মালিকরা আমাকে বলেছে, এই শ্রমিকদের তাদের কারখানায় ভাগ করে কাজ দেবে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, ভবন ধসে যারা পঙ্গু হয়েছেন, সরকারের পক্ষ থেকে তাদের কৃত্রিম হাত-পা সংযোজনের ব্যবস্থা করা হবে। এছাড়া পারিবারিক সঞ্চয়পত্রের মাধ্যমে তাদের সহায়তা দেয়া হবে বলে প্রধানমন্ত্রী প্রতিশ্রুতি দেন। গতকাল সকালে প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে সড়ক পথে সাভারের উদ্দেশ্যে রওনা হন। সাভার পৌঁছে তিনি প্রথমে এনাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিত্সাধীন ভবন ধসে আহতদের দেখতে যান। এই হাসপাতালে চিকিত্সাধীন আছেন ১২৩ জন শ্রমিক। এরমধ্যে আহতদের শয্যা পাশে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী তাদের চিকিত্সার খোঁজ-খবর নেন। এসময় চিকিত্সকদের সাথেও কথা বলেন। শেখ হাসিনা হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে ঘুরে ঘুরে আহতদের সঙ্গে কথা বলেন এবং তাদের সান্ব্তনা দেন। আহতদের তিনি পোশাক সামগ্রী দেন। প্রধানমন্ত্রী চিকিত্সকদের কাছ থেকে সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে জানতে চান এবং সর্বোচ্চ সেবা দেয়ার নির্দেশ দেন। আহতদের চিকিত্সায় সরকারের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতার আশ্বাস দেন প্রধানমন্ত্রী। এসময় স্বাস্থ্যমন্ত্রী আ ফ ম রুহুল হক, ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী এ এইচ মাহমুদ আলী, স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু, স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবীর নানক, সেনাবাহিনী প্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভুঁইয়াসহ বিভিন্ন উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তা প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন। এরপর প্রধানমন্ত্রী রানা প্লাজার সামনে ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের উপর দাঁড়িয়ে উদ্ধার তত্পরতা পর্যবেক্ষণ করেন। এসময় সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা প্রধানমন্ত্রীকে উদ্ধার তত্পরতার সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেন। সেনাবাহিনীর নবম পদাতিক ডিভিশনের অধিনায়ক মেজর জেনারেল চৌধুরী হাসান সোহরাওয়ার্দী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে উদ্ধার অভিযানের দায়িত্বে থাকা সেনা ও ফায়ার ব্রিগেড কর্মকর্তাদের পরিচয় করিয়ে দেন। প্রধানমন্ত্রী উদ্ধার অভিযানের আলোকচিত্র দেখেন। পরে প্রধানমন্ত্রী উদ্ধার তত্পরতা সম্পৃক্ত সকলকে ধন্যবাদ জানান। পরে প্রধানমন্ত্রী সাভারের সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) ভবন ধসে আহতদের দেখতে যান। সেখানে আহত ১০৭ জনের চিকিত্সা চলছে। প্রধানমন্ত্রী আহতদের সাথে কথা বলেন এবং তাদের চিকিত্সার খোঁজ-খবর নেন। হাসপাতালের বাইরে অপেক্ষমাণ ভবন ধসে হতাহত ও নিখোঁজ শ্রমিকদের আত্মীয়-স্বজনদের সাথেও কথা বলেন তিনি। প্রধানমন্ত্রীকে কাছে পেয়ে তাদের অনেকেই আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি তাদের ধৈর্য্য ধারণের পরামর্শ দেন।