আমার কথা

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:১৩
আমার গ্রাম সিরাজগঞ্জ জেলার শাহজাদপুর থানার রতনকান্দি। বাবার সরকারি চাকরির (পুলিশের কোর্ট ইন্সপেক্টর) সুবাদে বাংলাদেশের নানান শহরে (দিনাজপুর, কুড়িগ্রাম, খুলনা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া) আমার শিশুকাল কেটেছে। ১৯৫২ সালে বাবার অকাল মৃত্যুতে আমাদেরকে নানা তাঁর বাড়ি পাবনা জেলার বেড়া থানায় বনগ্রামে নিয়ে আসেন। নানার গ্রামটি ছিল হিন্দুপ্রধান। এই গ্রাম বারো মাসে তেরো পার্বণে গান-বাজনায় আর দশটি গাঁয়ের চেয়ে একটু বেশি যেন এগিয়ে ছিল। প্রতিদিনই প্রায় যাত্রা, গান, পালা, কীর্তনের উত্সব হতো এ গাঁয়ে। এর সঙ্গে পাল্লা দিত মুসলমানদের দু-চার ঘর— ঈদ, মোহররম, বিয়ে, জন্মদিন, মুসলমানি, ধানবোনা-ধানকাটা মৌসুমে জারি, সারি, ফকিরান্দি, মারফতি, মুর্শিদি, মাদারের গান, কবিগান, কেচ্ছা-কাহিনি, লাঠিখেলা নানান আয়োজন। রকমারি সুরে, হাজারও তাল-ছন্দে এসব গান গাওয়া হতো কখনো একক কণ্ঠে, কখনো কোরাস করে। বড়ো মামা গান শুনতে পছন্দ করতেন। আমি বায়না ধরলে মামা আমাকেও সঙ্গে নিয়ে যেতেন। নানাবাড়িতে চলে আসায় পুরনো বন্ধুদের পেয়ে আমার সুবিধাই হলো। বিশেষ করে কুদ্দুসকে পেয়ে। কুদ্দুসও আমার মতো— সেও তার বাবা মারা যাওয়ায় তার মায়ের সঙ্গে নানাবাড়িতে। কুদ্দুসেরও নানাবাড়ি, আমারও নানাবাড়ি— তাই পাড়া-প্রতিবেশী-বৃদ্ধরা আমাদের নানা আর তাঁদের ছেলেমেয়েরা মামা ও খালা। একদিন কুদ্দুস বলল— চল্ ডাক্তার নানার বাড়ি যাই। ওই বাড়িতে পত্র-পত্রিকা, গল্প-কবিতার অনেক বই আছে। গিয়ে দেখি ওটা কেরানি স্যার অর্থাত্ বাতেন স্যারের বাড়ি। এ বাড়িতে আমি আগেও এসেছি। বাতেন স্যারকে কুদ্দুস মামা আর তাঁর বাবাকে নানা বলায় আমিও তাঁদেরকে মামা-নানা বলতে থাকলাম। আমাদের পত্রিকা পড়ার আগ্রহ দেখে বাতেন মামা শুক্রবারের সংবাদ বের করে বললেন— এই দেখ প্রতি সপ্তাহে খেলাঘরের পাতা ছাপা হয়। পাতাটি শুধুমাত্র তোমাদের মতো ছোটোদের জন্য। আমার নানাও বইপত্র-পত্রিকা পড়তে পছন্দ করতেন। আমি তাঁর সংগ্রহ থেকে মাসিক সন্দেশ, মাসিক শুকতারা, মাসিক ভারতবর্ষ, মাসিক প্রবাসী, রবীন্দ্রনাথের নৌকাডুবি, মীর মশাররফ হোসেনের বিষাদ সিন্ধু ও নজিবুর রহমানের আনোয়ারা পড়েছি। ইতোমধ্যে স্কুল থেকে ঠাকুরমার ঝুলি, রবীন্দ্রনাথের ছেলেবেলা পড়া হয়ে গেছে। বাতেন মামার বাড়ি থেকে শরত্চন্দ্রের রামের সুমতি ও পরিণীতা এনে পড়ে ফেলেছি। নজরুল, সুকান্ত ও যাযাবরের বই আমাকে বিশেষভাবে আন্দোলিত ও অনুপ্রাণিত করেছে। তাছাড়া দস্যু মোহন সিরিজের বইগুলো, ডিটেকটিভ বিষয়ে আমার বিশেষ দুর্বলতা ছিল। এই বইগুলো আমার কল্পনাশক্তিকে দারুণভাবে সমৃদ্ধ করেছে। আমাদের বেড়া বিপিন বিহারী উচ্চ বিদ্যালয়ে একটি সুস্থ সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল ছিল। প্রতিবছর বিদ্যালয়ের বার্ষিক পুরস্কার বিতরণী সভা উপলক্ষে সপ্তাহব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হতো। এ অনুষ্ঠানকে সামনে রেখে মাসাধিক কাল ধরে মহড়া চলত। ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে, শিক্ষকদের মধ্যে কবিতা, গান, নাটক, কৌতুক নিয়ে সে কী উত্সাহ-উদ্দীপনা! বিদ্যালয়ে আমরা চার বন্ধু ছিলাম— মদন মোহন দাস ছিল গায়ক। গোলাম সারোয়ার ছিল কৌতুক শিল্পী এবং ছবি আঁঁকিয়ে। আবদুল কুদ্দুস ক্লাসে প্রথম হতো এবং ভালো কবিতা আবৃত্তি করতে পারত। নবম শ্রেণিতে নতুন পোস্টমাস্টারের ছেলে শ্যামা প্রসাদ দে আমাদের ক্লাসে এসে ভর্তি হলো। সে একদিন করাচি থেকে প্রকাশিত ‘দিগন্ত’ নামে একটি পত্রিকা এনে দেখাল, তাতে তার একটি কবিতা ছাপা হয়েছে। ছাপা অক্ষরে ওর নাম দেখে আমি খুব আশ্চর্য হয়ে যাই। ওকে জিজ্ঞেস করি— কেমন করে ছাপা হলো রে? ও বলল— কেমন করে আবার? পত্রিকার ঠিকানায় লেখা পাঠিয়ে দেই। তখন আমার মনে ভাবনা এল— আমিও তো ছড়া-কবিতা লিখি। পত্রিকায় পাঠিয়ে দেই না কেন? তার পর দৈনিক ইত্তেফাকের কচি-কাঁচার আসরে, দৈনিক সংবাদের খেলাঘর পাতায়, মাসিক আলাপনীতে, মাসিক দিগন্তে লেখা পাঠিয়ে দিয়ে অপেক্ষা করতে থাকলাম। প্রায় মাসখানেক পর এক শুক্রবারে কচি-কাঁচার আসরে আমার লেখা ছড়া ‘খোকার বাহাদুরী’ দেখলাম ছাপা হয়েছে। তারিখটি ছিল ১৩৬৫ বঙ্গাব্দের ৯ শ্রাবণ। সেদিনকার কথা ভাবলে আজো রোমাঞ্চ অনুভব করি। তবে আমার প্রথম লেখা ছড়া— “এক যে ছিল বুড়ি,/ বয়স তার পাঁচ কুড়ি!/ চুলগুলো সব পাকা,/ কপালে তিলক আঁকা!” —ছাপা হয় তার বেশ কয়েক মাস পর আরেক শুক্রবার ২৯ ফাল্গুন দৈনিক সংবাদের খেলাঘর পাতায়। এর পর খেলাঘরের পরিচালক শিশুসাহিত্যিক আল কামাল আবদুল ওহাব আমাকে উত্সাহিত করে ব্যক্তিগতভাবে একটি চিঠি লেখেন। যে চিঠিটি আমাকে লেখালিখির জগতে থাকতে আত্মবিশ্বাসী করে। আমি আজ যা কিছু হয়েছি তা আমার মা ও নানিমার জন্যেই। তাঁদের উত্সাহ-প্রেরণা ও প্রশ্রয় না পেলে আমি যে আমি হতাম না তা হলফ করে বলতে পারি। দৈনিক ইত্তেফাকে লেখা ছাপা হওয়ার পরে মা আমাকে তাঁর তোরঙ ঘেঁটে একটা খাতা এনে আমার হাতে দিলেন এবং বললেন তোর আব্বাও কবিতা লিখতেন। কবির ছেলে কবি তো হবিই। দেখলাম খাতার মলাটে লেখা— চিন্তাবলী, নিচে মহম্মদ খোদা বক্স। মার কথায় এবং আব্বার খাতা পেয়ে সেদিন আমি কী যে অনুপ্রেরণা পেয়েছিলাম তা প্রকাশ করার ভাষা আমার জানা নেই। ছোটদের জন্য আমার প্রকাশিত বইগুলোর নাম— ছড়া: আড়ি, টুনটুনি, জয় মুক্তিযুদ্ধ, নটে গাছটি মুড়লো, জয় ছড়ার জয়, ছড়াকলাকার; কবিতা: জাগল বাঙালি জাগল, আড়ং; গান: ফুলপাখিদের গান; নাটক: মিতাভাইয়ের আসর, নাটক নাটক; গল্প: রবীন্দ্র নজরুল বঙ্গবন্ধু জয়নুল, রয়েল বেঙ্গল।