পঙ্খিরাজের ঘোড়া

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:১৩
বাঁশির ভোঁ ভোঁ, ডুগডুগির ডুগডুগ শব্দ আর বাচ্চাদের বিরক্তকর হৈ-হুল্লোড় সকালের ঘুমটা হঠাত্ ভেঙে গেল শফিকের। এই এখানে কে রে এমন করছে? জোরে হাঁক ছাড়তেই মাসুম বলল- চাচ্চু মীম ডুগডুগি বাজায়। মীম এর প্রতিবাদ করে বলে- না চাচ্চু আমি না, মাসুম বাঁশি বাজায়। হঠাত্ একটি কঠিন নারী কণ্ঠ, এই তোমাদের না বল্লাম মাঠে গিয়ে খেলতে। ঢাকা থেকে অনেক রাতে এসে তোমাদের চাচ্চু এখন ঘুমাচ্ছে। বলল ওদের চাচী। না, আর বিছানায় থাকা গেলো না। দরজা খুলতেই একরাশ ঝলমলে রোদ সাথে বাচ্চারা ঢুকে গেল চাচ্চুর রুমে। এই যে দ্যাখ সব ক’টা ময়লা পায়ে...। চাচী চেঁচিয়ে উঠে। শফিক সাহেব থামিয়ে দিয়ে বলে— আহা থাক না, বাচ্চা মানুষ ওরা কী এত সব বুঝে? তারপর চাচীর অভিযোগ- আমি দেখেছি তুমি বাচ্চাদেরকে প্রয়োজনীয় ধমকটি পর্যন্ত দাও না। এভাবে প্রশ্রয় দিতে থাকলে একদিন ওরা তোমার কাঁধে বসে ডুগডুগি বাজাবে। শফিক তার স্ত্রীর অভিযোগ অস্বীকার করার দুঃসাহস দেখায় না বরং মৃদু হেসে হালকা কেশে সায় দেয়- তুমি ঠিক বলেছ কিন্তু এতে দোষের কি আছে। তারপর ওদেরকে নিয়ে সিঁড়িতে বসতে বসতে বলে- আমি যদি ওদেরকে ধমক দেই আর মারের ভয় দেখাই তাহলে ওরা আমার কাছে আসবে না। তো আমি আমার স্বপ্নের বীজ কোথায় রুইব? আমাদের উচিত ওদেরকে কাছে টেনে নতুন সুন্দর পৃথিবীর স্বপ্ন দেখানো। ‘ঠিক আছে তুমি তোমার স্বপ্নের পৃথিবী নিয়ে থাক, আমি রান্নাঘরে গেলাম’। এই বলে চলে গেলেন ঝর্ণা বেগম। বাবা হওয়ার মতো আনন্দ বুঝি পৃথিবীতে আর দ্বিতীয়টি নেই। সাতদিন হলো। একটি ভালো নাম রাখতে হবে। তাই নরম তোয়ালে পেঁচিয়ে স্বামীর কোলে দিয়ে বলল- এই নাও তোমার ছেলে। এবার তোমার নামের সাথে মিলিয়ে একটি ভাল নাম রাখো। নরম তুলতুলে গা। শফিক আহমেদ ছেলেকে কোলে নিয়ে একটু নড়েও না, চুমোটি পর্যন্ত দেয় না যদি ব্যথা পায়। তাই অনেকটা মোলায়েম কণ্ঠে স্ত্রীকে বলল- না না তোমার ছেলে তোমার নামের সাথেই মিলিয়ে নাম রাখব। সাগর যত বড় হচ্ছে তত বাড়ছে দুরন্তপনা। দেড়বছরে হাঁটতে, দুই বছরে কথা বলতে শুরু করল। শুক্রবার ছুটির দিন। হঠাত্ ফজরের আযান শুনেই ঘরের বাইরে আসার ফন্দি আঁটে সাগর। ওর মা অনেক কায়দা-কানুন করে লেপ মুড়ি দিয়ে বুকের সাথে জড়িয়ে রাখে। অমনি ও জুড়ে দেয় কান্না। সাগরের বাবা নামাজ পড়তে মসজিদে যাওয়ার আগে বলে আহা! ছেড়ে দাও জামা-জুতা পরিয়ে, দেখি ও কোথায় যায় এত সকালে। ‘বাইরে খুব কুয়াশা, এমনিতেই গলার গড়গড় শব্দ নাকের পানি কমে না। যাও তুমি তাড়াতাড়ি এসো। অনেকটা কঠিন গলায় বলল সাগরের মা। সাগরের বয়স এখন তিন বছর। তাকে একটা মুহূর্ত ঘরে রাখা যায় না। সারাদিন বাইরে টো টো করে ঘুরে বেড়াবে, খেলবে। এই উঠানে তো একটু পরে স্কুলের মাঠে। মাঠে খুঁজতে গেলে সেখানেও নেই। লোকজন বলে- হ্যাঁ একটু আগে এখানেই তো দেখেছি। সাগরের দাদী ও মা দু’জনেই তন্ন তন্ন করে এখানে-ওখানে হন্যে হয়ে খুঁজে। কিন্তু পায় না। পরে অনেক খোঁজার পর এসে দেখে, আরো তিনজন সমবয়সী বাচ্চাদের সাথে বড় রাস্তার পাশে বসে খেলছে। পাশ দিয়ে ছুটে যাচ্ছে দৈত্য-দানবের মত কত বাস-ট্রাক। বিষয়টি ভাবতেই দাদী ও মায়ের বুকটা কেমন কেঁপে উঠে। যাক আল্লাহ রক্ষা করেছে। দাদী ওর ছায়া হয়ে থাকে সবসময়। সাগরের মার অভিযোগের শেষ নেই। আর সব অভিযোগ সাগরের বাবার কাছে। হাতের কাছে যা পাবে সব ছুঁড়ে মারবে খালে, নয়তো পুকুরে। ওর দাদা পাশে থাকলে সাথে সাথে নেমে যাবে পানিতে। দাদাভাইকে পানিতে নামিয়ে সে যেন আরো বেশি খুশি। গতকাল পানির গ্লাস ভেঙেছে তো আজ শোকেসের গ্লাস ভেঙেছে। সকালে মাসুমকে মেরেছে তো বিকালে মীমকে ধাক্কা দিয়েছে; এতটুকুন ছেলে এত দুষ্টু! বয়সে ওর চেয়ে বড় তারপরেও কত সাহস। সাগর ছোট বলে মাসুম মীম তেমন কিছু বলে না। শুধু চাচীর কাছে এসে বিচার দেয়। সাগরের মা অসহ্য হয়ে মাঝে মাঝে সাগরের বাবাকে ফোনে বলে—তোমার ছেলেকে তুমি ঢাকায় নিয়ে যাও। এবার আসলে দিয়ে দেব সাথে। শফিক ছুটি পেলেই যায় গ্রামের বাড়ি। ছেলেকে নিয়ে মেতে উঠে দুষ্টুমিতে। স্ত্রীকে থামিয়ে দিয়ে বলে- দুষ্টুমি করলে আমার ছেলে আর যখন টুইংকল ছড়াটি মুখস্থ শুনিয়ে দিবে বাড়িতে আসা কোন অতিথিকে কিংবা গ্লাসের পুরো দুধটুকু খেয়ে নিবে এক নিমিষে তখন সে তোমার শান্ত সুবোধ ছেলে। সাগরের মা এবার কবিতার মতো বলে ‘সাগর যখন শান্ত তখন আমার ছেলে আর যখন অশান্ত তখন তোমার।’ সাগরের বাবা আস্তে করে শুধু বলে-ও আচ্ছা ওতো ঝর্ণার ছেলে সাগর। তাতেই সাগরের মা ছেলের সব অভিযোগ ভুলে গিয়ে ফিক করে হেসে উঠে। তিন বছরে ছেলেটি বাবার হাত ধরে যখন হাঁটে; হাঁটার কিছুক্ষণ পরেই কোলে উঠতে চায়। কোলে নিয়ে কিছুক্ষণ ঘোরার পর কাঁধে চড়তে চায়। কাঁধে চড়িয়ে বাবা যখন বলে, কাঁঠাল রাখবেন নি গো... কাঁঠাল। ও খুশিতে বাবার সাথে সুর মিলায়। এই খেলাটি শেষ হলে বাবার দু’কাঁধে দু’পা রেখে হাতে হাত চেপে ধরে সোজা দাঁড়িয়ে যায়। আশেপাশে সবাইকে ডেকে বলে- এই যে দেখ আমি সবার চেয়ে বড়। পঙ্খিরাজে চড়েছি। তারপর বাবা ওকে স্বপ্ন দেখায় বড় হতে, সাগরের মত বিশাল হতে। সাগর কতটুকু বুঝল কি জানি, তবে সাগরের মাকে ডেকে বলে- দেখেছ ওরা কাঁধে চড়ে শুধু ডুগডুগিই বাজায় না, বড় হওয়ার স্বপ্নও দেখে। সাথে সাথে সাগরের মা গর্ব করে বলে- দেখতে হবে না ছেলেটা কার?