ক্যাম্পাসে র্যাগ ডে

বিদায় বেলা রঙের মেলা

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০১৩, ১৯:২০
ধবধবে সাদা টি-শার্ট। কাছের মানুষগুলোর লেখায় ভরে গেছে। লেখালেখির লগ্ন এসেছে আজ। কেউ একজন লিখেছে, ‘তোর জন্য একটা ছেলে আজও ভীষণ একা’। বিদায় বেলা সেটা দেখে একা থাকার আর কি উপায় আছে! এই হচ্ছে র্যাগ ডে। আনন্দ আর ভালোলাগার র্যাগ ডে নিয়েই আমাদের এবারের আয়োজন। নাজমুল করিম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করার আগে আগে যখন বাঁধভাঙ্গা আনন্দের র্যাগ ডে পালন করেছিলাম মনে হচ্ছিল এর থেকে আনন্দের দিন আর বুঝি নেই। পরে শেষ ক্লাসের দিন হায়রে কান্নাকাটি। যদিও ছেলেদের চোখে পানি কম দেখা যায়। তাই আরো ভালো করে বুঝা যাচ্ছিল কি হারাচ্ছি। পরের বছর আবার র্যাগ ডে আসে। জুনিয়রদের জন্য সেই হাসি-কান্না মাখা দিন! তবে যেতে পারিনি তাদের আনন্দ দেখতে। তাদের রংমাখা কিম্ভুতকিমাকার মুখের হাসি দেখতে। তাদের জন্য শুভকামনা। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মো. আরিফ হোসেন বলেন, ‘বিদায় শব্দটি শুনলেই কেমন যেন মনটি থমকে ওঠে। মনে হয় বুঝি জীবনের সব স্বাদ-আহ্লাদ ছেড়ে চিরকালের মতো পৃথিবী থেকে চলে যাচ্ছি। কিন্তু এটি সে বিদায় নয়। আনন্দ বেদনায় সবাই একসঙ্গে ছিলাম। সবসময় একজনের সুখ-দুঃখকে আমরা সবাই ভাগ করে নিয়েছি। নিজেকে খুব একা মনে হচ্ছিল। মনে হচ্ছিল আমরা সবাই একে অন্যকে ছেড়ে অনেক দূরে চলে যাচ্ছি।’ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা নাজমা ইসলাম মনি বলেন, ‘র্যাগ ডে’র আগেরদিন আমাদের চোখে ঘুম নেই। খাওয়া-দাওয়ারও ঠিক নেই। ঠিক নেই ক্লাসের সময়েরও। শুধু মিটিং আর আলোচনা কীভাবে আরও বেশি জমজমাট করা যায়। অন্য সব বছর থেকে বেশি মজা করা যায়।’ একই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা অজিত কুমার বলেন, ‘র্যাগ ডে’র আগের এক সপ্তাহ তো তাদের কেটেছে উত্তেজনায়। মেয়েদের কী কম চিন্তা! সবার এক রঙের শাড়ি। তার সঙ্গে সব কিছু মিল করে কত কী যে কিনতে হবে! কত মজাই না করবেন তারা বন্ধুদের সঙ্গে। দেখতে দেখতে কেমন করে চার-চারটি বছর পার করে দিলেন তারা। ভাবতেই অবাক লাগে! জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের রাকিবা সুলতানা রত্না বলেন, ‘পুরো বিশ্ববিদ্যালয় যেন সেজেছিল উত্সবের আনন্দে। পাঁচদিন আগে থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আনাচে-কানাচে আলো জ্বল-জ্বল করছে। র্যাগ ডে’র আগের রাত থেকেই ছাত্রছাত্রীরা মেতে উঠেছিলেন আমোদে। রাতে আলোকসজ্জা দেখার জন্য বেরিয়েছেন অনেকে।’ তিনি আরও বলেন, ‘অদ্ভুত সাজে বড় বড় রঙ-বেরঙের প্ল্যাকার্ড, মুখোশ নিয়ে সাতটি ট্রাক আর তিনটি বাস চলেছে শহরের ভেতর দিয়ে। চলেছে হই-হই শব্দে। শোভাযাত্রায় লাল, বাসন্তী, কমলা, সবুজ রঙের আটপৌরে শাড়ি পরেছেন ছাত্রীরা।’ র্যাগ ডে’র কথা বলতে গিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের মুক্তা বলেন, ‘ক্যাম্পাসে এসে গাড়ি থেকে নামতেই কোত্থেকে একদল ছুটে এসে রাঙিয়ে দিলেন সবাইকে। শুরু হয়ে গেল রঙের খেলা। কে কার গায়ে কত রঙ দিতে পারেন! কিছুক্ষণ পর চেহারাই বদলে গেল সবার। এই ছিলো আমাদের র্যাগ ডে।’ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মিরাজ বলেন, ‘সন্ধ্যায় মেতে ওঠে আরেকবার ক্যাম্পাস। গানের দোলায় মাতোয়ারা হলো পুরো বিশ্ববিদ্যালয়। নাচে আর গানে মাতাল হলো কনসার্ট।’ খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করা তারিকুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে প্রস্তুতি নেয়া র্যাগ ডে’র বিশাল আয়োজন দু’দিনে শেষ হয়। কিন্তু স্বপ্নের দূতদের নিয়ে যায় সুদূরের দিকে। স্বপ্নোজ্জ্বল ভবিষ্যত্ হাতছানি দিয়ে ডাকে। সাঙ্গ হলো ছাত্রজীবনের এই চিরচেনা পরিবেশ।’ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অনামিকা কর্মকার বলেন, ‘ক্লাস শেষ হয়েছে কিছুদিন আগেই। যখন প্রথম বর্ষে পড়ি তখন ভাবতাম কখন যে শেষ হবে সকালে ক্লাসে যাওয়া। তিনঘন্টা দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ল্যাব করা। আর এখন মনে হচ্ছে সেই সময়গুলো কত রঙিন ছিল।’ এখন যখন গভীর রাতে হাঁটতে হাঁটতে চা খেতে যাই বন্ধুদের সঙ্গে, ভবিষ্যতের আমি হয়ে সেই হেঁটে যাওয়ার রাস্তাটা কল্পনা করার চেষ্টা করি। আর ঝাপসা হয়ে উঠে সব। দিন দিন ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে এই মুহূর্তগুলো। এখন ঘুমাতে গেলে এইসব স্মৃতি ওলট-পালট খায় মাথায়।