হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশ হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছে, তাদের ১৩ দফা দাবি মানতে প্রয়োজনে শত শত বার সংবিধান সংশোধন করতে হবে। অন্যথায় ৫ মে’র পর এ সরকার ক্ষমতায় থাকবে না বলে সতর্ক করে দিয়েছেন হেফাজত নেতারা। গতকাল মঙ্গলবার বগুড়া, টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ, নেত্রকোনায় অনুষ্ঠিত হেফাজতের মহাসমাবেশ থেকে এ হুঁশিয়ারি দেয়া হয়। এছাড়া রাজধানী ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে সংগঠনটি।
বগুড়া প্রতিনিধি জিএম সজল জানান, বগুড়ায় হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশে নেতারা বলেছেন, ১৩ দফার বাস্তবায়ন ছাড়া আর কোন দাবি নেই। প্রয়োজনে ১৫’শ বার সংবিধান সংশোধন করে হলেও এসব দাবি মানতে হবে। দাবি না মানলে ৫ মে’র পর এ সরকারের পতন হবে। গতকাল মঙ্গলবার বগুড়ার ঐতিহাসিক কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে অনুষ্ঠিত এ সমাবেশ থেকে হেফাজত নেতারা বলেন, দাবি না মেনে সরকার ৫ মে’র পর কিছুতেই ক্ষমতায় থাকতে পারবে না। মহাসম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে হেফাজতে ইসলামের আমীর আল্লামা শাহ আহমদ শফি বলেন, হেফাজতের ১৩ দফা মানতে হবে। আমরা আমাদের ঈমান ও ইসলামের হেফাজতের জন্য হেফাজতে ইসলাম প্রতিষ্ঠা করেছি। তিনি বলেন, সরকার বিভিন্ন মাধ্যমে আমাদের সাথে আলোচনা করছে। আমরা বলেছি, ১৩ দফা বাস্তবায়নের ঘোষণা দিতে হবে। ঘোষণা না দিলে কোন আলোচনা হবে না।
হেফাজতে ইসলামের কেন্দ্রীয় নায়েবে আমির ও ঢাকা মহানগরীর আহ্বায়ক আল্লামা নূর হোসাইন কাসেমি বলেন, ১৩ দফা তৌহিদী জনতার দাবি। নায়েবে আমির মুফতি ইজহারুল ইসলাম বলেন, সরকারের মন্ত্রীরা আল্লামা শফির সাথে বেয়াদবি করেছেন। কেন্দ্রীয় মহাসচিব জুনাইদ বাবু নগরী বলেন, এ সরকার যদি হেফাজতকে ঠেকাতে নারী সমাজকে রাজপথে নামায় তাহলে সরকার ধসে যাবে। তিনি বলেন ডা. ইমরান নাকি বলেছেন তিনি হেফাজত কর্মীদের রক্ত দিয়ে শাহবাগ ধুয়ে দেবেন। আমরা বলতে চাই, হেফাজত কর্মীরাই নাস্তিকদের রক্তে বাংলার জমিন লাল করে ফেলবে। মদিনা সনদের বাস্তবায়নের ঘোষণা দেয়ায় প্রধানমন্ত্রীর উদ্দেশে তিনি বলেন, মদিনা সনদ বাস্তবায়ন করতে হলে সবার আগে আপনি ক্ষমতা ছাড়ুন। আর সরকারের চোর মন্ত্রীদের সবার হাত কাটতে হবে। তিনি বলেন, হেফাজত নয়, আগামী ৫ মে অবরোধে সরকারই লেজ গুটিয়ে পালাতে বাধ্য হবে।
এর আগে বগুড়াসহ উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার কওমী মাদরাসার শিক্ষক ও ছাত্ররা দলে দলে যোগ দেন সমাবেশে। তারা হাতে তসবিহ, জায়নামাজ নিয়ে যিকির এবং মিছিল সহকারে নারায়ে তাকবির-আল্লাহু আকবার ধ্বনি দিয়ে প্রকম্পিত করে তোলেন পুরো শহর।
মহাসম্মেলনের প্রধান অতিথি আল্লামা শাহ আহমদ শফি বেলা ৩টা ৫ মিনিটে হেলিকপ্টারযোগে চট্টগ্রাম থেকে বগুড়ায় আসেন। শহরতলীর সুলতানগঞ্জ হাইস্কুল মাঠে হেলিকপ্টার থেকে নামার পর তাকে স্বাগত জানান হেফাজত ও কওমী মাদরাসা বোর্ডের নেতৃবৃন্দ। এরপর তাকে মোটর সাইকেল ও গাড়ীর শোভাযাত্রাসহ বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী জামিল মাদরাসায় নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে কিছুক্ষণ বিশ্রাম গ্রহণ শেষে কেন্দ্রীয় ঈদগাহ মাঠে মহাসম্মেলন স্থলে আসেন তিনি। হেলিকপ্টারে চড়ে আসা প্রসঙ্গে হেফাজতে ইসলাম বগুড়া জেলা শাখার সদস্য সচিব শামছুল হক বলেন, দেশের দানশীল ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান আল্লামা শফির জন্য হেলিকপ্টারের ব্যবস্থা করেছেন। এ নিয়ে বিতর্ক না তোলা ভালো ।
সম্মেলন চলাকালে দুপুর আড়াইটায় জেলা বিএনপির সভাপতি ভিপি সাইফুল ইসলামের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধি দল সম্মেলন মঞ্চে এসে একাত্মতা প্রকাশ করেন। এর আগে এলডিপি’র জেলা সাধারণ সম্পাদক এড. মোখলেছুর রহমান একাত্মতা প্রকাশ করেন।
টাঙ্গাইল প্রতিনিধি খান মোহাম্মদ খালেদ জানান, হেফাজতে ইসলামের ১৩ দফা দাবি না মানলে ৫ মে থেকে এ দেশের তৌহিদী জনতা দেশ পরিচালনা করবে বলে গতকাল টাঙ্গাইল ঈদগা মাঠে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে হুঁশিয়ারি দেয়া হয়েছে। তৌহিদী জনতার কথা চিন্তা করে ১৩ দফার জন্য সংবিধান সংশোধনের দাবি জানান তারা।
জেলা হেফাজতে ইসলামের আমীর মাওলানা আব্দুল আজিজের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় যুগ্ম-আহ্বায়ক আল্লামা মুফতি ওয়াক্কাস। প্রধান অতিথি আল্লামা মুফতি ওয়াক্কাস বলেন, প্রধানমন্ত্রী নারী নীতিমালা প্রণয়ন করে দেশে ব্যাভিচারের পথকে সুগম করেছেন। হেফাজতের ঢাকা মহানগরী যুগ্ম মহাসচিব মুফতি মাহমুদুল হক বলেন, আল্লাহ ও রাসূল (স.) এর কটূক্তিকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তির বিধান রেখে আইন পাস না করলে তৌহিদী জনতাকে সাথে নিয়ে সংসদ ভবন ঘেরাও করা হবে।
মুন্সীগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, মঙ্গলবার মুন্সীগঞ্জ শহরের উপকণ্ঠ মুক্তারপুর পুরাতন ফেরিঘাটে হেফাজতে ইসলামের মহাসমাবেশ হয়েছে। এতে প্রায় ৮/১০ হাজার লোকের সমাবেশ ঘটে। এ মহাসমাবেশ সফল করতে বিএনপি ও জামায়াতের নেতা-কর্মীদের অংশগ্রহণ ছিল ব্যাপক। হেফাজতে ইসলাম মুন্সীগঞ্জ জেলা কমিটির সভাপতি ও সিরাজদিখানের মধুপুরে পীর মাওলানা আব্দুল হামিদের সভাপতিত্বে মহাসমাবেশে প্রধান অতিথি ছিলেন হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় কমিটির নায়েবে আমির আলহাজ হযরত মাওলানা ওবায়দুল্লাহ ফারুক। বক্তারা সরকারের সমালোচনা করে হেফাজতে ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়ন এবং ৫ মে ঢাকা অবরোধে অংশগ্রহণের আহ্বান জানান। প্রধান অতিথি বলেন, ইসলাম কায়েম করেই ফিরবো।
নেত্রকোনা প্রতিনিধি জানান, সকালে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া, দোকানপাট ভাংচুরের মধ্য দিয়ে নেত্রকোনায় হেফাজতে ইসলামের গতকাল মঙ্গলবারের সমাবেশ শুরু হলেও দুপুরের পরে শান্তিপূর্ণভাবে তা শেষ হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুরে নেত্রকোনা শহরের বারহাট্টা রোডস্থ মিফতাউলহুলুম মাদ্রাসা প্রাঙ্গণে হেফাজতে ইসলাম সমাবেশের আয়োজন করে। এরপরই মুক্তিযোদ্ধারা বারহাট্টা রোডস্থ চৌরাস্তার মোড়ে একই দিন বেলা ১১টায় সমাবেশ ডাকে। এ নিয়ে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হলে জেলা প্রশাসক গত সোমবার রাতে উভয়পক্ষকে সার্কিট হাউজে ডেকে সমন্বয়ের এবং সমঝোতার কথা বলেন। পরে মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট তাদের সমাবেশ শহীদ মিনারে স্থানান্তর করে। গতকাল সকালে জেলা প্রশাসক অফিস সড়কে হেফাজতের বেশ কিছু সমর্থক সদস্য হাতে লাঠি নিয়ে অনেকটা মানববন্ধনের মত দাঁড়িয়ে থাকে। এর কিছু পর ছাত্রলীগের কিছু সমর্থক সেখানে পৌঁছলে তাদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া এবং ইটপাটকেল ছোঁড়াছুঁড়ি হয়। তবে দুপুরে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে মাদ্রাসার পরিবর্তে নেত্রকোনার বারহাট্টা রোডে নেত্রকোনা জেলা হেফাজতে ইসলামের আহ্বায়ক মৌলানা তাহের কাশেমীর সভাপতিত্বে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে বক্তব্য রাখেন কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম মহাসচিব মুফতি সাজিদুর রহমান, মুফতি তৈয়ব, মৌলানা আনোয়ার শাহ, মীর মোহাম্মদ ইদ্রিস, মৌলানা হফেজ দেলোয়ার হোসাইন, নেত্রকোনা জেলা হেফাজতে ইসলামীর যুগ্ম আহ্বায়ক মৌলানা আব্দুল কাইয়ূম এবং আবু সায়েম খান।
‘অলি-গলি নবীপ্রেমিকদের
দখলে থাকবে’
ইত্তেফাক রিপোর্ট:হেফাজতে ইসলাম ঢাকা মহানগর নেতৃবৃন্দ বলেছেন, আগামী ৫ মে ঢাকার সব অলি-গলি নবীপ্রেমিকদের দখলে থাকবে। বর্তমান সরকার হেফাজতের ১৩ দফা দাবির প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করলে তাওহিদী জনতার গণরোষ থেকে রেহাই পাবে না। হেফাজতের ইমানী আন্দোলনে মুসলমানদের মধ্যে নবজাগরণ সৃষ্টি হয়েছে। আর এ জাগরণ দেখে নাস্তিক-মুরতাদ ও তাদের এদেশীয় দোসররা আন্দোলনকে বাধাগ্রস্ত করতে মরণ কামড় দিয়ে নেমেছে। ৫ মে হরতাল দেয়ার হুমকি দিচ্ছে।
গতকাল মঙ্গলবার লালবাগস্থ অস্থায়ী কার্যালয়ে আগামী ৫ মে অবরোধ বাস্তবায়ন কমিটির এক জরুরি সভায় নেতৃবৃন্দ এসব কথা বলেন। নেতৃবৃন্দ বলেন, গণতান্ত্রিক দেশে হেফাজতের শান্তিপূর্ণ কর্মসূচিতে নিরাপত্তার সার্বিক ব্যবস্থা করা সরকারে দায়িত্ব। কিন্তু পাগল স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ইতিমধ্যে সর্বশক্তি নিয়োগ করে হেফাজতকে প্রতিহত করার ঘোষণা দিয়েছেন। আমরা সরকারকে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলতে চাই, অবিলম্বে দেশ ও ইসলাম রক্ষায় ১৩ দফা মেনে নিন। নইলে ৫ মের পর সরকার পতনের এক দফা দেয়া হবে।
