‘রানা প্লাজা’ ধসের পর ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনায় বাংলাদেশি তৈরি পোশাকের বিদেশি ক্রেতারা সতর্কতা অবলম্বন করছেন। ক্রেতাদের পণ্য যেসব কারখানায় উত্পাদিত হয় সেগুলোর নিরাপত্তার বিষয়টি তাদের ভাবিয়ে তুলেছে।
ইতিমধ্যে পশ্চিমা দেশের কয়েকটি ক্রেতা প্রতিষ্ঠান কারখানা মালিকদের কাছে ফ্যাক্টরি ভবনের নকশা, ডিজাইনসহ প্রকৌশল বিষয়ক খুঁটিনাটি তথ্য চেয়েছেন। ভবনটি সঠিকভাবে নির্মাণ করা হয়েছে কি-না তার সার্টিফিকেটও চেয়েছেন কেউ কেউ। গতকাল মঙ্গলবার কয়েকজন পোশাক শিল্প মালিক ‘ইত্তেফাক’কে এ তথ্য জানিয়েছেন। পোশাক শিল্প মালিকরা জানান, সাভারের ভবন ধসের পর ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচিত হয়েছে। ক্রেতাদের অনেকে এ খবরে শংকিত। ‘রানা প্লাজা’য় যে পাঁচটি গার্মেন্টস কারখানা ছিলো তারা সবাই বিশ্বখ্যাত ক্রেতা প্রতিষ্ঠানে পণ্য রপ্তানি করতো। ধসের ঘটনার পর ক্রেতারা উদ্বিগ্ন হয়ে ই-মেইলে কারখানার ইঞ্জিনিয়ারিং রিপোর্ট চেয়েছেন।
একজন কারখানা মালিক জানান, ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের ই-মেইল পেয়ে তিনি হতবাক হয়েছেন। গত ১২ বছর যাবত্ তিনি ওই ক্রেতার সাথে ব্যবসা করে আসছেন। তার কারখানার কর্মপরিবেশ নিয়ে ওই ক্রেতা আগেও সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। কিন্তু ভবন ধসের পর ওই ক্রেতা প্রতিষ্ঠান নিশ্চিত হতে চায় যে, কারখানার সংশ্লিষ্ট ভবনটি বিল্ডিং কোড মেনে করা হয়েছে? ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এ সংক্রান্ত কাগজপত্র পাঠাতে বলেছে।
আরেকটি গার্মেন্টস কারখানার মালিক বলেন, সংশ্লিষ্ট অথরিটি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং সনদ পাঠাতে বলেছে ক্রেতা প্রতিষ্ঠান। তিনি বলেন, এটি আমাদের জন্য নতুন ধারণা। এতদিন ব্যবসা করলেও কোনদিন আমরা এ ধরনের প্রশ্নের মুখে পড়িনি। তিনি বলেন, এ ধরনের কাগজপত্র তলব করলে ব্যবসা করা কঠিন হয়ে পড়বে। বিজিএমইএ’র সাবেক সহ-সভাপতি এবিএম সামছুদ্দিন ‘ইত্তেফাক’কে বলেন, বাংলাদেশে এখন অধিকাংশ ক্রেতা প্রতিষ্ঠানের অফিস আছে। তারা অনেকেই ইতিমধ্যে ভবনের নকশা জমা দেয়ার জন্য কারখানা মালিকদের বলেছেন। যাদের অফিসে সেফটি বিভাগ নেই তাদের অনেকেই এজেন্সি নিয়োগ করছেন ফ্যাক্টরি ভবনের নিরাপত্তা বিষয়টি দেখার জন্য। তিনি বলেন, এ ধারাবাহিকতায় যেসব ক্রেতার বাংলাদেশে অফিস নেই তারাও আগামী দিনগুলোতে ভবনের নকশা চাইতে পারেন। সামছুদ্দিন বলেন, এভাবে ক্রেতারা যদি ভবনের নকশা চাইতে থাকে তাহলে অনেকের ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়বে। তবে তিনি ভবনগুলোর নিরাপত্তা দেখার জন্য সরকার, বিজিএমইএ, বিকেএমইএ’র সমন্বয়ে যৌথ কমিটি করার প্রস্তাব দেন। প্রয়োজনে সরকারের এ খাতে লোকবল বাড়ানোরও পরামর্শ দেন তিনি।
এ বিষয়ে বিখ্যাত ব্র্যান্ড ‘জেসিপেনি’র বাংলাদেশের পরিচালক জেনিফা জাব্বার বলেন, কারখানা ভবনটি নিয়ম মেনে করা হয়েছে কি-না তা দেখার দায়িত্ব প্রথমত সরকারের। এরপর দায়িত্বটি বর্তায় কারখানা মালিকের ওপর। ক্রেতারা এ বিষয়ে দায় নেবে কেন? তবে তিনি বলেন, যেহেতু এতবড় একটি ঘটনা ঘটে গেছে সেজন্য সবাই চিন্তা করছে কি করা যায়। তার মতে, কারখানা মালিক, সরকার, ক্রেতা প্রতিষ্ঠান, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থাসহ সবাই মিলে এ বিষয়ে একটি সমন্বিত উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। এক্ষেত্রে ক্রেতারা সহায়তা করতে পারে।
আগামী এক মাসের মধ্যে সব কারখানার কাঠামোগত নকশা ও ভবনের লোড ধারণক্ষমতার প্রতিবেদন তৈরি করে বিজিএমইএ’র কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেয়া হয়েছে কারখানা মালিকদের। এসব পরীক্ষা করাতে হবে প্রকৌশলীদের সংগঠন আইইবি’র সদস্যভুক্ত প্রকৌশলী দ্বারা। এসব প্রতিবেদন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ পরীক্ষা করে গড়মিল পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কারখানার লাইসেন্স বাতিলসহ সব ধরনের সেবা বন্ধ করে দেয়ার ঘোষণা দেয়া হয়েছে। এছাড়া গার্মেন্টস কারখানার নিরাপত্তা রক্ষায় শ্রমিক ও মালিকের সমন্বয়ে এলাকাভিত্তিক প্রতিরোধ কমিটি গঠন ও ১ মাসের মধ্যে কারখানা ভবনের উপরের জেনারেটর নিচে নামিয়ে আনা হবে বলে জানানো হয়।
এদিকে, সাভারে ধসে পড়া ‘রানা প্লাজায়’ যে কয়েকটি কারখানা ছিলো সেগুলো বিখ্যাত কয়েকটি ব্রান্ডের কাজ করতো। এগুলো হচ্ছে ব্রিটেনের প্রি-মার্ক, বন মরোচে এবং মেটালোন, স্পেনের ম্যাংগো এবং ইটালির বেনেটন। ইতিমধ্যে প্রি-মার্ক নিহত ও আহত শ্রমিকদের ক্ষতিপূরণ দেয়ার কথা ঘোষণা করেছে। আন্তর্জাতিক শ্রম অধিকার ফোরাম বাকি ক্রেতাদেরকেও ক্ষতিপূরণ দিতে এগিয়ে আসার দাবি জানিয়েছে। রানা প্লাজা ধসের পর গার্মেন্টস শিল্পখাতে নতুন করে আতংক সৃষ্টি হয়েছে। কোন কোন কারখানায় ফাটল ধরার গুজবে উত্পাদন বন্ধ রাখা হচ্ছে বলে অভিযোগ তুলেছেন কেউ কেউ। আবার কোন ফ্যাক্টরি মালিকরা আতংকিত হয়ে নিজেরাই কারখানা বন্ধ করে দিয়েছেন।
