আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকারের মেয়াদ শেষ হওয়ার ছয়মাস সময় আগে জনপ্রশাসনে বড় ধরনের পদোন্নতির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এটি সম্ভবত এ সরকারের আমলে শেষ পদোন্নতি। বিপুল প্রত্যাশার বিপরীতে এই পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু করা হলেও শেষপর্যন্ত তা কতটা নির্বাচনী লক্ষ্য পূরণে সহায়ক হবে তা নিয়ে আগে-ভাগেই প্রশ্ন তুলছেন অনেকে। যোগ্য ব্যক্তিরা পদোন্নতি না পেয়ে ব্যক্তিবিশেষের পছন্দ-অপছন্দ গুরুত্ব পেলে এই পদোন্নতি শেষমুহূর্তে প্রশাসনে ক্ষোভের মাত্রা বাড়াতে পারে-এমন আশংকা করেছেন সংশ্লিষ্টরা। অনেকে বলছেন এটা নির্বাচনী পদোন্নতি! পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেও যারা দীর্ঘদিন অপেক্ষায় রয়েছেন তাদের পদোন্নতি দেয়া সরকারের আবশ্যিক দায়িত্ব।
সূত্র জানায়, আগামী বুধবার পদোন্নতির জন্য সুপেরিয়র সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) সভা হবার কথা রয়েছে। এদিন উপসচিব থেকে যুগ্ম সচিব এবং যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির বিষয় বিবেচনা করার কথা। এছাড়া ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার বেনজির আহমেদ এবং সিআইডির উপ-মহাপুলিশ অতিরিক্ত মহাপুলিশের চলতি দায়িত্বে নিয়োজিত মোখলেসুর রহমানকে অতিরিক্ত মহাপুলিশ পরিদর্শক পদে পদোন্নতি দেয়ার সুপারিশ করার কথা রয়েছে।
এদিকে আরো কিছু কর্মকর্তাকে চাকরি থেকে বাধ্যতামূলক অবসর দেয়ার প্রক্রিয়া চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে। এসব কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ তারা বিরোধী দলের সঙ্গে রাজনৈতিক সখ্যতা গড়ে তুলছেন এবং সরকারের বিরুদ্ধে যেসব রাজনৈতিক গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করছে তাদের সঙ্গে এদের যোগাযোগ রয়েছে। ইতিমধ্যে সাবেক স্পীকার বিএনপি নেতা জমিরউদ্দিন সরকারের একান্ত সচিব অতিরিক্ত সচিব নাসিমূল গনিকে অবসর দেয়া হয়েছে। এছাড়া বিএনপি ও জামায়াতের তত্কালীন দুইজন মন্ত্রীর একান্ত সচিব ছিলেন এমন দুইজন অতিরিক্ত সচিবকেও অবসর দেয়ার প্রস্তাব রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেয়েছে বলে জানা গেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় জানায়, বর্তমানে প্রশাসন ক্যাডারে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির জন্য অপেক্ষমান রয়েছেন ১৯৮৪ সালের এবং এর আগের ব্যাচের ২৯৬ জন এবং যুগ্ম সচিব হওয়ার জন্য ১৯৮৬ ব্যাচের ২০৭ জন, ১৯৮৫ ব্যাচের ৩০১ জন, ১৯৮৪ ব্যাচের ১৬৯ জন এবং ১৯৮৫ ব্যাচের উপরের ব্যাচের ২৩ জন কর্মকর্তা।
এসএসবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানান, আলোচ্য সকল কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়ার সুযোগ নেই। কারণ অনেকেরই প্রয়োজনীয় নম্বর নেই। শৃংখলা বিরোধী অভিযোগ আছে অনেকের বিরুদ্ধে। কারো কারো বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগও আছে।
জানতে চাইলে জনপ্রশাসনের সিনিয়র সচিব আবদুস সোবহান সিকদার ইত্তেফাককে বলেন, যেসব কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া হবে তাদের তালিকা চূড়ান্ত হয়েছে। এখন পদভিত্তিক কতজন কর্মকর্তাকে পদোন্নতি দেয়া যাবে-তা নিয়ে এসএসবি বিবেচনা করবে। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, পদোন্নতি পাওয়া কর্মকর্তাদের অধিকার। প্রকৃতপক্ষে যোগ্য সকল কর্মকর্তাকেই পদোন্নতি দিতে পারলে ভাল হতো। কিন্তু এমনিতেই পদের চেয়ে কর্মকর্তার সংখ্যা বেশি রয়েছে। তারপরও সার্বিক বিবেচনায় পদোন্নতি দেয়া হচ্ছে। তবে পদোন্নতি দিয়ে রাতারাতি কাউকে বদলি করা বা নতুন ক্ষেত্রে নিয়োগ দেয়া যাবে না। তাহলে শূন্যতা তৈরি হবে যা কাজের ক্ষেত্রে অসুবিধা তৈরি করতে পারে। কিছু নতুন পদ তৈরি হলেও সবাইকে সেসব ক্ষেত্রে নিয়োগ দেয়া সম্ভব হবে না। সে জন্য একজন যুগ্ম সচিব অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পেলেও তাকে যুগ্ম সচিবের আসনে বসেই কাজ করতে হবে। অনুরূপ ব্যবস্থা যুগ্ম সচিবদের ক্ষেত্রেও কার্যকর হবে। অর্থাত্ পদোন্নতি হলেও অনেক কর্মকর্তাকে ইনসিটো থাকতে হবে। বা পদোন্নতির পূর্বে যে আসনে ছিলেন সেখানেই কাজ করতে হবে।
প্রসঙ্গত, বর্তমান সরকারের সময়ে তিন দফায় ১৬৩ জন যুগ্ম সচিবকে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়। এরমধ্যে ২০০৯ সালের ২৭ জানুয়ায়ি ৭২ জন, ৭ সেপ্টেম্বর ৬০ জন এবং ১০ অক্টোবর ৩১ জন। অবশ্য দুই দফা পদোন্নতি বঞ্চিত ২৯ জন কর্মকর্তা শেষবার অতিরিক্ত সচিব হয়েছিলেন।
যুগ্ম সচিব পদে তিন দফায় এক হাজার ২১৫ জন পদোন্নতি পান। এরমধ্যে ২০০৯ সালের ১৯ ফেরুয়ারি ৮৬ জন, ৭ সেপ্টেম্বর ১৬৩ জন, ২১ নভেম্বর ১৬৬ জন। যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির সময়ে অন্তত ১৫০ জন কর্মকর্তা পদোন্নতি বঞ্চিত হয়ে জ্যেষ্ঠতা হারান। এখনো তারা উপসচিব। যদিও তাদের সহকর্মীরা এখন যুগ্ম সচিব থেকে অতিরিক্ত সচিব হতে চলেছেন। এবার বঞ্চিতদের মধ্যে থেকে কতজনকে বিবেচনা করা হবে তা নিশ্চিত নয়। তবে বঞ্চিতদের খুব বেশি সংখ্যক কর্মকর্তা পদোন্নতির জন্য বিবেচিত হচ্ছেন না-তা নিশ্চিত করেছেন এসএসবির একটি সূত্র।
এ সরকারের সময়ে দুই দফায় উপসচিব পদে পদোন্নতি পান ৫৭৮ জন। ২০০৯ সালের ৭ সেপ্টেম্বর ২৮০ জন এবং ২০১০ সালের ১৫ অক্টোবর ২৯৮ জন। প্রথম দফায় ৯ম ও ১০ম ব্যাচের এবং দ্বিতীয় দফায় ১১ এবং ১৩তম ব্যাচের ১৪ জনসহ ২৯৮ জনকে পদোন্নতি দেয়া হয়। সর্বশেষ গত ১৪ মার্চ ১৮৯ জন কর্মকর্তাকে উপসচিব পদে পদোন্নতি দেয়া হয়।
প্রশাসনের আলোচ্য তিনটি স্তরের বিপুল সংখ্যক কর্মকর্তা দফায় দফায় পদোন্নতি বঞ্চিত হয়েছেন। ১৯৮২-এর নিয়মিত এবং বিশেষ ব্যাচের কর্মকর্তারা এখন সচিব। ১৯৮৪ ব্যাচের কর্মকর্তারাও অনেকে উপসচিব আছেন। ১৯৮৫ ব্যাচের কর্মকর্তাদের মধ্যে থেকে এবার যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির প্রক্রিয়া শুরু হবে। যদিও এ ব্যাচের অনেকেই এখনও সিনিয়র সহকারি সচিব থেকে উপসচিব হতে পারেননি।
