চার সিটি করপোরেশন নির্বাচন

মন্ত্রী প্রার্থী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগ

আপডেট : ০১ জুন ২০১৩, ২২:৪১
চার সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আচরণবিধি মানা হচ্ছে না। প্রার্থী-তার সমর্থক-মন্ত্রী এমনকি সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও আচরণ বিধি লংঘনের অভিযোগ উঠেছে। নির্বাচন নির্দলীয় হলেও প্রকাশ্যে সভা করে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে। ১৮ দলীয় এবং ১৪ দলীয় উভয় জোটই সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে। ধর্মীয় স্থান এবং ধর্মের ব্যবহারের অভিযোগও এসেছে প্রার্থীদের বিরুদ্ধে। ১৪ দলীয় জোট সমর্থিত মেয়র প্রার্থীরা তাদের প্রতিপক্ষদের বিরুদ্ধে সাম্প্রদায়িক উস্কানি দেয়ার অভিযোগ এনেছেন। অন্যদিকে সরকারি দলের মন্ত্রী-এমপিরা নির্বাচনকে প্রভাবিত করার জন্য নির্বাচনী এলাকার ভিতরে এবং বাইরে সভা করছেন বলে অভিযোগ করেছে ১৮ দলীয় জোট। তারা অভিযোগ করেছে প্রত্যেকটি নির্বাচনী এলাকার বাইরে থেকে দলীয় কর্মী-সমর্থক এনে সরকারি দলের প্রার্থীরা নির্বাচনে কারচুপি করার ষড়যন্ত্র করছেন। প্রায় প্রতিদিনই এ ধরনের অভিযোগ আসছে নির্বাচন কমিশনে (ইসি)। ইতিমধ্যে কমিশনের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্টদের সতর্ক করে দেয়া হলেও এসবের তোয়াক্কা করা হচ্ছে না। আচরণবিধি লংঘন প্রসঙ্গে নির্বাচন কমিশনার মোঃ শাহ নেওয়াজ ইত্তেফাককে বলেন, আচরণবিধি লংঘনের বিষয়টি কমিশন কঠোরভাবে খতিয়ে দেখছে। কেউ আইন অমান্য করলে তাকে ছাড় দেয়া হবে না। যেখানেই আচরণবিধি লংঘনের ঘটনা ঘটছে সেখানে কমিশনের কর্মকর্তা গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছেন। আগামী ১৫ জুন অনুষ্ঠিত হচ্ছে রাজশাহী, খুলনা, বরিশাল ও সিলেট সিটি করপোরেশনের নির্বাচন। নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সরগরম চার সিটির নির্বাচনী এলাকা। নির্বাচন কমিশন আচরণবিধি মেনে চলতে প্রার্থী-সমর্থকদের কড়াকড়ি আরোপ করলেও বাস্তব চিত্রভিন্ন। নির্বাচনী আইন অনুযায়ী কোনো প্রার্থী ভোট গ্রহণের ২১ দিন আগে কোনো প্রচারণা চালাতে পারেন না। কিন্তু সেটি মানেননি কোনো প্রার্থীই। মিছিল ও সভার উপর নিষেধাজ্ঞা থাকলেও গত সোমবার প্রতীক বরাদ্দের পর কয়েকজন মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থী প্রকাশ্য মিছিল করেছেন। দলনিরপেক্ষ নির্বাচন হলেও প্রার্থীদের পরিচয় করিয়ে দেয়া হচ্ছে দলীয় ও জোট-মহাজোটের পরিচয়ে। গত বুধবার রাজশাহীতে বিএনপির নেতৃত্বাধীন ১৮ দলীয় জোটের পক্ষ থেকে তাদের সমর্থিত প্রার্থীকে আনুষ্ঠানিকভাবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়। একইভাবে অন্যান্য সিটিতেও ১৮ দলীয় প্রার্থীদের জোটের প্রার্থী হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছে। একই অবস্থা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলের ক্ষেত্রেও। চার সিটিতে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের দলীয় প্রার্থী কে তা সংবাদপত্রে বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানানো হয়েছে। সর্বশেষ ঢাকায় বসে গাজীপুর সিটি নির্বাচনেও ১৪ দল কেন্দ্রীয়ভাবে প্রার্থিতা ঘোষণা করেছে। ফলে আচরণবিধি লংঘনের সঙ্গে শুধু প্রার্থী-সমর্থকরা নয়, এখন দলীয়ভাবেই লংঘন করা হচ্ছে। আর এর ব্যাপক প্রভাব পড়ছে প্রচার-প্রচারণায়। নির্বাচন কর্মকর্তারা অনেকটা নিরুপায়ের মতো দেখছেন সবকিছুই। ইসির ভিজিলেন্স টিম মাঠে নামলেও তারা নিষ্ক্রিয়। চার সিটিতেই একটি থানায় একের অধিক ক্যাম্প রয়েছে মেয়র প্রার্থীদের। রাজশাহীতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী এ এইচ এম খায়রুজ্জামানের ধ্বংস কামনা করে মোনাজাত করেছেন এক হেফাজত নেতা। ওই সভায় বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলও উপস্থিত ছিলেন। এ ঘটনায় শুক্রবার অবশ্য কমিশন ২৪ ঘন্টার মধ্যে বুলবুলের কাছে ঘটনার ব্যাখ্যা চেয়ে কারণ দর্শানো নোটিস দিয়েছে। রাজশাহী সিটির সীমানা সংলগ্ন পবা উপজেলার হরিয়ান এলাকায় গত শুক্রবার তিন প্রতিমন্ত্রী ও ১৭ এমপি এবং রাজশাহী বিভাগের আওয়ামী লীগের শীর্ষ ৬ জন নেতা নিয়ে গোপন বৈঠক করেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ। বৈঠকে স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী, ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী ও শিল্প প্রতিমন্ত্রী উপস্থিত ছিলেন। বিএনপির প্রার্থী মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল অভিযোগ করেছেন প্রশাসন এবং বহিরাগতদের দিয়ে ভোটকেন্দ্র দখল ও কারচুপির ষড়যন্ত্র হয়েছে ওই বৈঠক থেকে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী গোপন বৈঠক করলে পুলিশ কিভাবে নিরপেক্ষ থাকবে ? একইদিন খুলনায় শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মন্নুজান সুফিয়ান নির্বাচনী আচরণবিধি লংঘন করে মেয়র প্রার্থী ও দুইজন ওয়ার্ড কাউন্সিলরের পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছেন। এ সময় এলাকার আওয়ামী লীগের নেতারা ছাড়াও ১২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর পদপ্রার্থী তাজুল ইসলাম ও সংরক্ষিত কাউন্সিলর পদপ্রার্থী পারভীন আক্তার তার সঙ্গে ছিলেন। মন্ত্রীর সঙ্গী দলীয় কর্মীরা প্রকাশ্যে ভোট প্রার্থনা করেছেন। গতকাল কমিশন ওই দুই কাউন্সিলর প্রার্থীকে কারণ দর্শানোর নোটিস দিয়েছে। মন্ত্রীর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগ তদন্ত করে দেখা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খুলনা সিটির রিটার্নিং কর্মকর্তা। নির্বাচনী আচরণবিধি ও সরকারি চাকরি বিধিমালা লংঘন করে খুলনায় সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী লিয়াকত আলী, খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মোহাম্মদ ফায়েকউজ্জামান, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মুহাম্মদ আলমগীর প্রচারণায় অংশ নিয়েছেন। সম্প্রতি খুলনার পাবলিক লাইব্রেরিতে অনুষ্ঠিত এক সভায় তারা আওয়ামী লীগের প্রার্থী তালুকদার আবদুল খালেকের পক্ষে প্রচারণা চালান। ১৮-দলীয় জোট-সমর্থিত প্রার্থী মনিরুজ্জামান রিটার্নিং কর্মকর্তার কাছে এই অভিযোগ করেছেন। সিটি করপোরেশনের অর্থায়নে অনুষ্ঠান আয়োজন করে আলোচনা সৃষ্টি করেন সিলেটের সদ্য পদত্যাগী মেয়র ও আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমেদ কামরান। পরে কমিশন তাকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়। ভবিষ্যতে আর এমন হবে না-মর্মে লিখিত দিয়ে পার পান তিনি। বরিশাল সিটি করপোরেশনের আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী শওকত হোসেন হিরন, আহসান হাবিব কামাল ও মাহমুদুল হক খানকে আচরণবিধি লংঘনে সতর্ক করেছে কমিশন। তাছাড়া আলাদাভাবে কমিশনে বিএনপির প্রার্থী আহসান হাবিব কামালের বিরুদ্ধে গাড়িতে চাররঙা পোস্টার ব্যবহারের অভিযোগ করেন আওয়ামী লীগ সমর্থিত মেয়র প্রার্থী শওকত হোসেন হিরনের প্রধান এজেন্ট। বরিশাল সিটিতে মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী যুবলীগ নেতা মামুনের প্রচারকাজে ব্যবহূত মাইক প্রতিপক্ষ প্রার্থীর সমর্থকেরা ভেঙে ফেলার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্বাচনী আচরণ বিধি ভঙ্গের অভিযোগে মেয়র প্রার্থী এএইচএম খায়রুজ্জামান লিটনকে সতর্ক করে চিঠি দিয়েছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। শনিবার বিকালে রাজশাহী সিটি নির্বাচনের রিটার্নিং কর্মকর্তা ও আঞ্চলিক নির্বাচন কর্মকর্তা তাকে এ পত্র প্রেরণ করেন। বিধি অনুযায়ী বেলা ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত প্রচারণায় মাইক ব্যবহার করা যাবে। কিন্তু প্রার্থীরা তা মানছেন না। দুপুর সাড়ে ১২টা থেকেই মাইক ব্যবহার করে যাচ্ছে। রাত ৮টার পরও মাইকের ব্যবহার দেখা যাচ্ছে। ধর্মীয় স্থানে প্রচারণা নিষেদ্ধ থাকলেও গত শুক্রবার অধিকাংশ প্রার্থীর পক্ষে মসজিদে দোয়া চেয়ে মোনাজাত করা হয়েছে। আচরণবিধি কঠোরভাবে পর্যালোচনা করার জন্য ইতিমধ্যে চার সিটিতে ৪০ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেয়া হয়েছে। প্রতি সিটিতে ১০ জন করে ম্যাজিস্ট্রেটকে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। গত সোমবার থেকে ভোট গ্রহণের পরের তিন অর্থাত্ ১৬ জুন পর্যন্ত ২১ দিনের জন্য দায়িত্ব পালন করবেন। এছাড়াও ফৌজদারী কার্যবিধির ধারা-১৯০ এর উপ-ধারা (১) এর অধীনে বিচারার্থে আমলে নেয়া এবং আইন ও বিধি অনুসারে কতিপয় অপরাধের তাত্ক্ষণিক বিচারকার্য সম্পন্ন করার জন্য প্রতিটি সিটি করপোরেশনে ৫ জন করে মোট ২০ জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ করা হচ্ছে। জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেটরা ভোটগ্রহণের পূর্বের দুই দিন, ভোটগ্রহণের দিন এবং ভোট গ্রহণের পরের দিন অর্থাত্ ১৩ জুন থেকে ১৬ পর্যন্ত চারদিন ভ্রাম্যমাণ সংক্ষিপ্ত বিচার আদালত পরিচালনা করবেন। আচরণবিধি লংঘনকারীর কোন প্রার্থী বা তার পক্ষে অন্য কোন ব্যক্তি বিধিমালা লংঘন করলে অপরাধের জন্য সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে ৬ মাস কারাদণ্ড অথবা ৫০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত করার নিয়ম রয়েছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত তা কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ আছে।