পরিকল্পনা করে মা হওয়া

আপডেট : ০২ জুন ২০১৩, ১৯:৪৪
কেয়া চৌধুরী এ্যাডভোকেট, সুপ্রিম কোর্ট ভালোবেসে বিয়ে করেছিলাম আমি। ভালোবাসার আবেগঘন সম্পর্কে কেটে গেছে ৪টি বছর। ইচ্ছা ছিল ২টি ভিন্ন বিষয় পরীক্ষা শেষ করেই মা হবো। কিন্তু ডাক্তার জানান, আমাকে নিরাপত্তার জন্য এখনই মা হতে হবে। কারণ আমার পেটে সিস্ট আছে। অগত্যা আমাকে পরীক্ষা সামনে রেখেই মা হতে হলো। আমার স্বামী আর শাশুড়ি মা হওয়ার বিষয় আমাকে প্রচণ্ড রকম সহযোগিতা করেন। আমার পড়াশোনা আর পরীক্ষার বিষয় স্বামী সম্পূর্ণ সহযোগিতা করেন। অফিস করে আমার নোট সংগ্রহই করে ক্ষ্যান্ত হননি। শরীর খারাপ লাগলে আমাকে সে নোট পড়ে শুনিয়েছেন। আমি অনেক পড়া তার মুখে শুনে মনে রেখেছি। আর শারীরিক দিকটা দেখেছেন শাশুড়ি। হাসপাতালে তিনিই আমার সাথে ছিলেন। আমার শরীর ভীষণ ফুলে গিয়েছিল। পেটে সিস্ট থাকায় বেবী ডানদিকে ঝুলে ছিল। তাই হাঁটতে কষ্ট হতো। আমি একটা কথা বলতে চাই, সব মেয়ের মা হওয়ার সময় যেমন পারিবারিক সাপোর্ট দরকার তেমন দরকার একজন ভালো গাইনোকোলজিস্ট। কারণ সাধারণ মানুষ আমরা মেডিক্যালের অনেক টার্ম বুঝি না। চিকিত্সকের উপর নির্ভর করি। তাদের অভিজ্ঞতা আর আন্তরিকতার উপর বেবী ও মায়ের জীবন নির্ভর করে। আমার বাচ্চাটা প্রিমেচিউর ছিল। পেটে পানি হওয়ায় ৮ মাসেই অপারেশন করতে হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটা ডাক্তারের ছিল। উত্তরা মেডিক্যাল কলেজের গাইনি বিভাগের অধ্যাপক পারু জাহান সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আমার দ্বিতীয় সন্তানের জন্য সিস্টের অপারেশনও তিনি করেননি। আমার বিয়ে হয় ২০০১ সালে আর মেয়ের জন্ম ২০০৫ সালে। শ্যামা শারমিন রহমান পরিচালক, ট্রু টেক, কাউন্সিলর জেনারেল ফার্মাসিউটিক্যাল আমি পড়াশোনা শেষ করে চাকরিতে ঢুকে যাই। পড়াশোনার বিষয় ছিল ফার্মাসি। একজন ফার্মাস্টিট হিসেবে তিন বছর চাকরি করার পর আমি ভালোবেসে বিয়ে করি। আমার পরিবারে মেয়েদের চাকরি করার প্রচলন ছিল। আমার মাও চাকরিজীবী ছিলেন। তবে আমার শ্বশুরবাড়ির কোন মেয়ে ইন্ড্রাস্টিতে কাজ করেনি। সেক্ষেত্রে আমার চাকরি ও চাকরির ধরন তাদের কাছে নতুন ছিল। আমি সকাল ৭টায় বের হয়ে রাত ৮/৯টায় বাড়ি ফিরতাম। শ্বশুরবাড়ির লোক এবং স্বামী উভয়ই প্রগতিশীল হওয়ায় কোন অসুবিধা হয়নি। তারা আমাকে ভালোভাবে গ্রহণ করেছেন। বিয়ের পর পরই আমি একটি বেবী চাইতাম। তবে স্বামীর ইচ্ছা ছিল কিছুদিন পর। আমি নানাভাবে তাকে বাচ্চার প্রতি আসক্ত করতে লাগলাম এবং বিয়ের ছয় মাস পরে দেশের বাইরে বেড়াতে গিয়ে আমি কনসিভ করি। আমার ঔষধ ইন্ড্রাস্টিতে মেডিক্যাল সাপোর্ট ছিল। আমি দুপুরের খাওয়ার পর যেখানে গিয়ে মেডিক্যাল চেকআপ করতাম, বিশ্রাম নিতাম আর নামাজ পড়তাম। অফিস আমাকে খুব সহযোগিতা করেছে। আমি আমার সন্তান জন্ম হওয়ার দিনও কাজ করেছি। শারীরিকভাবে কোন অসুবিধা হয়নি। আমার গাইনোকোলজিস্ট ছিলেন ড. ফেরদৌস মহল রুনি। তিনি উত্তরা মেডিক্যাল কলেজে ছিলেন। রাতে ওনি অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেন। আমি যেহেতু চাকরি করি। তাই সবকিছু পরিকল্পনা করে করি। আমি আগে থেকেই পরিকল্পনা করি আমার ২য় বেবী হবে ২ থেকে আড়াই বছর পর। তাহলেই তারা একসাথে বড় হবে। ভালো বন্ধু হবে। আমার অভাব অনুভব করবে না। যদিও ১৬ মাসের মধ্যেই আবার আমি কনসিভ করি। একটা কথা সবার জন্য বলতে চাই, প্রত্যেক নারীর জীবনে মা হওয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়। এই সময় পরিবারের পূর্ণ সহযোগিতা প্রয়োজন। আর সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন স্বামীর ওপর আস্থা রাখার মতো অবস্থা। আমার স্বামী সব সময় ডাক্তারের কাছে নিজে নিয়ে যেতেন। হঠাত্ করেই আমার প্রথম বেবীর অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। সে সময় সে দেশের বাইরে ছিল। অপারেশনের কথা শোনার সাথে সাথেই দেশে ফিরে আসেন। যা জরুরি ছিল। ফুলেশ্বরী প্রিয়নন্দিনী কর্মজীবী নারী আমি এখন নতুন একটি কাজে ঢোকার পরিকল্পনা করছি। তাই চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছি। আমি আইসিডিডিআরসি এবং ব্যাংকে কাজ করেছি। আমি ছাত্র জীবনেই ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করে ফেলি। যেহেতু পড়াশোনা শেষ হয়নি স্বামীও চারুকলার ছাত্র। তাই আমরা চাচ্ছিলাম কিছুদিন পরে বাচ্চা নেব। কিন্তু আমার কিছু শারীরিক সমস্যা হওয়ায় ডাক্তার বাচ্চা নিতে বলেন। আমি একটা কথা বলতে চাই, কেউ যদি ভাবেন একটু বয়স করে বেবী নিলে সমস্যা হবেন, সেটা যেমন ঠিক আবার অনেক সময় ঠিক বয়সে বাচ্চা নিলেও সমস্যা হতে পারে। ডাক্তার বলেন, ২৫-৩০ বছরের মধ্যে বাচ্চা নেয়ার উপযুক্ত সময়। আমি সেই অনুযায়ী ঠিক সময় মা হয়েছি। আমার কিছু মেয়েলি সমস্যার জন্য তখন আমাকে মা হতে হয়েছিল। আমি চাকরিজীবী মেয়েদের বলতে চাই, নিজেদের অনেক শক্ত থাকতে হয়। সব নিজেদেরই করতে হয়। স্বামী একটা বড় সাপোর্ট থাকে। আমার সেই নয় মাসের কথা মনে পড়লে খুব আবেগ তাড়া করে। আমি কিছুই খেতে পারতাম না, পানি খেলেও বমি হতো। আমার স্বামী আমার কি খেলে ভালো লাগবে, কি খেতে ইচ্ছা করে সেসব বিষয় খুব সচেতন ছিলেন। অনেকে মা হওয়ার সময় মায়ের বাড়ি চলে যান। আমি যাইনি কেন যেন বিষয়টা আমার কাছে ভালো লাগতো না। কনসিভ করার পর থেকে মা হওয়া পর্যন্ত আমি আর আমার স্বামী সব কিছু নিজেরাই করি। একটা কথা কর্মজীবী নারীর জন্য গুরুত্বপূর্ণ আমার ২য় বাচ্চার সময়ও তাই করেছি। আমার মা আমাকে বলেছিল, তুমি যেমন প্রথম বাচ্চার সময় পেরেছ এবারও পারবে। আমি মায়ের কথায় ভীষণ সাহস পাই। মা হওয়ার বিষয়ে মেয়েদের নিজের অনেক উদ্যোগী হতে হবে। আমার ২য় বাচ্চার জন্ম হয় ১৮ মাস পরে। ডা. মেহেরিন এস সিদ্দিকা ছিলেন আমার চিকিত্সক। উনি যেমন ভালো ডাক্তার তেমন ভালো মানুষ। যা মা হওয়া নারীর জন্য দরকার। প রা ম র্শ — মা হওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেক নারীর পরিকল্পনা করা উচিত । যদিও আমাদের দেশে আমরা বিয়ের আগে কিংবা বিয়ের পরপর মা হওয়ার বিষয় চিকিত্সকের সাথে কথা বলি না। আজকাল কেউ কেউ এর প্রচলন করছে। আমি মনে করি এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যারা পড়াশুনা শেষ করে বিয়ে করে মা হতে চান তাদের বলবো, অবশ্যই চিকিসকের মরামর্শ নিয়ে নিবেন। এ ক্ষেত্রে আরও কিছু বিষয় গুরুত্ব দেয়া জরুরি যেমন— ++ বিয়ের পর একবছর সময় নিয়ে মা হতে চাইলে চিকিত্সকের পরামর্শ নিন এবং নিজের শরীর যে জন্য প্রস্তুত কিনা তা জেনে নিন। ++পরিবারের কারো যদি সিস্ট কিংবা পরিবারের কারো যদি মাতৃত্বের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী ইতিহাস থাকে তাহলে সময় না নেওয়াই ভাল। ++সিস্ট থাকলে মা হওয়াই একটি চিকিত্সা ++ ত্রিশের ঊর্ধ্বে মায়েদের উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিক প্রভৃতি সমস্যা দেখা দিতে পারে। ++ ত্রিশ এর মধ্যে অন্তত প্রথম সন্তান জন্ম দেওয়া জরুরি। ডা.নাজনীন আহমেদ সহযোগী অধ্যাপক ধাত্রী ও প্রসূতি বিদ্যা বিভাগ হলি ফ্যমিলি রেড ক্রিসেন্ট হাসপাতাল