ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা

একটা ভাল কাজ দিবেন

আপডেট : ০২ জুন ২০১৩, ১৯:৪৬
মালেকা আক্তার একটা বিকট শব্দ শোনার সাথে সাথে কোথায় যে তলিয়ে যাচ্ছিল তা আন্দাজ করতে পারেনি। সে কাজ করতো ৬ তলায়। মেশিনেই ছিল তার কাজ। ৪,৬০০ টাকা আর ওভারটাইম মিলিয়ে যা হতো তা দিয়ে নিজের খরচ বহন করে বাড়ির সংসারও চালাতে হতো। ১৮ বছরের মালেকা কুমিল্লা চাঁদপুরের বাসিন্দা। ৪ বোন ২ ভাই আর বাবা-মার সংসারের দায়িত্ব, তৃতীয় সন্তান মালেকা। কারণ বড়রা নিজেদের সংসারে ব্যস্ত। সেদিনের কথা ভাবলে এখনো শিউরে উঠে মালেকা। একটা বিকট শব্দ হওয়ার পর কোথায় যেন তলিয়ে যেতে থাকেন তিনি। তারপর উদ্ধারকর্মীরা তাকে উদ্ধার করেন। যে বোনের সাথে কলোনীতে টাকার বিনিময়ে থাকতেন তার কাছেই ফিরে যান। কতদিন হয়ে গেল তার কোন কাজ নেই। দুই মাসের বেতন পেয়েছেন ৮ মে। ধার-দেনা শোধ আর বাড়িতে পাঠানোর পর কিছুই নেই হাতে। কি হবে এই ভেবে যে যেখানে বলেন সেখানে যান ক্ষতিপূরণ নেয়ার জন্য। শিল্পী আক্তারও মেশিনে কাজ করতো। ছয় ভাই-বোনের মধ্যে শিল্পী ৩য়। বড় ভাই রাজন বিয়ে করে নিজের মতো করে আছে। সংসারে তার খাওয়ার খরচ আর বাবা-মা ছোট ভাই-বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে এক খালার সাথে পাড়ি জমান ঢাকায়। ৪ হাজার টাকা বেতন আর ওভারটাইম মিলে আধপেটের জীবন চলে যাচ্ছিল। ধীরগতিতে সেই গতি একেবারে স্তব্ধ করেছে রানা প্লাজার ধস। তিনদিন পরে উদ্ধার হয় শিল্পী। হাসপাতালে নিজেকে দেখে বিশ্বাস করতে পারছিলেন না বেঁচে আছেন কি-না। শিল্পী এখন কাজ চায়, গার্মেন্টসে নয়। কারণ এখনো সেই ভয় তাকে তাড়া করছে। ভালো গার্মেন্টস কি আছে। এমন এক প্রশ্ন করেন। তারপর বলেন, অন্য কোন কাম নাই। তারপর মাথা নিচু করে বলেন, আমাকে একটা ছেলে ভালোবাসে সে সাহায্য করতে চায়। বিশ্বাস করতে পারি না যদি আমার কোন ক্ষতি করে। গরীব মানুষ আমরা পেটের জন্য যুদ্ধ করি এটাই ভালা অন্য কোন ক্ষতি চাই না। কেমন ক্ষতি প্রশ্ন করলে বলে যদি বিয়া না করে। কিংবা বিয়াতো আমি এখন করতে পারুম না। আমি বিয়া করলে আমার বাবা-মায়রে কে দেখবে। বিয়া না কাম দরকার আমার। বিয়ের প্রশ্নে চোখে জল আসে। ২২ বছর বয়সের স্মৃতি আক্তার। এই বয়সে অনেকে সংসার করলেও তার বাবা-মার সংসারের চাকা ঘোরাতে হয়। তিন বোন এক ভাইয়ের মধ্যে স্মৃতিই বড়। যখন কৈশোর পেরিয়ে বড় হয়ে উঠছিল শিল্পী তখন খালা-খালু তার বিয়ের কথা বলেছিল। বাবা খরচের জন্য বিয়ে দেয় নাই। তার কিছু দিন পর সেই খালার হাত ধরেই শহরে আসে শিল্পী। কাজ নেয় রানা প্লাজার ৮ম তলায়। ৪৭০০ টাকা বেতন হলেও ওভারটাইম মিলে মাসে ৮ হাজার টাকা পেতেন হাতে। বাবা-মাকে টাকা পাঠিয়ে ক্লান্ত-পরিশ্রান্ত স্মৃতি তৃপ্ত হন। বিয়ে করলে কি বাবা-মাকে টাকা দেয়া যেতো? এমন প্রশ্ন করেই বলেন, কি কন এখন। এখন বিয়ার সময় না। একটা ভালো কাম দেন। আমার কাম দরকার। তাদের কাজের প্রয়োজন। ভাল একটা কাজ যেখানে ভবন ধসের আশঙ্কা থাকবে না। মাস গেলে বেতন পাওয়ার নিশ্চয়তা থাকবে। বাবা-মার সংসার চালিয়ে তৃপ্ত হতে চান। নিজের সংসারের স্বপ্নের কথা জানতে চাইলে তিনজনই চোখের জল ফেলেন।