বিশ্বের বৃহত্ গণতান্ত্রিক দেশ ভারতে আবারো মাওবাদীরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। দমন অভিযানের কারণে প্রতিশোধের আগুনে জ্বলছে তারা। স্বাধীনতার দাবিতে আন্দোলনকারী মাওবাদীদের নানা নামে ডাকে ভারতের মূলধারার লোকেরা। কিন্তু যে নামেই ডাকুক না কেন দেশটির বিভিন্ন রাজ্যে নিজেদের শক্তিশালী অবস্থান আবারো দেখিয়ে দিল কমিউনিস্ট পার্টি অব ইন্ডিয়া (সিপিআই-মাওবাদী)। সঙ্গে সঙ্গে প্রকাশ পেলো নিরাপত্তা বাহিনীর ব্যর্থতাও। গত ২৫ মে দেশটির মধ্যাঞ্চলীয় ছত্তিশগড় রাজ্যে মাওবাদীদের হামলায় কংগ্রেসের সিনিয়র নেতাসহ ২৯ জনের নিহত হওয়ার ঘটনায় পুরো ভারতে এখন আলোচনায় এই গোষ্ঠীটি। আর এই ঘটনায় রাজ্যের ক্ষমতাসীন দল ভারতীয় জনতা পার্টিকে (বিজেপি) দায়ী করেছে কংগ্রেস। এর আগেও তাদের সন্ত্রাসী কার্যক্রমের বলি হয়েছেন নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যসহ অনেক নিরাপরাধ মানুষ। ভারত সরকার এদের দমনের কথা বললেও সফল অভিযান চালাতে পারেনি। আগামী অক্টোবরে অনুষ্ঠিতব্য বিধানসভার নির্বাচনে এর সুফল নিতে মরিয়া কংগ্রেস।
ভারতের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রধান বিপদ হয়ে দাঁড়িয়েছে মাওবাদী জঙ্গিরা। এরা দেশের কেন্দ্রীয় ও পূর্বের রাজ্যগুলোতে সক্রিয়। দেশে নিষিদ্ধ অতি বামপন্থী সংগঠন সিপিআই-মাওবাদী দেশের কংগ্রেসের সিনিয়র রাজনৈতিক নেতাদের ওপর হামলা করে ২৯ জন হত্যার দায় স্বীকার করেছে। কংগ্রেসের রাজ্য সভাপতি নন্দ কুমার প্যাটেল, প্রবীণ নেতা (৮৪ বছর) বিদ্যাচরণ শুক্লা, রাজ্যের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহেন্দ্র কর্মাসহ অনেকেই এই হামলায় নিহত হন। জঙ্গিদের এই হামলা কেন্দ্রীয় সরকারের অক্ষমতাই প্রমাণ করেছে। রাজ্যের বিধানসভা নির্বাচনের প্রচারণায় প্রাক্কালে এই হামলার ঘটনা ঘটলো। তাছাড়া আগামী ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনেও এ নিয়ে তুমুল হৈচৈ হবে। নির্বাচনের আগে আরো হামলার আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। রাজনৈতিক বিশ্লেষক সের্গেই তোমিন মনে করেন, বাস্তবে তারা ভারতে রাষ্ট্রের ভিতরে রাষ্ট্র তৈরি করেছে। ২৫ মে’র হামলার প্রধান লক্ষ্য ছিল উপজাতীয় নেতা মহেন্দ্র কর্মা। তিনি ২০০৫ সালে রাজ্য সরকারের সমর্থন নিয়ে ‘সালওয়া জুডুম’ (শান্তি মিছিল) নামে এক মাওবাদীবিরোধী বেসামরিক বাহিনী গঠন করেন। মানবাধিকার লঙ্ঘন ও শিশু সৈন্য নিয়োগের জন্য এ বাহিনীর সমালোচনা করা হয়। ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০১১ সালে অসাংবিধানিক অভিহিত করে সালওয়া জুডুম অবৈধ ঘোষণা করলেও তার কার্যক্রম কিছুটা হলেও চলে। মাওবাদীরা চার পাতার দীর্ঘ বিবৃতিতে জানিয়েছে, এই আক্রমণ হাজার হাজার লোকের হত্যার প্রতিবাদে করা হয়েছে যা সালওয়া জুডুম বাহিনীর যোদ্ধা ও সরকারের বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী এই রাজ্যে আগে করেছে। এবারে মাওবাদী জঙ্গিদের আক্রমণ বিগত তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে বড় ঘটনা। এর আগে ২০১০ সালে এক হামলায় জঙ্গিরা ৭৬ জন পুলিশকে হত্যা করেছিল।
কংগ্রেস নেতাদের ওপর হামলার ঘটনায় কেন্দ্র-রাজ্য তথা কংগ্রেস বা বিজেপির সংঘাতের ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে বলে মনে করেন পর্যবেক্ষকরা। আর বিতর্কের অস্ত্রে শান দিতে শুরু করেছে দুই পক্ষই। কেন্দ্রীয় সরকার এবং কংগ্রেস অভিযোগ করেছে, কংগ্রেস দলের নির্বাচনী প্রচারণা পরিবর্তন যাত্রা’র ১৫ দিন আগে মাওবাদীদের হামলার বিষয়ে রাজ্য সরকারকে সতর্ক করা হয়েছিল। কিন্তু বিজেপি নেতা রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী রমন সরকার ব্যবস্থা নেয়নি। অথচ গত ১৮ মে ছত্তিশগড়ে নরেন্দ্র মোদির সভার সময় কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। রমনের নির্বাচনী প্রচারণা বিকাশ যাত্রায়ও নিরাপত্তার কমতি ছিল না। হামলার পরেই প্রথমে কংগ্রেসের সভানেত্রী সোনিয়া গান্ধী, সহ-সভাপতি রাহুল গান্ধী এবং প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং রায়পুর সফর করেন। ইউপিএ সরকার ও কংগ্রেস হাইকমান্ড বিষয়টিকে কতটা গুরুত্ব দিতেছেন তা এই সফরের মাধ্যমেই প্রমাণ হয়। তাই তাদের এ সফর কেবল দলীয় মনোবল রক্ষার উদ্দেশ্যেই নয়, রাজ্য এবং জাতীয় রাজনীতিতে বিজেপিকে মোকাবেলাও এর অন্যতম উদ্দেশ্য বলে মনে করা হচ্ছে।
