ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ বা টিআইবি বলেছে, সংসদ বর্জনের যে চর্চা চলে আসছে তা থেকে বেরিয়ে আসা প্রয়োজন। কারণ এটা দেশের জন্য তো বটেই; বার বার আন্তর্জাতিক?ভাবেও দেশকে বিব্রতকর পরিস্থিতির মধ্যে ঠেলে দিচ্ছে। দুর্নীতি বিরোধী এ সংস্থা বর্তমানে সদস্যপদ বাতিলের জন্য সংসদ অধিবেশনে ৯০ কার্যদিবস অনুপস্থিতির যে বিধান রয়েছে তা আইন করে কমিয়ে ৩০ কার্যদিবস করার সুপারিশ করেছে।
রবিবার রাজধানীর ব্র্যাক সেন্টার মিলনায়তনে টিআইবি’র উদ্যোগে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য প্রকাশ করা হয়। টিআইবির পক্ষ থেকে প্রথমেই প্রকাশ করা হয় ‘পার্লামেন্ট ওয়াচ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদন। এরপর সাংবাদিকদের নিকট টিআইবির সুপারিশ তুলে ধরেন সংস্থাটির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান। সুপারিশে বলা হয়, পঞ্চম সংসদ থেকে বিরোধী দলের সংসদ অধিবেশন বর্জন করা শুরু হয়েছে। বর্তমানে নবম সংসদে এসে বর্জন ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। এর প্রধান কারণ হলো নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার রাজনীতি। বিজয়ী হলেই কেবল সংসদ আমাদের, নইলে না।
সুপারিশে আরো বলা হয়, আমাদের দেশে সংসদ বর্জনের যে ব্যতিক্রমী চর্চা শুরু হয়েছে তা বলতে গেল প্রায় প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেছে। সংসদ অধিবেশনে সর্বোচ্চ সময় উপস্থিতি থাকার বিষয়টি জবাবদিহিতার মাধ্যমে নিশ্চিত করার কথা বলা হয়।
নবম সংসদের প্রথম দিন থেকে সংসদ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে টিআইবির এই তৃতীয় প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়। টিআইবি ২০১১ সালের জানুয়ারি থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত অষ্টম থেকে পঞ্চদশ অধিবেশন পর্যবেক্ষণ করেছে। এতে বলা হয়, বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া গত চার বছরে মাত্র আট দিন সংসদ অধিবেশনে যোগ দিয়েছেন। গত দুবছরে যা মাত্র দুদিন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধান বিরোধী দল নবম জাতীয় সংসদের গত দুবছরে আটটি অধিবেশনের ১৬৩ কার্যদিবসের মধ্যে ১৫৩ কার্যদিবসই সংসদে যায়নি। তাদের অনুপস্থিতির হার শতকরা ৯৩ ভাগ। গত চার বছরের হিসাবে এর হার শতকরা ৮৩ ভাগ। প্রতিবেদনে বলা হয়, গত দুবছরে সাতটি অধিবেশনের মধ্যে বিরোধী দল ছয়টি অধিবেশনই পুরোপুরি বর্জন করেছে।
এক প্রশ্নের জবাবে ড. ইফতে?খারুজ্জামান বলেন, পৃথিবীর কোন দেশেই সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি নেই। বিশ্বব্যাপী প্রতিবাদের ভাষা হলো ওয়াক-আউট। সংসদ সদস্যরা প্রতিবাদের ভাষা হিসাবে দিনে ১০ বারও ওয়াক-আউট করতে পারেন। সংসদ বর্জন হলো মাথা ব্যথার জন্য মাথা কাটা। সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দেন গবেষণার সাথে সম্পৃক্ত জুলিয়েট রোজেটি, মোরশেদা আকতার ও ফাতেমা আফরোজ।
টিআইবির পরিসংখ্যানে দেখানো হয়েছে একজন সংসদ সদস্যের জন্য দৈনিক রাষ্ট্রীয় সম্মানী ও সুযোগ-সুবিধার আর্থিক মূল্য কমপক্ষে তিন হাজার ৫৫৮ টাকা। এ হিসাবে প্রধান বিরোধী দলীয় জোটের নবম সংসদের প্রথম থেকে পঞ্চদশ অধিবেশন পর্যন্ত সংসদ বর্জনে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে চার কোটি এক লাখ ৩৪ হাজার টাকা। প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধান বিরোধী দল বা জোটের সংসদ বর্জনের ধারা উদ্বেগ জনকভাবে বেড়েছে।
এতে বলা হয়েছে, ২০০৯ সালে মোট কার্যদিবসের শতকরা ২৭ ভাগ প্রধান বিরোধী দল সংসদে উপস্থিত ছিল। কিন্তু ২০১২ সালে এ হার কমে দাঁড়ায় শতকরা ৪ ভাগে। চলতি নবম সংসদের অষ্টম থেকে পঞ্চদশ অধিবেশনে মোট ১৬৩ কার্যদিবসের মধ্যে প্রধান বিরোধী দল ১৫৩ কার্যদিবস বা প্রায় ৯৩ দশমিক ২৫ ভাগ কার্যদিবসে সংসদ অধিবেশন বর্জন করে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি ও বিরোধী দল উভয়কেই তাদের স্ব স্ব নির্বাচনী অঙ্গীকার ও জনগণের প্রত্যাশার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া উচিত। দুবছরের পর্যবেক্ষণে সংসদের ১৬৩ কার্যদিবসে সংসদ কার্যক্রম চলেছে ৫০২ ঘণ্টা ১৯ মিনিট। যা প্রতিদিন প্রায় তিন ঘণ্টা। বছরে ৮১ দিন। যুক্তরাজ্যের হাউজ অব কমন্সে এর পরিমাণ প্রতিদিন আট ঘণ্টা এবং বছরে ১৪৭ দিন। ভারতের লোকসভায়ও অধিবেশন চলে দিনে ছয় ঘণ্টা।
গত দুবছরে সরকারি দলের সংসদ সদস্য কর্নেল (অব.) এএ মারুফ সাকলান (নীলফামারী-৪) সর্বোচ্চ ৯৯ ভাগ অধিবেশনে এবং প্রথম দুবছর শতভাগ অধিবেশনে যোগদান করেন। অপরদিকে কেউ কেউ মাত্র ১১ ভাগ অধিবেশনে উপস্থিত ছিলেন। গত দুবছর সংসদ নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৬৩ কার্যদিবসের মধ্যে ১৪০ কার্যদিবস অধিবেশনে যোগদান করেন। যার পরিমাণ শতকরা ৮৬ ভাগ। পূর্ববর্তী দুবছরে এর পরিমাণ ছিল শতকরা ৭২ ভাগ। সার্বিকভাবে গড় উপস্থিতি ২১৪ জনের। যা প্রথম দুবছরের তুলনায় (শতকরা ৬৭ ভাগ) কমে দাঁড়িয়েছে শতকরা ৬১ ভাগে। সবচে বেশি উপস্থিতি ছিল চতুর্দশ অধিবেশনে গড়ে ২২৫ জন ও সবচে কম পঞ্চদশ অধিবেশনে গড়ে ২০১ জন।
প্রধান বিরোধী দলের সংসদ সদস্যদের সর্বোচ্চ উপস্থিতি শতকরা ১৬ ভাগ এবং সর্বনিম্ন শতকরা প্রায় ২ ভাগ। একমাত্র স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য মোহাম্মদ ফজলুল আজিমের অধিবেশনে যোগদান ছিল শতকরা ৬৫ ভাগ। যা পূর্ববর্তী দুবছরের (শতকরা ৬৮ ভাগ) থেকে কম। বিরোধী দলীয় জোটের বাইরে থাকা বিরোধী দল এলডিপির ড. অলি আহমেদ বীর বিক্রম মাত্র শতকরা ২০ ভাগ কার্যদিবসে সংসদে যোগদান করেন।
প্রধান বিরোধী দল ২০০৯ সালে ৮৬ কার্যদিবসের মধ্যে ২৩ কার্যদিবস, ২০১০ সালে ৮৮ কার্যদিবসের মধ্যে ২১ কার্যদিবস, ২০১১ সালে ৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সাত কার্যদিবস এবং গত বছর ৮৩ কার্যদিবসের মধ্যে মাত্র তিন কার্যদিবস সংসদ অধিবেশনে উপস্থিত ছিল।
