মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে আসা রোগীদের পদে পদে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। সংক্রামক রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিত্সা তো পানই না বরং পড়েন নানা বিড়ম্বনায়। ভ্যাকসিন নিতে আসলে রোগীদের বলা হয়, ভ্যাকসিন নেই, পরে আসেন। তবে পকেট থেকে টাকা বের করলে ঠিকই মেলে প্রয়োজনীয় ভ্যাকসিন।
স্বাস্থ্য প্রশাসনের প্রধান কার্যালয় মহাখালী স্বাস্থ্য অধিদফতরের কাছে গড়ে ওঠা বিশেষায়িত এই হাসপাতালে নেই বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক। রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য যন্ত্রপাতি থাকলেও নেই জনবল। হাসপাতালের যে অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, তাতে কোন রোগীর সুস্থ হওয়া দূরের কথা উল্টো আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়বে। এছাড়া অপ্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ক্রয়, ভবন চুনকাম ও মেরামতের নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেয়ার অভিযোগ রয়েছে এ হাসপাতালের কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে। গতকাল সোমবার সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে হাসপাতালটির করুণ চিত্র। হাসপাতালে প্রবেশের রাস্তা ভাঙ্গাচোরা, এখানে সেখানে গর্ত। একটু বৃষ্টিতে জমে হাঁটু পানি। শোনা গেছে, গর্তে পড়ে অনেক রোগী মারাত্মক আহতও হয়েছেন।
হাসপাতালের চারদিকে বস্তি, ময়লা-আবর্জনায় ভরা। দুর্গন্ধে টেকা দায়। হাসপাতালের ভেতরেও ময়লা- আবর্জনার স্তূপ। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ। ছিনতাইকারী, মাদক ব্যবসায়ীসহ সংঘবদ্ধ অপরাধী চক্র হাসপাতাল চত্বরে থাকে দিনরাত। প্রায়ই রাতে রোগী ও তাদের আত্মীয়-স্বজনরা ছিনতাইকারীদের খপ্পরে পড়ে খোয়াচ্ছেন নগদ অর্থসহ অন্যান্য সামগ্রী। হাসপাতালটি অপরাধীদের অন্যতম একটি স্পট হয়ে উঠেছে বলে জানান পুলিশের এক কর্মকর্তা।
ভবনের লিফটের বয়স ৪১ বছর। যে একটি অ্যাম্বুলেস ছিল তাও বহু বছর আগে বিকল হয়ে পড়ে রয়েছে। নেই কোন সরকারি যানবাহন।
হাসপাতালটির প্রধান থাকার কথা একজন সিনিয়র কনসালটেন্টের (মেডিসিন)। অথচ বর্তমানে হাসপাতালটির প্রধান অর্থোপেডিক সার্জন। যার এখানে প্রয়োজন নেই। তিনি শুধু প্রশাসনিক কার্যক্রম দেখাশুনা করছেন। হাসপাতালের বাকি চিকিত্সকরা মেডিক্যাল অফিসার। সংক্রামক রোগ সম্পর্কে যাদের কোন প্রশিক্ষণ কিংবা অভিজ্ঞতা কোনটিই নেই। আবার বেশিরভাগ সময়ই চিকিত্সকরা হাসপাতালে থাকেন না।
প্যাথলজি বিভাগে বিশেষজ্ঞ কোন চিকিত্সক নেই। সেই পদে রয়েছেন একজন গাইনি বিশেষজ্ঞ চিকিত্সক। এক্স-রে মেশিন আছে, তবে এটি পরিচালনার জন্য নেই রেডিওলজিস্ট ও টেকনেশিয়ান। তাই এক্স-রে করা হয় না। আলট্রাসনোগ্রাম পরীক্ষার জন্য নেই জনবল।
বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, ভাবতে অবাক লাগে যে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে কোন পরীক্ষাই হয় না। অথচ পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছাড়া চিকিত্সা দেয়া রীতিমতো ঝুঁকিপূর্ণ।
হাসপাতালটিতে প্রতিদিন কুকুর, বিড়াল ও শিয়ালের কামড়ে আক্রান্ত প্রায় চার শতাধিক রোগী আসে। তাদের ভ্যাকসিন দিতে হয় নিয়মিত। আক্রান্তদের প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় ক্যাটাগরিতে ভ্যাকসিন দেয়ার নিয়ম রয়েছে। সর্বশেষ ডোজ হিসেবে সকল আক্রান্তের র্যাবিস ইমোনোগ্লোবিন (আরআইজি) দিতে হয়। ভ্যাকসিনের প্রথম ডোজ দেয়ার পর পরবর্তী ডোজের জন্য রোগী আসলে একটি সংঘবদ্ধ প্রতারক দল রোগীকে জানিয়ে দেয় যে, ভ্যাকসিন নেই। পরে আসেন। তবে কিছু নগদ অর্থ হাতে ধরিয়ে দিলে বেরিয়ে আসে ভ্যাকসিন। টাকা দেয়ার আগ পর্যন্ত রোগী ভ্যাকসিনের জন্য চিকিত্সকের কাছে পৌঁছতে পারেন না।
গত শনিবার আকলিমা নামে এক গৃহবধূর সর্বশেষ ডোজের ভ্যাকসিন নিতে গেলে তাকে দুইবার ফিরিয়ে দেয়া হয়। বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা জানান, সময়মতো ভ্যাকসিন না দিলে তা তেমন কার্যকর হয় না।
স্বাস্থ্য অধিদফতর সূত্রে জানা গেছে, সরকারিভাবেই চার ডোজ ভ্যাকসিন সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে সরবরাহ করা হয়ে থাকে। কিন্তু হাসপাতালে বেশিরভাগ সময়ই আরআইজি ভ্যাকসিন পাওয়া যায় না। তবে ৬৪টি জেলায় স্বাস্থ্য অধিদফতর থেকে কুকুরের কামড়ের ভ্যাকসিন সরবরাহ করা হচ্ছে নিয়মিত।
স্বাস্থ্য অধিদপতরের পরিচালক (রোগী নিয়ন্ত্রণ) ও লাইন ডাইরেক্টর (সিডিসি) অধ্যাপক ডা. বেনজীর আহমেদ বলেন, চাহিদা অনুযায়ী মোটামুটিভাবে ভ্যাকসিন সরবরাহ হচ্ছে। মাঝে মাঝে আরআইজি ভ্যাকসিনের সংকট দেখা দেয়। এতকিছুর মধ্যে ভ্যাকসিন নিয়মিত সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে।
সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালের প্রধান ডা. জগদীশ চন্দ্র ঘোষ গতকাল ইত্তেফাককে বলেন, দেশের সংক্রামক ব্যাধির পূর্ণাঙ্গ চিকিত্সা সেবার এ প্রতিষ্ঠানটি জনবল সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত। রোগীদের চিকিত্সা সেবার স্বার্থে এগুলো নিরসনের তাগিদ দিতে পারি কিন্তু প্রতারকদের বিরুদ্ধে আমাদের কিছু করার নেই।
