স্বাধীনতা সংগ্রামে মানিক ভাই’র অবদানের কাহিনী অনেকেরই অজানা। পক্ষান্তরে, আমার ব্যক্তিগত জীবনে মানিক ভাই’র প্রভাব যে কত গভীর, তা ভাষায় ব্যক্ত করার মত নয়। ১৯৪৩ সাল থেকে তাঁর সাথে আমার পরিচয়। সে পরিচয়ের পর থেকে সারাটা জীবন আমরা দু’ভাই একসাথে জনগণের অধিকার অর্জনের সংগ্রাম করেছি। সে সংগ্রাম সাধনার পথের বাঁকে বাঁকে একে যে অন্যের প্রতি কোনদিন মান-অভিমানও করিনি, তা নয়। তবে তা ছিল ক্ষণিকের বিভ্রমের মত। একটা বিষয়ে আমরা উভয়েই একমত ছিলাম এবং তা হল, বাংলার স্বাধীনতা। স্বাধীনতা ভিন্ন বাঙালির মুক্তি নেই, এ বিষয়ে আমাদের মাঝে কোন দ্বিধাদ্বন্দ্বের অবকাশ ছিল না। আর ছিল না বলেই নানা ঘাত-প্রতিঘাতের মধ্যেও দু’জন দু’ফ্রন্টে থেকে কাজ করছি। আমি কাজ করেছি মাঠে-ময়দানে আর মানিক ভাই তাঁর ক্ষুরধার লেখনীর সাহায্যে।
দৈহিক অর্থে মানিক ভাই আজ আর আমাদের মাঝে নেই। কিন্তু তাঁর স্মৃতি অনির্বাণ দীপশিখার মত উজ্জ্বল। আজ তাঁর এই মৃত্যুদিবসে বাংলাদেশের রাজনীতিতে বিরোধী দল সংগঠনে আমাদের উভয়ের সংগ্রামের কথা ভাবতে যেয়ে আমি সবচেয়ে বেশি বেদনা বোধ করছি। তদানীন্তন পাকিস্তানের শাসক ও কায়েমী স্বার্থ চক্র কী সুপরিকল্পিত উপায়ে এদেশের শিল্প-সংস্কৃতি ও ভাষা-সাহিত্যের বিনাশ সাধন করতে চেয়েছিল, সামপ্রাদয়িকতার বিষবাষ্পে সবকিছু বিষময় করে তোলার চেষ্টা করেছিল, তা সকলেরই জানা। মানিক ভাই তাঁর লেখনীর সাহায্যে সে ঘৃণ্য চক্রান্তের বিরুদ্ধে সজাগ করে তুলেছিলেন এ দেশের মানুষকে। মানুষের যদি স্মৃতিবিভ্রম ঘটে না থাকে তা’হলে সে-সব কাহিনী তাদের ভুলে যাবার কথা নয়। এদেশে যখন মুখ ফুটে কথা বলার অধিকার ছিল না, যখন মানুষের হয়ে মানুষের কথা বলার এবং বিরোধী দলীয় চিন্তা-ভাবনা তুলে ধরার মত কেউ ছিল না, তখন মানিক ভাই-ই তাঁর লেখনীর সাহায্যে পালন করেছেন সে গুরুভার দায়িত্ব। আর সে দায়িত্ব পালন করতে যেয়ে বিভিন্নবার বিচিত্ররকম দুর্ভোগ তাঁকে পোহাতে হয়েছে। মানিক ভাই যতবার জেলে গেছেন, শুধু রাজনৈতিক কারণে একজন সাংবাদিক বা সংবাদপত্র সম্পাদকের তত দীর্ঘ কারাবরণের নজির পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল।
রাজনীতি সম্পর্কে মানিক ভাই’র ধারণা ছিল অত্যন্ত স্পষ্ট ও স্বচ্ছ। রাতের পর রাত, দিনের পর দিন মানুষের অধিকারের বিষয় নিয়ে আমরা আলোচনা করেছি। তখন মানিক ভাই’র মাঝে এদেশ এবং দেশের মাটি ও মানুষের প্রতি যে ভালবাসা লক্ষ্য করেছি, তা আমাকে অভিভূত করেছে। মানুষের প্রতি তাঁর ভালবাসা এবং অনুভূতির প্রখরতা এত সুগভীর ছিল যে, মানুষ কি চায়, কি ভাবে- সহজেই তিনি তা বুঝতে পারতেন এবং তা তুলে ধরতেন লেখনীর মাধ্যমে।
১৯৫৮ সালে আইয়ূবের মার্শাল ল’ জারি হবার পর মানিক ভাইকে সামরিক আইনবলে আটক করা হয়। তাঁর বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের সর্বোচ্চ শাস্তি ছিল ১৪ বছর সশ্রম কারাদণ্ড। বলাবাহুল্য, আমিও তখন জেলে। আমাকে রাখা হয়েছে একটি নির্জন সেলে। দিন-রাত্রির দীর্ঘ দুঃসহ প্রহর একা একা যাপন করি। এমন সময় খবর পেলাম মানিক ভাইকেও গ্রেফতার করে আমার পার্শ্ববর্তী কক্ষে আটক রাখা হয়েছে। দুই ভাই জেলের পাশাপাশি দু’কক্ষে থাকি। কিন্তু দেখা-সাক্ষাত্ করার উপায় নেই। কারণ, কর্তৃপক্ষ কড়া নির্দেশ দিয়েছেন কোনক্রমেই যেন আমাদের মাঝে দেখা-সাক্ষাত্ না ঘটে। অবশ্য, সে কড়া নির্দেশ সত্ত্বেও আমরা পরস্পরের সাথে দেখা-সাক্ষাত্ করার সুযোগ করে নিয়েছিলাম। একদিন এমনি এক সাক্ষাত্কারকালে মানিক ভাই জানালেন, সরকার পক্ষ তাকে আপোষ করার অনুরোধ জানিয়েছেন। আমি জিজ্ঞেস করলাম আপনি কি বলেছেন? মানিক ভাই উত্তর দিলেন ‘চৌদ্দ বছর জেল খাটতে হয় সেও কবুল। কিন্তু নীতির প্রশ্নে আপোষ চলে না। এ কথাই ওদের জানিয়ে দিয়েছি’। কিছুক্ষণ নীরব থেকে আবার বললেন, ‘আসলে কি জানেন, ওরা আপনার উপরই আরও অত্যাচার চালাবে। কেননা তাদের ধারণা আপনার উপর বাংলার মানুষের অগাধ বিশ্বাস। তাই কোনক্রমে যদি আপনাকে শেষ করা যায়, তাহলে সব ঝামেলাই শেষ হয়ে যাবে। তারপর নিজেই আমাকে ভরসা দিয়ে বললেন, অবশ্য এতে ঘাবড়াবার কিছু নেই। সফল আপনি হবেনই’।
আজ এ মর্মন্তুদ বিয়োগ ব্যথার দিনে মনে পড়ে এমনি আরও কত কথা, কত ছবি। ১৯৬২ সাল। শ্রদ্ধেয় নেতা শহীদ সোহরাওয়ার্দীকে জেলে নেবার অল্প কয়েকদিন পর আমরা দু’ভাইও কারাগারে নিক্ষিপ্ত হয়েছি। তবে সান্ত্বনার কথা এই যে, এ যাত্রা দু’জনকে দু’টি স্বতন্ত্র সেলে আটক করা হয়নি, রাখা হয় একই কক্ষে। ফলে পারস্পরিক মত-বিনিময়ের সুযোগ ঘটে। দেশের ভূত-ভবিষত্ নিয়ে প্রায় সর্বক্ষণ আলাপ-আলোচনা করি। সেই আলাপ-আলোচনার সময় নীতির প্রতি মানিক ভাই’র যে অবিচল আস্থা দেখতে পাই, সত্যি বলতে কি, তা আমাকেও যুগপত্ প্রভাবিত ও মোহিত করে। তা’ছাড়া আমার প্রতি মানিক ভাই’র ভালবাসা ও আস্থা যে কত গভীর, তা যেন আমি তখন আরও স্পষ্টভাবে অনুভব করি। অথচ, অনেকেই জানতো না একথা। জানতো না মানিক ভাই কত ভালবাসতেন আমাকে। তাই ক্ষণিকের বিভ্রমের মত যখন আমাদের মধ্যে মান-অভিমান দেখা দিয়েছে তখন অনেকেই গেছেন নিজ নিজ উদ্দেশ্যে মানিক ভাইকে প্ররোচিত করতে। কিন্তু তাদের নিরাশ হতে হয়েছে। আমার বিরুদ্ধে বলে মানিক ভাই’র প্রিয় হতে যাঁরা গেছেন, তাঁদের মধ্যে অনেক সম্মানী ব্যক্তিকেও মানিক ভাই সোজাসুজি ঘর থেকে বের করে দিতে দ্বিধা করেননি।
সকলেই জানেন, আইয়ুবের শাসনামলে আমাকে বার বার কারাগারে নিক্ষেপ করা হয়। ফলে, একসময় এমন এক অবস্থার সৃষ্টি হয় যে, ভয়ে বন্ধু-বান্ধবদেরও অনেকে আমার পরিবারের খোঁজ-খবর নিবার সাহস হারিয়ে ফেলেন। কিন্তু কোন অবস্থাতেই যিনি ভয় পাননি এবং আমার অবর্তমানে আমার পরিবারের পেছনে পাহাড়ের মত যেয়ে যিনি দাঁড়াতেন, তিনি হলেন মানিক ভাই। তাই আমার কারাজীবনকালে মানিক ভাই যদি বাইরে থেকেছেন, তা’হলে পরিবার সম্পর্কে আমি অনেকটা নিশ্চিত থাকতে পেরেছি। আর বিশেষত এর জন্য তাঁর সম্পর্কে বলতে যেয়ে আমার মনে পড়ছে আরও অনেক কথা। ১৯৪৯ সাল। আড়াই বছর যাবত্ আমি জেলে। মানিক ভাই’র ভারি দুর্দিন। প্রায় সর্বস্ব হারিয়ে কলকাতা থেকে তিনি এসেছেন। শহীদ সাহেবের অনুসারী আমরা। সরকার আমাদের উপর ভীষণ ক্ষিপ্ত। এমন দুরবস্থা আমাদের যে, ঢাকার বাড়ীওয়ালারা পর্যন্ত আমাদের বাড়ী ভাড়া দিতে চায় না। সেদিন কোর্টে আমাকে হাজির করা হয়েছে। মানিক ভাই কোর্টে এলেন। বললেন, একটা সাপ্তাহিক কাগজ বের করার ইচ্ছা ছিল কিন্তু সাধ্যে কুলোচ্ছে না। মানিক ভাইকে তখন কেন্দ্রীয় সরকার তথ্য দফতরের ডেপুটি সেক্রেটারীর পদে নিয়োগপত্র দিয়েছে। সে নিয়োগপত্র তাঁর পকেটে। ভাবলেশহীনভাবে তিনি বললেন, ‘করাচী চলে যাই, কি বলেন?’ ‘তা’হলে আমাদের প্রচেষ্টা বিঘ্ন হবে না?’ জবাব দিলাম আমি। মানিক ভাই বললেন, ‘আচ্ছা ঠিক আছে, যাব না। ছেলেপুলে নিয়ে পানের দোকানদারী করে খাব, সেও ভাল। তবু ওদের চাকরি নয়’। নীতির প্রশ্নে এই যে অবিচলতা, এর দৃষ্টান্ত কি খুব সুলভ? নীতির প্রতি মানিক ভাই’র অবিচলতার এই প্রমাণ পরবর্তী সময়েও পেয়েছি অসংখ্যবার। ১৯৬৬ সাল। ছয় দফা আন্দোলনের প্রবল জোয়ারকে প্রতিরোধ করতে অক্ষম হয়ে আইয়ূব সরকার আমাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছে। এর কিছুদিন পর মানিক ভাইও জেলে এসে মিলিত হলেন আমার সাথে। ছয় দফা আন্দোলনের প্রেক্ষিতে তাঁকেও আটক করা হয়েছে, বাজেয়াফত করা হয়েছে ইত্তেফাকের ছাপাখানা। ১৯৬৬ সালে গ্রেফতার হবার পর পুরো তিন বছর আমাকে বন্দী-জীবন-যাপন করতে হয়। আমার বিরুদ্ধে শুরু করা হয় আগরতলা মামলা। অনেকেই জানেন না, মানিক ভাইকেও সে মামলার আসামী করার চেষ্টা করা হয়েছিল।
সে মানিক ভাই আজ নেই। যদিও তাঁর মৃত্যু সম্পর্কে আজও আমি সন্দিহান। আজও আমার মনে পড়ে সেই রহস্যময় চিঠির ক’টি কথা, ‘আপনারা পিণ্ডি বা করাচী আসবেন না। আপনাদের মেরে ফেলা হবে’। প্রায় প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে লুঙ্গি পরেই আমি মানিক ভাই’র বাসায় যেয়ে চা খেতাম। সেদিনও চা খাচ্ছি। আর আলোচনা করছি দেশের রাজনৈতিক বিষয় নিয়ে। হঠাত্ মানিক ভাই বললেন, ‘পিণ্ডি থেকে একটা চিঠি পেলাম। প্রেরকের পরিচয় বলা নেই। তবে তাতে বলা আছে আমি এবং আপনি যেন পিণ্ডি বা করাচী না যাই। গেলেই নাকি আমাদের মেরে ফেলা হবে।’ তারপর হেসে তিনি নিজেই বললেন, ‘আমাকে কে মারবে? আর মারবেই বা কেন? মারলে বরং আপনাকেই মারতে পারে’। আমি বললামঃ ‘তবু কি দরকার যাবার। না গেলেই কি নয় মানিক ভাই?’ মানিক ভাই বললেন, ‘দেখেই আসি না। তা’ছাড়া ওরাও খবর পাঠিয়েছে। দু’একদিনের মাঝেই ফিরে আসব ইন্শাআল্লাহ’। মানিক ভাই গেলেন। কিন্তু ফিরে আসলেন নিষ্প্রাণ দেহে। মানিক ভাই’র কথা যখন ভাবি তখন আজও আমার মনে পড়ে সে রহস্যময় চিঠির কথা। মনে হয় শহীদ সাহেবকে যেভাবে হত্যা করা হয়েছে পিণ্ডির ইন্টারকন্টিনেন্টাল হোটেলে রহস্যজনকভাবে ডেকে নিয়ে যেয়ে মানিক ভাইকেও হয়তো হত্যা করা হয়েছে সেভাবেই।
বাংলার মাটি, বাংলার জল, বাংলার বায়ু, বাংলার ফলের প্রতি মানিক ভাই’র ছিল অসীম অনুরাগ। এদেশের দুঃখী মানুষকে তিনি ভালবাসতেন প্রাণ দিয়ে। আর তাই তিনি সংগ্রাম করেছেন আমৃত্যু। ত্রিশ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে বাংলাদেশ আজ স্বাধীন হয়েছে। শহীদ সাহেবের পরলোক গমনের পর আমার দৃষ্টিতে সবকিছু যখন অন্ধকারময় বোধ হচ্ছিল, তখন মানিক ভাই দিয়েছেন অসীম প্রেরণা ও সাহস। আজ এই মুক্ত বাংলায় বেঁচে থাকলে অনেক সাহায্যই তিনি করতে পারতেন। অবশ্য, ইয়াহিয়া বাহিনী তাঁকে জীবিত রাখত কিনা সেটাও একটা কথা। কেননা, স্বাধীন দেশে বুদ্ধিজীবীর অভাব ঘটানোর জন্য যে সুপরিকল্পিতভাবে ওরা সিরাজ, শহীদ (শহীদুল্লাহ কায়সার) প্রমুখ বুদ্ধিজীবীকে হত্যা করেছে, তাতে মানিক ভাইকে ওরা জীবিত রাখত, মনে হয় না। আজ মানিক ভাই যদিও আমাদের চোখের সামনে নেই, তবু তিনি অমর। তাঁর নীতি ও আদর্শের মাঝেই তিনি বেঁচে থাকবেন আবহমানকাল। এদেশের মানুষের জীবনে যদি দু’বেলা দু’মুঠো ভাতের নিশ্চয়তা বিধান করা যায়, যদি গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়, যদি অন্যায়-অত্যাচারের কবল থেকে মানুষকে রক্ষা করা যায়, তবেই তাঁর স্মৃতির প্রতি পরিপূর্ণ ও সত্যিকার শ্রদ্ধা জ্ঞাপন সম্ভব হবে। তাই দৈহিক অর্থে তিনি না থাকলেও আদর্শ ও নীতিতে তিনি চিরঅমর। তাঁর আত্মা আজ ঘুরে বেড়াচ্ছে বাংলার প্রতি ঘরে, কারণ বাংলাদেশ আজ স্বাধীন।
