পিরোজপুর জেলায় ধানচাষ এলাকা কমে যাচ্ছে। এর মূল কারণ ব্যাপকভাবে উঁচু ও মাঝারি উঁচু জমি বসতবাড়ি তৈরি, নদী ভাঙ্গন, ইটভাটাসহ অন্যান্য কাজে ব্যবহার হচ্ছে। বিভাগীয় সূত্রে জানা গেছে, গত দুই বছরে এ জেলায় ৩৩৯৪ হেক্টর আবাদী জমি কমেছে। গত ২০০৯-২০১০ বছরে জেলায় মোট আবাদযোগ্য জমি ছিল ৮৯৪৫০ হেক্টর। বর্তমানে আবাদযোগ্য জমি ৮৬০৫৬ হেক্টর। এ হিসাবে বছরে আবাদযোগ্য জমি হ্রাসের পরিমাণ কম-বেশি ১৭০০ হেক্টর। এছাড়া জেলায় কৃষি জমির টপসয়েল বিক্রি হওয়ায় ধান উত্পাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আশার কথা জেলায় প্রতিবছর যান্ত্রিক কৃষির অধীনে জমি ব্যবহারের পরিমাণ ক্রমশ বাড়ছে। বর্তমানে এখানের সাত উপজেলায় ট্রাক্টর ১০টি, পাওয়ার টিলার ১৯০০, পাওয়ার পাম্প ২৯৬০টি, ড্রাম সিডার ১৪১টি, ফসল মাড়াই যন্ত্র ৯৮১টি এবং গুটি ইউরিয়া তৈরির যন্ত্র ২৮টি। এছাড়া সেচের অধীনে রয়েছে ১৯,১৮০ হেক্টর জমি। এর ফলে কৃষকের উত্পাদন ব্যয় বাড়লেও শ্রম ও সময় সাশ্রয় হচ্ছে।
সাধারণত এ জেলায় কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয় না। গত অর্থবছরে ১৮টি ফসলের অধীনে কৃষি ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৯৯ কোটি ৯৮ লাখ ২৫ হাজার টাকা, পাশাপাশি বিতরণ করা হয়েছে ৮৯ কোটি ৫৭ লাখ ৪০ হাজার টাকা। ২০০৮-২০০৯ অর্থবছরের এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, জেলা কৃষি ঋণ বিতরণের ১৯১.৪১ লাখ টাকা আর বিতরণ হয়েছে মাত্র ৮৭.৫ লাখ। এ জেলায় তিন মৌসুমের মধ্যে প্রধান ফসল রোপা আমন বাদে অন্য দুই মৌসুমে মোট ১০৪৭৬৪ হেক্টর জমি পতিত থাকে। এর প্রধান কারণ ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত মাঠের ৮০ ভাগ জমিতে স্থানীয় জাতের রোপা আমন থাকায় শীতের শাক-সবজি, মরিচ, ডাল, গম ও সরিষা ফসল আবাদের সময় থাকে না। আবার পরে চাষ করলে এসব ফসল জোয়ারের পানিতে ডুবে যায় এবং ফলন মার খায়। এছাড়া কৃষি জমির স্বাস্থ্যহানি, কৃষি শ্রমিকের অভাব, বৃষ্টি নির্ভর আউশ চাষ, শুকনা মৌসুমে মাটি কঠিন-শক্ত থাকে, অসমতল জমি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি, পানি প্রবাহের উত্স নদ-নদী ও খাল ভরাট হয়ে যাওয়া, শীতের স্থায়িত্ব ও তীব্রতা কম, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, বৃষ্টি নির্ভর আউশ এবং অতি জোয়ারের চাপ, জুলাই-আগস্টে সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত, প্রতিনিয়ত ফসল আবাদ এবং ধানের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষি বিভাগের মতে, এসব কারণে এ জেলায় পতিত জমি সহসাই আবাদের আওতায় আনা সম্ভব হয় না। কৃষি বিভাগ সংশ্লিষ্ট কৃষক সংগঠনে যুক্তরা জানান, পতিত জমি আবাদ করতে হলে লবণাক্ত, বন্যা ও খরা সহনশীল ধানের জাত উদ্ভাবন, স্বল্প জীবন চক্রের রোপা আমনের জাত সৃষ্টি, দেরিতে বপনযোগ্য গরম ও খরা সহিষ্ণু গম, ডাল ও সরিষা ফসলের জাত উদ্ভাবন করা খুবই জরুরি। এছাড়া চাষাবাদের সর্বস্তরে ক্রমান্বয়ে যান্ত্রিক পদ্ধতির প্রবর্তন, বিনামূল্যে উফশী বীজ সরবরাহ, প্রশিক্ষণ, কম ভাড়া বা দামে কৃষকদের মধ্যে ফ্রাকশনাল পাম্প ও কর্ষণযন্ত্র সরবরাহ, ভর্তুকি সাহায্য বৃদ্ধি, জৈবসার, সবুজ সার উত্পাদন, মাটি পরীক্ষা, শস্য বিন্যাস পরিবর্তন এবং যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন ও ধানের বাজার মূল্য নিয়ন্ত্রণে সমন্বিত ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে উত্পাদন বৃদ্ধি কোনোক্রমেই সম্ভবপর হবে না। দক্ষিণাঞ্চলে কৃষি পরিবেশের প্রধান ঝুঁকি লবণাক্ততা। বর্তমানে ক্রমশই জমি ও পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ সহনশীল মাত্রা অতিক্রম করে চলছে। পিরোজপুর জেলায় বর্তমানে কম করে প্রায় ২৯০০ হেক্টর জমি প্রতি মিটারে ২.১৪ ডিএস থেকে ৮০১ থেকে ১২ ডিএস। পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ গত মে মাসের পরীক্ষায় দেখা গেছে, বলেশ্বর নদীতে ২০৪৮ ডিএস, কঁচা নদীতে ০.২৫ ডিএস। মে মাসের শেষ দিকে জোয়ারের পানিতে লবণাক্ততার পরিমাণ বেশি দেখা যায়। এ ছাড়া জেলার গত বছর মার্চ মাসের প্রতিবেদনে দেখা গেছে, মঠবাড়িয়া উপজেলার আমুয়ায় জোয়ারের পানিতে লবণাক্ততা ৩.৮৪ ডিএস এবং নাজিরপুর শেখমাটিয়া বলেশ্বর নদ অংশে ১.৯৮ ডিএস, জিয়ানগরের পানগুছি নদীতে ১.৪০ ডিএস, মঠবাড়িয়ার তুষখালী নদীতে ৩.২ ডিএস, মঠবাড়িয়ার সাপলেজা খালে ৫.৮৫ ডিএস, সদরের চরখালী ফেরিঘাট সংলগ্ন কঁচা নদীতে ৩.৫৪ ডিএস এবং কঁচা নদীর তেলীখালী অংশে ৩.৯৫ ডিএস। ২০১০ সালের পরীক্ষায় নাজিরপুরের বলেশ্বর নদে কুমারখালী বাজার অংশে ৩-৩.১৯ ডিএস, উলারচরে ৩.৫৭ ডিএস, কালীগঙ্গা নদীর খেজুরতলা অংশে ২-২.৫৬ ডিএস। মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট বরিশাল সূত্রে জানা এসব পরীক্ষার ফলাফল বিশ্লেষণ করে জেলায় কৃষি সমপ্রসারণ বিভাগ উদ্বিগ্ন, কারণ ভূ-পৃষ্ঠস্থ পানিতে নিরাপদ লবণাক্ততার পরিমাণ প্রতি মিটার ০.৭৫ ডিএস এবং ক্ষতিগ্রস্ত মাত্রা ০.৭৫ থেকে ৩.০ ডিএস। জমিতে ৪.১ থেকে ৮.০০ (এস-২ ক্যাটাগরি) ডিএস এবং ৮.১ থেকে ১২ (এস-৩ ক্যাটাগরি) ডিএস মাত্রা ক্ষতিকর বলে জানা গেছে। পিরোজপুর জেলা সমুদ্র উপকূলবর্তী হওয়ায় নিয়মিত জোয়ার-ভাটা কারণে ফসলী জমিতে লবণাক্ততা ছড়িয়ে পড়ে। মাটি ও পানির লবণাক্ততা জুলাই-আগস্ট মাসে সবচেয়ে কম, জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাসে মধ্যম মাত্রা এবং মার্চ-এপ্রিল মাসে সবচেয়ে বেশি থাকে। এই লবণাক্ততা অঞ্চল ও সময়ভেদে ভিন্নতর হয়। সময়কাল হিসাবে এখানে রবি খরিপ-১, খরিপ-২ মৌসুমের ফসল লবণাক্ততার কারণে কম-বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকে। কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, লবণাক্ততার প্রভাব এড়াতে খরিপ মৌসুমে জুলাই-আগস্টের মধ্যে সঠিক সময়ে রোপা আমন চারা রোপণ এবং স্বল্পজীবন কালের ব্রিধান ৩১, ৩২ ও ৩৩, ৩৯, ৪০, ৪১ জাত চাষ। রবি মৌসুমে ব্রিধান-৫৫, ব্রিধান-২৮সহ চীনাবাদাম, ভুট্টা, টমেটো, পালং, বাঁধাকপি, আলসীম, গাজর, পিঁয়াজ, মূলা, মরিচ, তেল ফসল ইত্যাদি চাষ করা যায় এবং সর্বোপরি সঠিক সময়ে চারা রোপণ করলে লবণাক্ততা এড়ানো যায়। রবি মৌসুমে সেচ সমস্যা, খরা, অনাবৃষ্টি, লাঙ্গলের গরুর অভাব, পশুখাদ্যের অভাব, জমি প্রস্তুতে সমস্যা, নিচু এলাকায় রবি ফসল জোয়ারে নষ্ট হওয়া, আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার না করা, পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা না থাকা এবং মানসম্পন্ন উফশী বীজ ব্যবহার না করায় লবণাক্ততার কারণে বোরো, শীতকালীন শাক-সবজি ও ডাল-তেল ফসল চাষ বিঘ্নিত হয়। তবে লবণাক্ততা সহনশীল বিনাজাতের বীজ ব্যবহার করলে ক্ষতির পরিমাণ কম হতে পারে। এ ব্যাপারে দক্ষ করে তুলতে কৃষকদের অবিরাম প্রশিক্ষণ দরকার। বর্তমানে পিরোজপুর জেলায় চাষী পর্যায়ে উন্নতমানের ধান, ডাল ও তেলবীজ উত্পাদন প্রকল্প, ধানের ফলন পার্থক্য কমানো প্রকল্প, CSISA-B-SRSPDS প্রকল্প, গুটি ইউরিয়া ব্যবহার বৃদ্ধিকল্পে আইএফডিসি-আপি প্রকল্প, মাটির স্বাস্থ্য সুরক্ষায় জৈবসার-সবুজ সার উত্পাদন ও ব্যবহার প্রকল্প, মাটিতে জৈবসার বৃদ্ধিকল্পে খামারজাত সার প্রদর্শনী, শস্য বহুমুখীকরণ প্রকল্প, ডিজাস্টার এন্ড ক্লাইমেট রিস্ক ম্যানেজমেন্ট ইন এগ্রিকালচার প্রকল্প এবং আইসিএম-আইএফএম প্রকল্পের অধীনে ব্যাপক সংখ্যক কৃষক-কৃষাণীদের উন্নত কৃষি উপকরণ, প্রশিক্ষণ এবং পরামর্শ সহায়তা দেয়া হচ্ছে বলে বিভাগীয় সূত্রে জানা গেছে। পাশাপাশি মাঠ পর্যায়ে পরিবেশসম্মত উপায়ে ধান ও সবজি চাষাবাদে কৃষকদের মাঠ স্কুল পরিচালনার পর প্রশিক্ষিত কৃষকদের সমন্বয়ে জেলায় ইতিমধ্যে ৩৫৮টি আইপিএম-আইসিএম কৃষক ক্লাব গঠন করা হয়েছে। ইতিমধ্যে এসব ক্লাবে আর্থিক অনুদান দিয়ে কৃষি ক্লাবের আয়বর্ধন প্রকল্প গ্রহণ, সমবায় ভিত্তিক কৃষি উন্নয়ন কার্যক্রম এবং সদস্যদের মাসিক সঞ্চয়ের মাধ্যমে তহবিল গঠন করে কৃষক-কৃষাণীদের ব্যক্তিগত পুঁজি গঠনে উত্সাহিত করা হচ্ছে। এছাড়া জেলায় এলজিইডি’র অধীন পানি ব্যবস্থাপনা সমবায় সমিতির অধীনে কাউখালী ভাণ্ডারিয়া উপজেলায় বৃক্ষরোপণ, মাছচাষ, মৌসুম ভিত্তিক সমন্বিত চাষাবাদ এবং সদস্য সঞ্চয়ের মাধ্যমে কৃষকদের সক্ষম করে তোলার উদ্যোগ ইতিমধ্যে সাফল্য লাভ করেছে। এ জেলায় গত ২০১০ সাল থেকে এ সময়কাল পর্যন্ত ১,০৩,৬২৩ জন কৃষক-কৃষাণীকে কৃষি উপকরণ সহায়তা কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। এরমধ্যে প্রান্তিক, ক্ষুদ্র এবং মাঝারিসহ মোট ৩৫,৫০০ কৃষক ১০ টাকা জমা দিয়ে ইতিমধ্যে বিভিন্ন ব্যাংকের গ্রাহক হয়েছেন। এ পর্যন্ত মোট ২৩,২০৬ জন কৃষককে বোরো ধান চাষে ডিজেল ভর্তুকিতে নগদ টাকা এবং ধান-ভুট্টা চাষে তিনবার উপকরণ সহায়তা হিসাবে বীজ-সার বিতরণ করা হয়। এতে সরকারের কৃষিখাতে দেয়া মোট ভর্তুকির পরিমাণ টাকার হিসাবে ১৫ কোটি ৭০ লাখ ৬৩ হাজার টাকা। তবে বর্তমানে অধিকাংশ আর্থিকভাবে অসচ্ছল প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র কৃষকের ব্যাংক হিসাবে কোন ধরনের লেন-দেন না থাকায় এসব হিসাব অলস অবস্থায় রয়েছে।
লেখক- ফ্রি ল্যান্স সাংবাদিক
