পিরোজপুর জেলার চারটি সংসদীয় আসন পুনর্বহাল চাই

আপডেট : ০৩ জুন ২০১৩, ২৩:৫২
হারাধনের ১০টি ছেলে—কয়টি গেলে, কয়টি থাকে ? এই প্রবাদের মর্মার্থ গভীরভাবে উপলব্ধি করা পিরোজপুর জেলাবাসীর জন্য আজ সময়ের আবশ্যকতা। বিলাইয়া দেওয়া বা আত্মত্যাগের মহিমা আমাদের কতটা বঞ্চিত করিয়াছে তাহা ভাবিয়া দেখিবার জন্য অপেক্ষা করা বোধ করি আর সমীচীন নহে কিংবা বুদ্ধিমানেরও কাজ হইবে না। দেওয়ালে পিঠ ঠেকিয়া যাওয়া অথবা দেখি না কী করে- এহেন কোন্ঠাসা, দুর্বল, আলস্য তথা আত্মঘাতী মানসিকতা ঝাড়িয়া ফেলিয়া নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় রুখিয়া দাঁড়ানোর এখনই সময়। কারণ যাহা হারাইয়াছি বা কাড়িয়া লওয়া হইয়াছে তাহা কিঞ্চিত হইলেও ফিরাইয়া পাওয়ার সুযোগ লওয়াই হইল বুদ্ধিমানের কাজ। সঠিক সময় সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করিলে অতীতের মতই আবার মোটা মাশুল গুণিতে হইবে। সার্বিক অবস্থার মর্মার্থ অনুধাবন করিয়া সময়ের সদ্ব্যবহার করিতে পারিলে ক্ষতি কিছুটা হইলেও পোষানো যেমন সম্ভব হইবে তেমনি পুঞ্জীভূত মর্মজ্বালা খানিকটা হইলেও জুড়াইবে। আজ পিরোজপুর জেলায় জাতীয় সংসদের আসন তিনটি , অথচ সাবেক মহকুমা আমলে বাংলাদেশের প্রথম সংসদে পিরোজপুরের এই আসন সংখ্যা ছিল পাঁচটি। যেমন ছিল থানা বা উপজেলার সংখ্যা ১০টি, যাহা প্রায় চার যুগের আত্মোত্সর্গের উদারতার ধারাবাহিকতায় বিসর্জন দিতে দিতে হারাধনের মত পুনঃ পুনঃ সন্তান হারানোর বিয়োগ বেদনায় বিলাপ করা ছাড়া পিরোজপুরবাসীর গত্যন্তর নাই। ১৯৬৮ সালে পটুয়াখালীকে জেলা করিবার সময় বরগুনা থানাকে মহকুমায় উন্নীত করিতে বামনা ও পাথরঘাটা থানা যখন পিরোজপুর মহকুমা হইতে আলাদা করা হয় তখন হইতেই শুরু হয় পিরোজপুরের অঙ্গচ্ছেদ। ১৯৭৩ সালের প্রথম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নিম্নরূপ পাঁচটি আসন পিরোজপুরে ছিল যথা, পিরোজপুর-১ (সদর ও কাউখালী),পিরোজপুর-২ (ভাণ্ডারিয়া-কাঠালিয়া) পিরোজপুর-৩ (মঠবাড়িয়া), পিরোজপুর-৪ (স্বরূপকাঠি-বানারীপাড়ার আংশিক) এবং পিরোজপুর-৫ (নাজিরপুর-বানারীপাড়ার আংশিক)। ১৯৭৪ সালে ঝালকাঠিকে মহকুমা করা হইলে কাঠালিয়া পিরোজপুর হইতে বিচ্ছিন্ন হইয়া যায়। ১৯৭৯ সালের সংসদ নির্বাচনে তখন পিরোজপুরের আসন হ্রাস করিয়া চার-এ আনা হয়। সদর ও নাজিরপুর , কাউখালী ও ভাণ্ডারিয়া, মঠবাড়িয়া এবং বানারীপাড়া ও স্বরূপকাঠি এই পরিচয়ে থানা বিভাজনে সংসদীয় আসন পুনর্বিন্যাস করা হইয়াছিল তখন। ১৯৮৬ , ৮৮,৯১, ৯৬তে দুইটি এবং ২০০১ এই এলাকা ধরিয়াই আরও ছয়টি নির্বাচন পর পর অনুষ্ঠিত হয়। ২০০৮-এর নির্বাচনে বানারীপাড়াকে বরিশালের উজিরপুরের সহিত সংযুক্ত করিয়া বরিশাল বিভাগের ৪১টি আসন দুইটি কমাইয়া ৩৯ করা ও ঢাকায় বাড়ানোর জন্য স্বার্থান্বেষী মহলের আঁঁটা কূট বুদ্ধিতে দক্ষিণ বাংলার মানুষকে বরাবরের মত আবারও ঠকানো হইল। ১৯৮৮ সালে বানারীপাড়া উপজেলা পিরোজপুর হইতে বরিশাল জেলায় অন্তর্ভুক্ত করিবার মোক্ষম সুযোগটি গ্রহণ করিয়া বাকেরগঞ্জের সহিত পিরোজপুর আসনটি (স্বরূপকাঠি /নেছারাবাদ-বানারীপাড়া) বিলুপ্ত করা হয়। বর্তমান পিরোজপুর জেলায় তাই আসন সংখ্যা তিনটিতে নামিয়া আসিয়াছে। গত ৪০ বত্সরে পিরোজপুর হইতে দুইটি উপজেলা অন্য জেলায় যুক্ত হইয়াছে যেমন, তেমনি দুর্ভাগ্যের বিষয় হইল সঙ্গে সঙ্গে সংসদীয় আসনও কমিয়া গেল দুইটি। সংসদীয় আসন হ্রাসের সহিত যে আমরাও বঞ্চিত হইতেছি আসনভিত্তিক সকল উন্নয়ন বরাদ্দ হইতে তাহা উপলব্ধি করা দরকার । আসলে আমরা পিরোজপুরের মানুষজন বরাবরই একটু গা বাঁচাইয়া চলিতে সাচ্ছন্দ্যবোধ করি। বানারীপাড়া যখন জেলা হইতে চলিয়া গেল তখন কেহ কোন গা করি নাই, কিন্তু সাত উপজেলার পিরোজপুর যে ছয় উপজেলার হইয়া এ গ্রেড হইতে বি গ্রেড জেলায় ডিমোশন পাইয়াছে তাহা টের পাইতে কুম্ভকর্ণের দীর্ঘ সময় লাগিয়াছে। ২০০২ সালের ২১ এপ্রিল সদর উপজেলা বিভক্ত করিয়া জিয়ানগর নামে নূতন একটি উপজেলা সৃষ্টির মাধ্যমে এ কলংক থেকে মুক্তি ঘটে। পিরোজপুর জেলার মানুষের উন্নয়নের স্বার্থে চারটি সংসদীয় আসন পুনরায় ফিরাইয়া পাইতে হইলে এখনই ঐক্যবদ্ধভাবে সচেষ্ট হইতে হইবে। নিজেদের ন্যায্য হিস্যা তথা অধিকার আদায়ে নিজেদেরই সক্রিয় ভূমিকা গ্রহণ করিতে হইবে। তাহা না হইলে যাহারা সকল স্বার্থ কেন্দ্রীভূত করিতেছেন তাহাদের সহিত বোঝাপড়া করা যাইবে না। উন্নয়ন ও সম্পদ এক জায়গায় কেন্দ্রীভূত করিয়া তাহারা কাহাদের জন্য উহা সঞ্চয় করিতেছেন তাহা অনুধাবন করিবার সময় এখন। যাহাদের কাছে বাংলাদেশকে বন্ধক রাখিয়া অর্থ কর্জ করা হয়, তাহাদের সন্তুষ্টি ও মনোরঞ্জনের জন্য যে ব্যবস্থা দেশে বহাল আছে তাহারই ধারাবাহিকতা হইল তৃণমূলে বসবাসকারীদের বঞ্চিত করার অপচেষ্টা। কর্জদাতা ও সাহায্যদাতাদের উন্নয়ন দেখাইতে হয় বলিয়া সংখ্যাগরিষ্ঠদের ঠকানো হইতেছে। ইহার যে বিষ সমাজ দেহে ছড়াইয়া পড়িতেছে বা ইহার দ্বারা দেশের সর্বত্র যে বিষক্রিয়া সৃষ্টি হয় তাহা যে এক সময় কেন্দ্রকেই গিলিয়া ফেলে ইহা আমাদের স্মরণ রাখা উচিত। ইহার পরিণতি সকল সময় কেন্দ্রকেই ভোগ করিতে হয়।