শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিয়ে আপন মহিমায় ভাস্বর হয়ে আছে মঠবাড়িয়ার কেএম লতিফ ইনস্টিটিউশন। সন্নিহিত বলয় পেরিয়ে সারাদেশ তথা প্রবাসেও যার দিপ্তি। দক্ষিণাঞ্চলের ঘরে ঘরে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শিক্ষা বিকাশের অবদান যে বিদ্যালয়টির তার আদিতে রয়েছে একটি অর্থবহ ঐতিহ্যমণ্ডিত নাম খাস মহল লতিফ।
প্রতিষ্ঠাকাল ১৯২৮ সালে, স্থায়ী স্বীকৃতি প্রাপ্তি ১৯৪২-এ কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এ বাতিঘরের রূপকার বরিশালের মেহেন্দীগঞ্জ উপজেলার উলানিয়া চৌধুরী পরিবারের সন্তান তত্কালীন মঠবাড়িয়ার খাস মহল অফিসার খান বাহাদুর আবদুল লতিফ চৌধুরী। যে সরকারি পদবিটি বৃটিশ শাসনকালে থানা সদরের শীর্ষ পদ ছিল, যার উত্তরাধিকার পরে আরসিও ও বর্তমানে সহকারি কমিশনার (ভূমি)। যাদের অনুদানে এ প্রতিষ্ঠানের গোড়াপত্তন, ব্যাপ্তি ও বিকাশ তারা হলেন বাকেরগঞ্জের তত্কালীন ম্যাজিস্ট্রেট জেটি ডনোভন, মঠবাড়িয়ার খাস মহল অফিসার বা আরসিও (রেভিনিউ সার্কেল অফিসার) ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতা খান বাহাদুর আবদুল লতিফ চৌধুরী, মঠবাড়িয়ার খান সাহেব হাতেম আলী জোমাদ্দার এমএলএ, মৌলভী খবির উদ্দিন আহমেদ, এসজেএইচ কুণ্ডু, আরকে রায় (শিক্ষক), এইচএল চক্রবর্তী প্রমুখ।
১৫.৬২ একর ভূমির উপর অবস্থিত এ বিদ্যালয়ের বর্তমান ছাত্র সংখ্যা ১৩০০, যার ছেলে-মেয়ে অনুপাত যথাক্রমে ৬০:৪০। সহশিক্ষা ব্যবস্থার হলেও ছেলে ও মেয়েরা ভিন্ন ভিন্ন সেকশনে পাঠ গ্রহণ করে। প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তফা জামান খানসহ ৩৮ জন শিক্ষক এখানে এখন শিক্ষাদানে রত, যারা অতীতের স্বনামধন্য শিক্ষক এমাদুল হক, শামসুল হক, আবদুল মজিদ, মো. ইসমাইল হোসেন, নূরুল ইসলাম, মো. আবদুর রহিমের উত্তরসূরি।
জাতীয় নেতা মহিউদ্দিন আহমেদ, সাবেক তত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ফখরুদ্দিন আহমেদ, বর্তমান এমপি ডা. আনোয়ার হোসেন, সাবেক এমপি ডা. রুস্তম আলী ফরাজী ও আবদুল জব্বার ইঞ্জিনিয়ার, সাবেক সচিব ডিএন বেপারী, অতিরিক্ত সচিব নুর মোহাম্মদ আকন ও বি মজুমদার, কৃষিবিদ এমএ সামাদ, রাজউকের চেয়ারম্যান ফজলুল হকসহ অজস্র খ্যাতিমান রত্ন এ বিদ্যালয়ের ছাত্র ছিলেন।
১৯৮৮ ও ১৯৯৩ সালে বিভাগের শ্রেষ্ঠ মাধ্যমিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠান হিসেবে জাতীয় পুরস্কার অর্জনকারী এ বিদ্যালয়ের ভাণ্ডারে জমা মাধ্যমিক পর্যায়ে উল্লেখযোগ্য ফলাফল হচ্ছে ১৯৩৮ সালে কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে সপ্তম, ১৯৫৫ ঢাকা বোর্ডে পঞ্চম, ১৯৬৫ ঢাকা বোর্ডে অষ্টম, ১৯৬৬ যশোর বোর্ডে প্রথম, ১৯৬৭ যশোর বোর্ডে প্রথম, ১৯৭২ যশোর বোর্ডে তৃতীয়, ১৯৭৩ যশোর বোর্ডে তৃতীয়, ১৯৮২ যশোর বোর্ডে প্রথম ও ষষ্ঠদশ, ১৯৮৩ যশোর বোর্ডে তৃতীয়, ১৯৮৪ যশোর বোর্ডে প্রথম, ১৯৮৯ যশোর বোর্ডে চতুর্দশ স্থান অর্জন। নতুন পদ্ধতির জিপিএ-৫ প্রাপ্তির বছর ওয়ারি বিবরণ হচ্ছে— ২০০৬-১০টি, ২০০৭ -৭টি, ২০০৮- ১৯টি, ২০০৯- ২৬টি, ২০১০- ৩৫টি, ২০১১ -২৮টি, ২০১২ -২৪টি, ২০১৩- ৩৫টি।
মঠবাড়িয়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে বিশাল ক্যাম্পাসে অবস্থিত তীর্থভূমিতে বিদ্যমান অবকাঠামোগত সুবিধার মধ্যে রয়েছে একটি দ্বিতল একাডেমিক ভবন, একটি দ্বিতল বিজ্ঞান ভবন, একটি দ্বিতল লাইব্রেরি, একটি একতলা একাডেমিক ভবন, টিনের একটি একাডেমিক ভবন। ছাত্রাবাস ১টি দ্বিতল (মুসলিম), ১টি টিনসেড (হিন্দু)।
শিক্ষা বহির্ভূত কার্যক্রমে বার্ষিক ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক প্রতিযোগিতা, স্কাউটিং, বনভোজন, শিক্ষা সফর অন্যতম। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে শাহাদাত্ বরণকারী কেএম লতিফ ইনস্টিটিউশনের দশম শ্রেণীর ছাত্র গোলাম মোস্তফার মহান স্মৃতিতে ক্যাম্পাসে রয়েছে শহীদ মোস্তফা খেলার মাঠ। মুক্তিযুদ্ধের অমর শহীদ মেধাবী ছাত্র আনোয়ারুল কাদির ও গণপতি হালদারও এ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। এ বিদ্যালয়ের শিক্ষা মহিমার ব্যঞ্জনাগত দিক খুঁজে পাওয়া যায় পিরোজপুর সরকারি মহিলা কলেজের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ প্রফেসর শেখ সাইদুর রহমানের একটি মন্তব্যে। তার ভাষ্যমতে মহিলা কলেজের হোস্টেলে অবস্থান করে অধ্যয়নরত মেয়েদের একটি বড় অংশ মঠবাড়িয়া থেকে আসা এবং লেখাপড়ায় আন্তরিক ও মেধাবী। বিশেষত ইংরেজি বিষয়ে ভাল। এ সকল ছাত্রী মঠবাড়িয়ার বিভিন্ন বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল, যেখানের প্রধান শিক্ষক বা ইংরেজি শিক্ষকগ মঠবাড়িয়া কেএম লতিফ ইনস্টিটিউশনের কিংবদন্তি ইংরেজি শিক্ষক এমাদুল হকের ছাত্র। ইংরেজির সাথে যে এ প্রতিষ্ঠানের অন্য বিষয়েরও গতি সমান্তরাল তার সমর্থন পাওয়া গেল এ বিদ্যালয়ের ৭৩ ব্যাচের ছাত্র ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের শিক্ষক ডা. আলী আকবরের কথায়। তিনি জানালেন, তার সমসাময়িক ছাত্রসহ পূর্বাপর কয়েক ডজন ডাক্তার-ইঞ্জিনিয়ার ও প্রশাসন ক্যাডারের সদস্য হয়েছেন এখানের প্রাক্তন ছাত্রদের মধ্য থেকে। তিনি আরো জানালেন, এ বিদ্যালয়ে এক সময় সাতটি ছাত্রাবাস ছিল দূর-দূরান্তের শিক্ষার্থীদের জন্য।
বিদ্যালয় প্রধান শিক্ষক মো. মোস্তফা জামান খান পাশের বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলার মানুষ। বর্তমান কর্মস্থলে তিনি খুবই গর্বিত ও তৃপ্ত, দক্ষিণাঞ্চলের ঐতিহ্য এ কেএম লতিফ ইনস্টিটিউশনের প্রধান হয়ে। তিনি বিদ্যালয়ের সুনাম ধরে রাখতে চান পূর্বসূরিদের পদাঙ্ক অনুসরণ করে। তবে প্রতিষ্ঠানের অবকাঠামোগত অবস্থান নিয়ে বর্তমানে খুবই উদ্বিগ্ন। পুরোনো একটি একাডেমিক ভবন ব্যাবহার অনুপযোগী, যেখানে ঝুিঁকপূর্ণ অবস্থায় ছেলে-মেয়েদের পাঠদান করতে হচ্ছে। একটি মডেল টাইপ ভবনের দাবী পূরণের চেষ্টা চলছে বেশ কিছু দিন ধরে কিন্তু সফল হচ্ছেন না। অথচ এ বিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রদের মধ্যে নামজাদা কেউ একজন এগিয়ে এলেই হয়তো সমাধান হবে এই সমস্যার।
