পিরোজপুর জেলার সন্নিহিত অঞ্চল এক সময় পূর্ব সাগর বা লবণ সাগরে নিমজ্জিত ছিল। কোন এক অজানাকালে গাঙ্গেয় কটাল পলল ভূমির এ অংশে গঙ্গা নদী হতে উত্সারিত পলিমাটি ধীরে ধীরে বিস্তৃত হয়ে ব-দ্বীপ আকারে স্থলভাগ সৃষ্টি করে। ১৩ শতকে এ অঞ্চলের ভূমি নাব্য ছিল। প্রাগৈতিহাসিক যুগে পাবনী ও হলদিনী নদীর প্রবাহিত পলিমাটি দিয়ে পিরোজপুর সদর, জিয়ানগর, নাজিরপুর ও স্বরূপকাঠি ও কাউখালী উপজেলা আকারপ্রাপ্ত হয়েছে। এ ছাড়া মঠবাড়িয়া ও ভাণ্ডারিয়া উপজেলা গঠন হয়েছে মূলত বঙ্গোপসাগর উত্থিত পলল দ্বারা। জেলার দক্ষিণ অঞ্চলের কিছু এলাকা এককালে সুন্দরবনের অংশ ছিল বলে জানা যায়।
পিরোজপুর জেলা কঁচা, বলেশ্বর, কালিগঙ্গা, মধুমতি, পানগুছি, বেলুয়া, সন্ধ্যা ও পোনা নদ-নদী এবং অসংখ্য খালবেষ্টিত এক সৌন্দর্যমণ্ডিত জনপদ। প্রাকৃতিক কারণে এখানের ভূমি উর্বর। এ অঞ্চল জোয়ার-ভাটা প্রবণ। ২৪ ঘণ্টায় দুইবার জোয়ার-ভাটা ছয় ঘণ্টা করে স্থায়ী হয়। বর্ষাকালে নাজিরপুর উপজেলার নিম্নাঞ্চলসহ বেশ কিছু এলাকায় জুন থেকে অক্টোবর পর্যন্ত জলমগ্ন থাকে। এখানকার জলবায়ু উষ্ণ ও আর্দ্র এবং বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত কম-বেশি ২০০ সেন্টিমিটারে। জুলাইসহ আগস্টের ১ম সপ্তাহ পর্যন্ত সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাত হয়।
বঙ্গোপসাগর নিকটবর্তী হওয়ায় এখানে লবণাক্ততার ঝুঁকি রয়েছে। বর্তমানে পানি ও মাটি উভয় ক্ষেত্রেই লবণাক্ততা দেখা যায়। মৌসুমী বায়ু প্রবাহের কারণে মে-জুন এবং অক্টোবর-নভেম্বর মাসে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আঘাত দৃশ্যমান। পিরোজপুর জেলার অর্থনীতি প্রধানত কৃষি তথা ধানচাষ নির্ভর। গত দশকে এ অঞ্চলের ৭০ ভাগ মানুষের পেশা কৃষিনির্ভর হলেও তা এখন কমে দাঁড়িয়েছে সরাসরি ৫০ ভাগে। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, ১৯০৫ সালে পিরোজপুরে পরিবার প্রতি আবাদী জমি ছিল গড়ে ৩.৩০ একর। বর্তমানে এ হার এক একরের অনেক কম। পর্যায়ক্রমে জেলার প্রধান ফসল রোপা আমন এরপর রোপা আউশ ও বোরো ধানের চাষ হয়। এছাড়া অর্থকরী ফসলের মধ্যে রয়েছে নারিকেল, সুপারী, পান, কলা, পেয়ারা ও আমড়া। সামপ্রতিককালে মাঝারি আকারে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে শাক-সবজি ও ফল বাগানসহ বহুমুখী ফসল আবাদের প্রবণতা দেখা যায়।
পিরোজপুর জেলায় দারিদ্র্যের শিকার জনসংখ্যার অর্ধেকেরও কম মানুষ। এখানকার বড় ও মাঝারি কৃষক নিজেরা চাষাবাদ করেন না। প্রান্তিক, ক্ষুদ্র ও বর্গা কৃষকই মূলত চাষাবাদের সাথে জড়িত। বর্তমানে দারিদ্র্যের কারণে ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষক ভূমিহীন হয়ে পড়ায় অনেকেই কৃষি কাজ ছেড়ে কৃষি শ্রমিক বা দিনমজুর পেশাশ্রয়ী হয়ে পড়েছেন। বাদ বাকি সংখ্যাগরিষ্ঠ কৃষক প্রান্তিক ও ক্ষুদ্র হওয়ায় তাদের পুঁজির অভাব প্রকট। এ কারণে কৃষিখাতে বিনিয়োগ কমতে থাকায় কৃষি বিকাশ ও কাঙ্ক্ষিত ফলন বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। জেলায় মোট কৃষক পরিবার ১,৮৩,৯৯০টি। এরমধ্যে ভূমিহীন কৃষক পরিবার ৪০,১৩৭, প্রান্তিক কৃষক পরিবার ৭১,৭৬৭, ক্ষুদ্র কৃষক পরিবার ৪৬,৮৪২, মাঝারি কৃষক পরিবার ২০,৮৫৫ ও বড় কৃষক পরিবার ৪,৪৮০টি। জেলায় বর্তমানে সাত উপজেলায় আবাদযোগ্য জমি আছে ৮৬,০৫৬ হেক্টর (২লাখ ১২ হাজার ৫৫৮ একর)। স্থায়ী পতিত জমি ৩,৩৯৪ হেক্টর। জেলায় দুই ফসলী জমির পরিমাণ বেশি ৪৫,১৬১ হেক্টর। এক ফসলী জমি ৩৩,৯৬৩ হেক্টর এবং সবচেয়ে কম তিন ফসলী জমির পরিমাণ ৬,৯৩২ হেক্টর মাত্র। আর প্রধান তিনটি শস্যবিন্যাস হচ্ছে পতিত-পতিত-রোপা আমন ২৬,৬৭৭ হেক্টর (৩৪%) এবং বোরো পতিত-পতিত ৮,৬০৬(১০%) হেক্টর। এ হিসাবে রবি মৌসুমে পতিত থাকে ৫০,১৩১ হেক্টর, খরিপ এক মৌসুমে (১৬ মার্চ-৩০ জুন) ৫৪,৬৩৩ হেক্টর এবং খরিপ দুই মৌসুমে (১জুলাই-১৫ অক্টোবর) ১৪,৩৭৬ হেক্টর। জেলার নাজিরপুর উপজেলায় ভাসমান পদ্ধতিতে ৫০ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষ হয়। বিরল এ চাষ পদ্ধতি ইতিমধ্যে বাংলাদেশ কৃষি বিজ্ঞানীদের মনোযোগ আকর্ষণ করেছে। জেলা কৃষি সমপ্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত তিন মৌসুমের মধ্যে খরিপ ১ এ রোপা আউশ ধান চাষ হয়েছে ২৪,৯৭০ হেক্টর (লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৪,০৮৬ হেক্টর কম), উত্পাদন ৫৩,৮৩৭ মেট্রিক টন চাল। এছাড়া ১৪৭ হেক্টরে ১,৪৫৬ বেলপাট, ৩০৩ হেক্টর ২,৪২৪ বেল মেস্তা এবং ১৪১ হেক্টর জমিতে ৩৮০ মেট্রিক টন হলুদ।গত রবি মৌসুমে বোরো ধান চাষ হয় ১৯,৮০০ হেক্টরে উত্পাদন হয় ৮১,৩৩৬ মেট্রিক টন চাল। এছাড়া ভুট্টা ৪১৫ হেক্টর ২,৪৯০ মেট্রিক টন, মুগ ১,১৯৫ হেক্টরে ১১৭ মেট্রিক টন, খেসারি ১১০৪৫ হেক্টর ১১,০৪৫ মেট্রিক টন, ৪,৭৩৫ হেক্টর জমিতে ৭৫,৭৬০ মেট্রিক টন শাক-সবজি, ১,২০২ হেক্টরে ২৫,২৪২ মেট্রিক টন আলু, ৭৬৬ হেক্টরে ১১,৪৯০ মেট্রিক টন মিষ্টি আলু, ৪৩৮ হেক্টরে ৮,৭৬০ মেট্রিক টন তরমুজ, ৪৩৪ হেক্টরে ২৬ মেট্রিক টন আখ, ৬০৬ হেক্টরে ৪৮৫ মেট্রিক টন মরিচ এবং ১১৮ হেক্টরে ১,১৮০ মেট্রিক টন ফুটিফল। গত খরিপ দুই মৌসুমে মোট ৬৮,৯৭০ হেক্টর জমিতে ১,৩৪,৫৯৩ মেট্রিক টন চাল উত্পাদিত হয়। বিভাগীয় সূত্র জানায়, গত ২,০১১ খরিপ ও মৌসুমে ৩২,৮১২ মেট্রিক টন আউশ ধান চাষ হলেও গত ২,০১২ খরিপ মৌসুমে এর চেয়ে ৭,৮৪২ হেক্টর কম জমিতে আউশ চাষ হয়। উত্পাদন খরচের চেয়ে ধানের বাজারদর কম পাওয়ায় কৃষক আউশ চাষে আগ্রহ হারাচ্ছে বলে জানা গেছে। তবে একই মৌসুমে ২৫৯০ হেক্টর জমিতে ৩০,০২২ মেট্রিক টন শাক-সবজি উত্পাদিত হয়। একই কারণে গত বছর ২০১০ সালের চেয়ে ৮২৫ হেক্টর কম জমিতে বোরো ধান চাষ হয়। আবার গত ২০১১ মৌসুমে আগের চেয়ে ২,০৬৬ হেক্টর বেশি জমিতে রোপা আমন ধান চাষ হয়। এ জেলায় গত ২০১১-২০১২ মৌসুমে ১২১০৫ হেক্টর জমিতে ফল চাষ হয়। উত্পাদন হয় ৯০,৭৯০ মেট্রিক টন ফল। এর মধ্যে বাউকুল ৬১ হেক্টর, আপেল কুল ৩৪ হেক্টর, পেয়ারা ৭৯৭ হেক্টর (উত্পাদন ৬৬৯০ মেট্রিক টন), কলা ১০৫৭ হেক্টর, নারিকেল ১,৯০৫ হেক্টর, সুপারি ৪,৩৭৬ হেক্টর, আমড়া ৫১৩ হেক্টর, মাল্টা ৮ হেক্টর এবং আম্রপালী আম ৫ হেক্টর। বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে চাষ হয় কুল বড়ই, আম, মাল্টা, পেয়ারা ।
