মাস্টার রবীন দাস :কণ্ঠে ছিল যার বিদ্রোহের গান

আপডেট : ০৩ জুন ২০১৩, ২৩:৫৪
২৫ মে, সকাল ৯.৩০। কাঠের দোচালা অতি সাধারণ ঘরের দরজায় ‘দাদা’ ডাক শুনে উঁকি দিলেন একজন ভদ্র মহিলা। ‘কাকে চাই’ উত্তরে রবীন দা বলতে তাকে খানিকটা বিস্মিত মনে হলো। কারণ কেউ তো এখন তার খোঁজ নেয় না। রবীন দাস। দুই প্রজন্মের জনপ্রিয় সংগীত শিল্পী। স্থায়ী আবাস পিরোজপুর শহর। দরজা খুলতেই এক সময়ের যৌবন দীপ্ত ঋজু দেহের মানুষটি যে রবীন দা ভাবতে কষ্ট হলো। যেন কিছু কষ্ট তারও বুকে জমাট বাধা রয়েছে। তেহাত্তরের নুয়ে পড়া দেহে ফতুয়া চড়ালেন। গভীর মমতায় বোতাম গুলি লাগিয়ে দিলেন নাসিম ভাই। রবীনদা বসলেন বিছানায়। অতি সাধারণ জীবন-যাপন তার। অথচ এক সময় কতো অসাধারণ ছিলেন এই জনপদে। ছবি তোলা হল। ভাবলেশহীন রবীন দা তাকিয়ে রইলেন অবুঝের মতো। কি হবে এসব করে? এমন অভিব্যক্তি তার চোখে-মুখে। একটু নাড়া দিতেই শিল্পীর মন গলে গেল। কষ্ট অভিমান আর না পাওয়ার বেদনা ভুলে মেলে ধরলেন স্মৃতি ভান্ডার। জানালেন পাড়ার এক রবীন্দ্র জয়ন্তীতে মাত্র পাঁচ -ছয় বছর বয়সে রবীন্দ্র সংগীত দিয়ে শুরু। তারপর সৃজন, মেধা আর অনুশীলনে ক্রমশঃ গুণী হয়ে উঠলেন। কম করেও টানা প্রায় ছয় দশক শিল্পসাধনা করেছেন গভীর নিষ্ঠার সাথে ছিলেন বেতারের নিয়মিত শিল্পী। পিরোজপুরের যে কোন অনুষ্ঠানে তাঁর উপস্থিতি ছিলো একান্ত অনিবার্য। আলাপ চারিতার এক ফাঁকে তাঁর গাওয়া শ্রেষ্ঠ নজরুল গীতি “কারার ঐ লৌহকপাট” গানের কথা তুলতেই ঝলমলিয়ে উঠলো তার সমগ্র মুখব্যাদন। পিরোজপুরের যে মানুষ একবার তার গলায় এ গানটি শুনেছে, নিশ্চিত সে কোনদিন ভুলতে পারবে না। রবীনদা বললেন যতবারই এই গানটি গাইতাম শরীর মনে আলাদা শক্তি অনুরনীত হতো। গানের উদ্দাম আহ্বানে হারিয়ে যেতাম গানেরই মাঝে। কতবার যে গানটি গেয়েছেন তার হিসাব নেই। ব্যক্তিগত জীবনে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। পাশাপাশি গান শিখিয়েছেন অনেককে। গত ২০০৩ এ অবসর নেয়ার পর একরকম নিভৃতচারী জীবন তার। কালে ভদ্রে শিল্পকলা একাডেমী থেকে ডাক আসে। ইচ্ছে ছিল না সংসারী হবার। যা হয়। পঞ্চাশ পেরোনোর আগে ঘর বাধলেন ভবিষ্যত্ ভাবনায়। আর এখন সেই একই ভাবনায় কাতর তিনি। দু’ মেয়ের বড় দেবাশ্রিতা স্থানীয় কলেজে স্নাতক প্রথম বর্ষ, ছোটটি নবনীতা নার্সিং পড়ছে। ওদের কাউকেই গানে উত্সাহ দেননি রবীনদা। অথচ দেবাশ্রিতার গানের গলা উঁচু মানের। ক্ষুব্ধ কণ্ঠে এই কেন’র উত্তর দেননি দাদা। যিনি শুধুই দিয়ে গেছেন কিন্তু কিছুই যার মেলেনি, প্রাপ্ত সম্মানটুকুও নয়। যখন এই বেদনা ঘরের সবকটি মানুষকে গ্রাস করেছে পরিবেশ ভারি হয়ে উঠছে এখন আমরা দ্রুত পথ ধরলাম। কারণ এসব বেদনার দায় তো আমাদেরও। শহরের বিশিষ্ট সাংস্কৃতিক সংগঠক ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাবেক সহ সভাপতি সালেহ উদ্দিন সেলিম বলেন, রবীন দাসের কাছ থেকে গান শিখেছে খালিদ হাসান মিলু- শংকর সাওজালের মত প্রতিষ্ঠিত শিল্পীরা। ৬০/৭০ দশকের পিরোজপুরের সংগীত শিল্পীরা প্রায় সবাই তার শিষ্য। ১৯৫৭ সালে পিরোজপুর সোহরাওয়ার্দী কলেজ প্রতিষ্ঠার সময় স্কুল ছাত্র রবীন দাস কলেজ সংগঠকদের সাথে ঘুরে ঘুরে গান গেয়ে চাঁদা তুলতেন। উদীচির জেলা সম্পাদক খালিদ আবু বলেন, ৬০ ও ৭০ দশকে রবীন দাস ছিলেন পিরোজপুর সাংস্কৃতিক অঙ্গনের প্রাণ। উদীচীতে গান গেয়েছেন এক সময় । আমরা তার নেতৃত্বে কোরাস গেয়েছি, “কারার ঐ লৌহ কপাট, ভেঙ্গে ফেল কর রে লোপাট........” এ গানের সাথে নাচতেন শাহানা আকতার, সে এক অপূর্ব অনুভূতি। রবীন দাকে এ সমাজ যথাযথ সম্মান দিতে ব্যার্থ হয়েছে, এ গ্লানি সবার। তারপরও উদীচীসহ শহরের দু’একটি সংগঠন তার প্রাপ্য ন্যূনতম স্বীকৃতি দেয়ার চেষ্টা করেছে। -লেখক- ফ্রি ল্যান্স সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী