ভাণ্ডারিয়ার সিংহখালী কৃষক বিদ্রোহ

আপডেট : ০৩ জুন ২০১৩, ২৩:৫৭
১৮৫৬ সালে তত্কালীন ইংরেজ সরকার পিরোজপুরে মহকুমা স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়। যা ১৮৫৯ সালে কার্যকরী হয়। পিরোজপুরে এ প্রশাসনিক অঞ্চল বা মহকুমা সদর দপ্তর স্থাপনের পরিকল্পনার পেছনে ব্রিটিশদের উপনিবেশিক শাসনের বুনিয়াদ শক্তিশালী করতে যে বিশেষ উদ্দেশ্য কাজ করেছে তা হলো আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ। ইংরেজ শোষণের বিরুদ্ধে ভাণ্ডারিয়ার সিংহখালীতে গগন মিয়া-মোহন মিয়া ভ্রাতৃদ্বয়ের নেতৃত্বে ১৮৫৪ সালে সংঘটিত কৃষক বিদ্রোহ এই সিদ্ধান্তের প্রেক্ষাপট হিসাবে ভূমিকা রেখেছে। ইতিহাস বিশ্লেষণে জানা যায়, বৃহত্তর বাকেরগঞ্জ (বরিশাল) জেলার ভাণ্ডারিয়া ও মঠবাড়িয়া নিয়ে পরগনা সৈয়দপুর গঠিত ছিল। সৈয়দপুর পরগনার দশ আনার মালিক ছিলেন ঢাকার লাল মিত্রজিত্ সিং এবং দু’আনার মালিক ছিলেন বিরজা রতন দাস। ফরিদপুর জেলার গেরদা নিবাসী শেখ দৌলত মিত্রজিত্ এর অধীনে তালুক লাভ করে ভাণ্ডারিয়ার সিংহখালী গ্রামে জঙ্গল আবাদ করে বসতি স্থাপন করেন। তার পুত্র শেখ গগন ও মোহন মিয়া। খালের পশ্চিম পাড়ে গগন ও পূর্ব পাড়ে মোহন ১৭ হাত পরিখা খনন করে ৪০ একর ভূমির উপর বসতবাড়ি নির্মাণ করেন। তালুকের দখল নিয়ে মিত্রজিত্ ও বিরজা রতন দাসের পরিবারের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিবাদ ছিল। গগন ও মোহন অনেক কৃষক পরিবার নিয়ে সুন্দরবন আবাদ করেন। কিন্তু মিত্রজিত্ গগন-মোহন ও কৃষকদের নামে ভূমি কবুলিয়াত দিতে অস্বীকার করেন। তখন গগন ও মোহনের নির্দেশে কৃষকগণ মিত্রজিতদের খাজনা দেয়া বন্ধ করে দেয়। মিত্রজিত্ তার তালুক মদন ঘোষকে বন্দোবস্ত দেন। মদন ঘোষের কাচারি ছিল মঠবাড়িয়া থানায়। গগন ও মোহন মদন ঘোষের লম্বা টিকি কেটে দেয় এবং তাকে সিংহখালী নিয়ে যায়। কথিত আছে, মদন ঘোষের টিকি কাটা হতে মঠবাড়িয়ার ঘোষের টিকি কাটা গ্রামের নামকরণ হয়েছে। মদন ঘোষ অত্যাচারী হওয়ায় তাকে টুকরা টুকরা করে কেটে গরুর মাংসের সাথে রান্না করে গগন ও মোহনের লোকদের খাওয়ান হয় বলে প্রচার আছে। মদন ঘোষের খুন মামলায় গগন ও মোহনের যাবজ্জীবন সাজা হয় এবং আন্দামানে দীপান্তর হয়। জেল সুপারের স্ত্রী সর্পাঘাতে মরণাপন্ন হলে গগন তাকে ওঝালী চিকিত্সা করে ভাল করে তোলেন এবং পুরস্কার স্বরূপ পাঁচ বছর পরে দু’ভাই মুক্তি লাভ করেন। বিরজা রতন দাসের অনুগ্রহ লাভ করে গগন-মোহন তাদের তালুক লাভ করে। তাদের বাড়ির পার্শ্ববর্তী লুফা, কাজী, মৃধা ও চোকদারদের পূর্ব পুরুষ গগন-মোহনদের বাহিনীর বিভিন্ন দায়িত্বে নিয়োজিত ছিল। অনন্যোপায় হয়ে মিত্রজিত্ সিংহ কোম্পানির সাহায্য কামনা করেন। পুলিশ কয়েকবার গগন ও মোহনকে গ্রেফতার করতে আসে। কিন্তু তারা ব্যর্থ হয়ে ফিরে যায়। গগন-মোহন মিত্রজিতদের সৈয়দপুর পরগনার দশ আনা দখল করে নেয়। তারা কৃষকদের নিকট হতে লুফা বা টর্চ সালামী আদায় করে একটি শক্তিশালী বাহিনী গঠন ও সুরক্ষিত দুর্গ নির্মাণ করেন। জমিদার ইংরেজ সরকারের সৈন্য ও পুলিশ নিয়ে প্রজাদের উপর নির্যাতন চালাতো। ১৮৫৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে বাকেরগঞ্জের জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হ্যারিসন দেশীয় পুলিশ ও একদল ইংরেজ সৈন্য নিয়ে সিংহখালী গমন করে। তারা পাড়েরহাটের কাছে তেলীখালী অবতরণ করেন। ঘোড়ায় চরে ম্যাজিস্ট্রেট সিংহখালী চলছেন। ইতিমধ্যে গগন-মোহন জঙ্গল হতে গুলি করে জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের মাথার টুপি উড়িয়ে দেন। উভয় পক্ষে তীব্র লড়াই হয়। গগন-মোহন তাদের বাড়ি ছেড়ে দিয়ে জঙ্গলে আশ্রয় নিয়ে যুদ্ধ করেন। হ্যারিসন গগন-মোহনের পরিত্যক্ত বাড়ি দেখতে পান। যুদ্ধ করার জন্য গগন-মোহনের বাড়ি যেভাবে সুরক্ষিত করা হয়েছে তা দেখে হ্যারিসন বিস্মিত হয়েছেন। ১৮৫৪ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি তারিখে লিখিত পত্রে হ্যারিসন সিংহখালী গমন ও সংঘর্ষের বিবরণ দিয়েছেন। হ্যারিসনের পর আলেকজান্ডার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হয়ে আসেন। তিনি গগন-মোহনকে গ্রেফতার করার জন্য তিন থানায় পুলিশ ও শত শত চৌকিদার প্রেরণ করেন। তারা পরাজিত হয়ে ফিরে আসেন। এ সংবাদে জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আলেকজান্ডার ক্ষিপ্ত হয়ে পড়েন। তিনি নিজে অনেক পুলিশ ও ইংরেজ সৈন্য নিয়ে সিংহখালী গমন করেন। তাকে সমর্থন করতে এগিয়ে আসেন মোরেলগঞ্জের মোরেল ভ্রাতৃদ্বয় ও তাদের বাহিনী। আলেকজান্ডার ১৯ ডিসেম্বর তারিখ লিখিত পত্রে সিংহখালীর ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন। তিনি তার বাহিনী নিয়ে দুই মাইল হেঁটে খাল অতিক্রম করে মোহনের বাড়ি পৌঁছান। হঠাত্ ঢাল, সড়কি, লেজা ইত্যাদি দেশীয় অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে গগন আলেকজান্ডারকে আক্রমণ করেন। উভয় পক্ষে সংঘর্ষ শুরু হয়। ঘটনাস্থলে ১৭ জন বিদ্রোহী কৃষক নিহত হয়। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহনের বাড়ি দখল করার চেষ্টা করলে বিদ্রোহীরা ভিতর হতে গুলিবর্ষণ করে। তখন পুলিশ বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পড়ে। জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাড়াতাড়ি মোহনের বাড়ি ত্যাগ করে পালিয়ে যায়। পালিয়ে যাবার সময় তিনি পুলিশ বাহিনীকে মৃতদেহগুলো আনার নির্দেশ দেন। কিন্তু পুলিশ প্রাণ ভয়ে পালিয়ে যায়। গগন-মোহন ১৭ জন বিদ্রোহী কৃষকের মৃতদেহ উদ্ধার করে মোহনের বাড়ির দরজায় কবর দেন। তাদের কবরগুলো বাঁধিয়ে নামফলক স্থাপন করেন। ইংরেজ প্রশাসন জমিদারদের সাথে কৃষকদের উপর অমানুষিক অত্যাচার করতে থাকে। শেষ পর্যন্ত গগন ও মোহন কোর্টে উপস্থিত হন। সরকার তাদেরকে ৮টি মিথ্যা মামলায় অভিযুক্ত করে। বাকেরগঞ্জের জেলা জজ স্টিয়ার ১৮৫৪ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর এবং ১৮৫৫ সালের ৫ জানুয়ারি গগন ও মোহনের বিরুদ্ধে আনীত মামলার রায় দেয় এবং উভয় ভ্রাতাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড প্রদান করে। তারা ৬০ বছর বেঁচে ছিলেন এবং ৩০ বছর কারাগারে ছিলেন। শেষ জীবনে মুক্তি পেয়ে সিংহখালী ফিরে আসেন। তাদের বংশধরগণ সিংহখালী গ্রামের মিয়া বাড়িতে বাস করছেন। জেলা জজ গগন-মোহনের সময় বরিশালের কৃষকদের সরকার বিরোধী কার্যাবলী লক্ষ্য করে বলেছিলেন, “পরিশেষে বার বার চেষ্টা করে মিয়াদের গ্রেফতার করতে ব্যর্থ হয়ে ম্যাজিস্ট্রেটের হস্তক্ষেপ করা উচিত এবং এখনই তা করা উচিত, কারণ জেলা বিদ্রোহ করার শেষ সীমায় পৌঁছেছে”। বরিশালের ইতিহাস প্রণেতা বেভারিজ বলেছেন,“ এ জেলার চেয়ে বড় এবং সবচেয়ে ভয়ংকর বিরোধ প্রকাশ পেয়েছে সিংহখালী মামলায়। সেহেতু এ ঘটনা দাঙ্গা সৃষ্টির ইতিহাস এবং ২০ বছর আগে বাকেরগঞ্জের পরিস্থিতি সম্পর্কে আলোকপাত করে”।