জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম শিকার শিশু ও নারী

আপডেট : ০৪ জুন ২০১৩, ২১:০৪
আজ বিশ্ব পরিবেশ দিবস। ১৯৭২ সালের জুন মাসে সুইডেনের স্টকহোমে অনুষ্ঠিত জাতিসংঘের মানব পরিবেশের ওপর প্রথম সম্মেলনের মধ্য দিয়ে আন্তর্জাতিকভাবে পরিবেশসংক্রান্ত কার্যক্রমের সূচনা হয়। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ২৭তম অধিবেশনের ঘোষণা অনুযায়ী প্রতিবছর ৫ জুন বিশ্ব পরিবেশ দিবস উদযাপনের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। এই ঐতিহাসিক সম্মেলনের পর থেকেই বিশ্বের বিভিন্ন দেশে পরিবেশের দূষণকে মানব জাতির অস্তিত্বের প্রতি মারাত্মক হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে। ২০০৯ সালের ডিসেম্বর মাসে ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে পরিবেশ ও জলবায়ু বিষয়ে গুরুত্বপূর্ণ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বাংলাদেশের একটি শক্তিশালী প্রতিনিধি দল সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেন। সম্মেলনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী বৈশ্বিক উষ্ণতা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমাগত বাড়ার কথা উল্লেখ করে এর প্রতিবেশগত নেতিবাচক ফলাফলের কথা তুলে ধরেছেন। ইন্টার গভর্নমেন্টাল প্যানেল অন ক্লাইমেট চেঞ্জ (আইপিসিসি)-এর সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি ও জলবায়ু পরিবর্তনের জন্য প্রধানত মানুষই দায়ী। ব্যাপকভাবে বনজঙ্গল ও গাছপালা ধ্বংস করে, নদ-নদী ও খালবিল ভরাট করে জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহার করে, ভূগর্ভস্থ পানি ও তেল উত্তোলন করে, উঁচু বাঁধ নির্মাণ করে এবং ক্ষতিকর রাসায়নিক সার ও কীটনাশক ব্যবহার করার মাধ্যমে মানুষ জলবায়ু পরিবর্তনের নেতিবাচক ভূমিকা রাখছে। নির্বিচারে বৃক্ষ নিধনের পরিণামে বায়ুতে অতিমাত্রায় গ্রিন হাউস গ্যাস নির্গমনের কারণে বায়ুমণ্ডলের এবং সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা ক্রমাগত বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি আবহাওয়ায় পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। এটা নিয়ে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশই কমবেশি উদ্বিগ্ন। বায়ুমণ্ডলে কার্বন ডাই অক্সাইডের মাত্রা ৩৫০ পিপিএম-এর বেশি হলে মেরু অঞ্চল ও পর্বত শৃঙ্গের বরফ গলা শুরু হয়ে যাবে। বরফ গলার কারণে বর্তমানে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা ক্রমেই বাড়ছে। বিজ্ঞানীদের ভবিষ্যদ্বাণী যদি সত্য হয় তাহলে আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশের ১৭ ভাগ এলাকা পানির নিচে তলিয়ে যাবে, বাড়বে ভূমিক্ষয়। এতে এ সময়ের মধ্যে প্রায় তিন কোটি মানুষ বাস্তুচ্যুত হবে। লবণাক্ত হয়ে পড়বে অনেক মিঠা পানির অঞ্চল, বেড়ে যাবে বন্যাসহ নানা ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ, দেখা দেবে নতুন নতুন রোগ। ইতিমধ্যে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে কলেরা, ম্যালেরিয়া, ডেঙ্গু, কালাজ্বর, টাইফয়েড ইত্যাদি রোগের প্রকোপ বেড়ে গেছে। উষ্ণ আবহাওয়ায় মশা, মাছি ও কীট-পতঙ্গবাহী রোগের বিস্তার ঘটে থাকে। জলবায়ু পরিবর্তনে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর তালিকায় মালদ্বীপ ও টুভালুর পরেই মারাত্মক ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থানে রয়েছে কিরিবাতি, কোস্টারিকা ও বাংলাদেশ। বিশ্ববাসী ও পরিবেশবিজ্ঞানীরা একমত হয়েছেন যে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব আগে যা আশঙ্কা করা হয়েছিল, তার চেয়েও অনেক বেশি ভয়াবহ হবে। সেভ দ্যা চিলড্রেনের প্রকাশিত এক প্রবন্ধে বলা হয়েছে—জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সারা বিশ্বে প্রতিবছর ১৭ কোটি ৫০ লাখ শিশু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে—জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে ডায়রিয়া, অপুষ্টিজনিত নানারকম রোগ ও ম্যালেরিয়ার প্রাদুর্ভাব বাড়ছে আর এসব রোগের শিকার হচ্ছে প্রধানত শিশুরা। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়েছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে কেবল ভারতেই প্রতিবছর পাঁচ বছর অথবা এর চেয়ে কম বয়সী প্রায় ২০ লাখ শিশু নানা রকম রোগে মারা যাচ্ছে। ভারতের এই শিশুমৃত্যু হারকে বিশ্বের মধ্যে সর্বাধিক বলে উল্লেখ করা হয়েছে। বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক দুর্যোগে দেখা গেছে, এদেশের নারী ও শিশুরাই সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে অতিরিক্ত লবণাক্ততার জন্য বর্তমানে খুলনা ও সাতক্ষীরা অঞ্চলের অনেক নারীকে লবণমুক্ত খাবার পানি সংগ্রহ করার জন্য প্রতিদিন কয়েক কিলোমিটার পথ হাঁটতে হচ্ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বর্ষার অতিরিক্ত পানি দেশের জলাবদ্ধ এলাকার বিস্তৃতি ক্রমশ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এতে এসব এলাকার ঘরে ঘরে খাদ্য সংকট সৃষ্টি করছে, পাশাপাশি এলাকার নারীদের জীবন নানাভাবে সংকটাপন্ন করে তুলছে। খুলনা বিভাগের কেশবপুর ও মনিরামপুরের জলাবদ্ধ এলাকা এর প্রকৃষ্ট উদাহরণ। জলবায়ু পরিবর্তন মানুষের ভালোমতো বেঁচে থাকার অনুষঙ্গগুলোর গুণগত মান খারাপ করে দেয়। ফলে নারী ও শিশুরা নানারকম স্বাস্থ্যগত ঝুঁকির মুখে পড়ে। এই বৈশ্বিক বিপর্যয়ের কারণে মানুষের সুপেয় পানির জোগান কমে যাচ্ছে, পাশাপাশি স্বাস্থ্যকর আবাসও ধীরে ধীরে কমে যাচ্ছে। সুপেয় পানি, দূষণমুক্ত বাতাস, পুষ্টিকর খাবার ইত্যাদির মান ক্রমাগত খারাপ হচ্ছে—ফলে নারী ও শিশুদের সমস্যা আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে। আইপিসিসি-এর প্রতিবেদনটিতে আরো বলা হয়েছে, এখনই জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক উষ্ণতা প্রতিরোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হলে প্রাকৃতিক দুর্যোগ আগামী ২০ বছরে শতকরা ৩২০ ভাগ বাড়বে। পাশাপাশি বাড়বে শিশুমৃত্যুর হার। রিপোর্টে দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ২০০৯ সালে আইলার আঘাতে দুর্ভোগের শিকার মানুষের দুর্দশার চিত্র তুলে ধরা হয়। রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়, এখনো আইলার বিপর্যয়ে ক্ষত-বিক্ষত মানুষ অর্থনৈতিকভাবে আগের অবস্থায় ফিরতে পারেনি। তারা এখনো প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে টিকে থাকার চেষ্টা করছে। সাম্প্রতিক সময়ে ঘটে যাওয়া মহাসেনের আঘাত তাদের দুর্দশার মাত্রা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। আইপিসিসি-র রিপোর্ট থেকে আরো জানা যায়, গ্রিন হাউস গ্যাসের প্রভাবে এসব ঘটনা আরো ঘন ঘন ও খুব দ্রুতগতিতে ঘটতে পারে। এখনই যদি আমরা এর গতি থামাতে পারি তা হলেও সবকিছু ঠিকঠাক হতে অনেক সময় লেগে যাবে। বর্তমান সরকার পরিবেশ রক্ষায় নিরলস প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে বলেই মনে হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ফোরামে যে সব বক্তব্য দিয়েছেন তাতে দায়িত্বশীলতার স্বাক্ষর আছে। এটা অব্যাহত থাকলে দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হবে বলে আমাদের বিশ্বাস। জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সমন্বয়ে নতুন জোট তৈরি করে বিশ্ব রাজনীতিতে বৈষম্য কমানোর উদ্যোগ নিতে হবে বাংলাদেশকেই। ঢাকা