বাংলাদেশের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে যুগে যুগে মুগ্ধ হয়েছেন ভ্রমণকারীরা। স্বাভাবিকভাবে এ সৌন্দর্যের লীলাভূমি বাংলাদেশে পর্যটনশিল্প উন্নয়নের সম্ভাবনা অপরিসীম। নতুন করে কৌশল ঠিক করে সম্ভাবনার সবটুকুকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে পর্যটনে মডেল হতে পারে। তুলনামূলকভাবে বাংলাদেশ স্বল্প আয়তনের দেশ হলেও আমাদের যে ভূপ্রাকৃতিক বৈচিত্র্য তা সহজেই পর্যটকদের আকর্ষণ করবে।
আগেকার পর্যটক আর এখনকার ভ্রমণপিয়াসীদের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ইবনে বতুতা বা হিউয়েন সাঙ যে ধরনের পর্যটক ছিলেন, সে ধরনের পর্যটক এখন খুঁজে পাওয়া ভার। পরিবর্তিত সময় ও গতিশীল জীবনই হয়তো এর কারণ। আগে পর্যটকেরা একটা জায়গায় শুধু মুগ্ধ হওয়ার জন্য ভ্রমণ করতেন না, সেই এলাকার মানুষের জীবন, সংস্কৃতি কিংবা পরিবেশ অধ্যয়ন ও পর্যবেক্ষণ ছিল তাদের পর্যটনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ। ইতিহাসে তাই তাঁদের নাম থেকে গেছে। আমি রাঙামাটি বেড়াতে গিয়ে কী দেখলাম, সেটা আদৌ বিবেচ্য নয় অনেকের কাছে, অথচ আমার মুগ্ধতাটুকু পুরোটাই আমি যে পেলাম! আর ফেসবুকে ছবি ছড়িয়ে দিয়েই বুঝি খুশি থাকলাম। যে সুন্দরবনে বেড়াতে গিয়ে এর সৌন্দর্য দেখে আমরা মুগ্ধ হই, লঞ্চের পাশ দিয়ে যাওয়া সুন্দরবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ জেলে-নৌকা দেখে তাদের অবস্থার কথা আমরা কয়জন ভাবি? খুব তো আমরা চা বাগানের শ্রমিকদের সঙ্গে ছবি তুলতে ওস্তাদ, কিন্তু ফিরেও দেখি না তাদের পরনের শাড়ি কতটা মলিন। থাক সে কথা, সম্ভাবনা নিয়ে কথা হচ্ছে, একটা পর্যটনকেন্দ্রকে ঘিরে আশপাশের মানুষেরও অনেক উন্নতি ঘটে। আমরাই যদি অবারিত করতে পারি সেই পথ, সামগ্রিক উন্নয়ন আপনাআপনিই হবে।
বাংলাদেশের পর্যটনশিল্প দেরিতে হলেও বর্তমানে সঠিক পথেই এগুচ্ছে। অতীতের অসামঞ্জস্যতা দূর করে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক অবস্থার নিরিখে পর্যটনশিল্পের উন্নয়নের সঠিক পথকে চিহ্নিত করা গেছে। আশা করা যায় দ্রুততম সময়ে বাংলাদেশ পর্যটনশিল্পে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য বিখ্যাত পর্যটন গন্তব্যের মতোই একটি অনন্য গন্তব্যস্থলে পরিণত হবে। এর জন্য সর্বাগ্রে প্রয়োজন আইনি পরিকাঠামো এবং পর্যটন অবকাঠামো। প্রাইভেট সেক্টরকেও সরকারের চাইতেও আকর্ষণীয় অবকাঠামো বা পর্যটন সুবিধা গড়ে তোলার চেষ্টা করতে হবে। এক্ষেত্রে সরকারের সকল ধরনের সহযোগিতা প্রয়োজন।
পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে অতি উচ্চাভিলাষী পদক্ষেপ এবং অবাস্তবায়নযোগ্য সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা কখনোই ঠিক হবে না। রাতারাতি পর্যটনশিল্পের উন্নয়ন করতে গেলে অনেক ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হবে। পরিবেশগত ভারসাম্য, জীববৈচিত্র্য রক্ষাও আমাদের করতে হবে। এজন্য সুপরিকল্পিত ও সুনিয়ন্ত্রিত পর্যটনশিল্পের উন্নয়নই সকলের কাম্য। পৃথিবীর অন্যান্য দেশের তুলনায় এ শিল্পে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। এশিয়া এবং আফ্রিকার অনেক দেশ পর্যটনশিল্পকে দারিদ্র্যবিমোচনের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে। আমরাও কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দারিদ্র্যবিমোচনের জন্য এটিকে সামগ্রিক উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত করতে পারি। বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশের মিশনগুলোকে বিদেশি পর্যটকদের বাংলাদেশ ভ্রমণে উত্সাহিত করার জন্য সমন্বিত উদ্যোগ নিতে হবে।
বাংলাদেশে পর্যটনশিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে প্রায় ৪ লাখ লোক জড়িত। কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান ও কুয়াকাটাসহ উল্লেখযোগ্য জেলাসমূহে বহু লোক এ শিল্পের সঙ্গে জড়িত থেকে জীবিকা নির্বাহ করছে। বিভিন্ন জেলায় পর্যটন কর্মকাণ্ড বৃদ্ধির ফলে হস্তশিল্প, পোল্ট্রি ফার্ম ও মত্স্য খামারসহ নানা ধরনের শ্রমঘন ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের সৃষ্টি হচ্ছে। বাংলাদেশে পর্যটনশিল্পের উন্নয়নে শিক্ষা-সংস্কৃতি প্রসারমূলক কাজের সঙ্গেও অনেক লোক জড়িত। পর্যটনের বেনিফিট সমাজের নিম্নস্তরে পৌঁছে দিয়ে দারিদ্র্যবিমোচন সম্ভব। বিশ্বের উন্নত দেশগুলোর দিকে আমরা একটু তাকালেই দেখতে পাই তাদের রাজস্ব আয়ের মধ্যে পর্যটনশিল্পের অবদান চোখে পড়ার মতো।
এ শিল্পের বহুমাত্রিকতার কারণে বিভিন্ন পর্যায়ে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সম্ভাবনা তৈরি হয়। ফলে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। সরকারি অনুদান ও সংশ্লিষ্ট বিভাগের সঙ্গে যথাযথ সমন্বয় সাধন করার পাশাপাশি উন্নত অবকাঠামো, সঠিক পরিকল্পনা ও রাজনৈতিক স্থিতিশীল অবস্থা দরকার পর্যটনের জন্য। পর্যটনশিল্পের উপাদান ও ক্ষেত্রগুলো দেশে ও বিদেশে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপনের মাধ্যমে পর্যটনশিল্পের অধিকতর বিকাশ ঘটানো সম্ভব।
আমরা নানা সময় নিজের দেশকে অপরূপ হিসেবে উপস্থাপন করি, বিশেষত আবেগের জায়গা থেকে প্রায়ই বলে থাকি—এমন দেশটি কোথাও খুঁজে পাবে নাকো তুমি! কিন্তু দেশটিকে দেখার ক্ষেত্রে আমাদের একটা জন্মগত অবহেলা ছিল সবসময়। যদিও এ অবহেলার পেছনে খোদ পর্যটনের প্রতি মানুষের অনীহা নাকি নানা অসুবিধার কারণে মানুষ বেড়াতে অনাগ্রহী—সেটি অন্য বিতর্কের বিষয়।
বাংলাদেশের পর্যটন নিয়ে নানা চিন্তাভাবনা করা যেতে পারে। প্রচলিত চিন্তাচেতনার বাইরে গিয়ে পর্যটনকে একটু দেশীয় ছোঁয়া দিতে পারলে অভ্যন্তরীণ পর্যটকের সংখ্যা বিপুলভাবে বেড়ে যাবে সন্দেহ নেই। বাংলাদেশের ভৌগোলিক পরিবেশ এমনই যে, একটু চেষ্টা করলে সারা দেশটাকেই পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। আমরা অনেকেই যেখানে জন্মেছি, তার পাশের উপজেলা বা জেলাতে যাইনি; কিন্তু একটা পর্যটন স্পট থাকলে সহজেই মানুষ আশেপাশের জেলাগুলোতে বেড়াতে যেতে পারতো। পর্যাপ্ত উদ্যোগ থাকলে জেলা পর্যটনও হতে পারে বাংলাদেশের পর্যটনশিল্পের অন্যতম শক্তিশালী ক্ষেত্র। অনেক বেসরকারি ট্যুর অপারেটর এসব ক্ষেত্রে কাজ শুরু করলেও নানা মাত্রায় পর্যটনশিল্পের সার্বিক ভাবনা ও বিকাশে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনকেই এগিয়ে আসতে হবে। আর তা করতে পারলেই কেবল সম্ভব এর ওপর ভর করে শক্তিশালী একটা অর্থনীতি দাঁড় করানো।
ঢাকা
