দেশের সবচেয়ে উজ্জ্বল ক্রিকেট তারকা তিনি; বাংলাদেশের প্রথম ক্রিকেট ‘মেগাস্টার’! দেশের টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ ব্যাটসম্যান হিসেবে সেঞ্চুরি দিয়ে অভিষেক হয়েছিল তার। এরপর কার্ডিফে, ম্যানচেস্টারে, ঢাকায়, গলে বারবার তার বীরত্ব দেখেছে ক্রিকেট বিশ্ব। সেই মোহাম্মদ আশরাফুল এবার ক্রিকেট থেকে সাময়িক নিষিদ্ধ হলেন। বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) স্পট ফিক্সিং এ জড়িত থাকার অভিযোগে তাকে এই শাস্তি দিয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে মিরপুর শেরে বাংলা স্টেডিয়ামে এক জনাকীর্ণ সংবাদ সম্মেলনে আশরাফুলকে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে দূরে রাখার সিদ্ধান্তের কথা জানান বিসিবি প্রধান নাজমুল হাসান পাপন।
এদিকে একই দিন বিকালে গোটা জাতিকে স্তব্দ করে দিয়ে এ ঘটনার জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাইলেন আশরাফুল। রাজধানীর বনশ্রীর বাসায় গণমাধ্যমের সঙ্গে আলাপকালে তিনি ম্যাচে স্পট ফিক্সিং এ নিজের জড়িত থাকার সত্যতা স্বীকার করে ক্ষমা চান। সেই সঙ্গে স্বীকার করেন, এক যুগের দীর্ঘ ক্যারিয়ারে অন্তত তিন বার নিজের সঙ্গে, দেশের সঙ্গে, ক্রিকেটের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন। এ সময় আশরাফুল বলেন, ‘আমি পুরো জাতির কাছে, আপনাদের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। আমার ওপর মানুষের যে বিশ্বাস ছিল, আমি সে বিশ্বাস সবসময় রাখতে পারিনি। আমি অন্যায় করেছি। আমাকে ক্ষমা করে দেবেন।’
আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিটের (আকসু) কাছে দেয়া স্বীকারোক্তি প্রসঙ্গে জাতীয় ক্রিকেট দলের সাবেক এই অধিনায়ক বলেন, ‘আমি হয়তো কখনো কখনো সত্ থাকতে পারিনি। তবে আইসিসির এই তদন্তে একটাও মিথ্যা কথা বলিনি। আমি যা করেছি, যা জানি; সব বলে দিয়েছি। ক্রিকেটের স্বার্থেই আমি সব সত্য বলে দিয়েছি। আর প্রতারণা করিনি নিজের সঙ্গে।’
এর আগে গতকাল বোর্ডের জরুরি বৈঠক শেষে সংবাদ সম্মেলনে বিসিবি সভাপতি নাজমুল হাসান পাপন জানান, বিপিএল-এ ফিক্সিং বিষয়ক আকসু’র চলমান পূর্ণাঙ্গ তদন্ত রিপোর্ট তারা এখনও হাতে পাননি। তবে আকসুর কাছে আশরাফুল যেহেতু নিজের অপরাধ স্বীকার করেছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তাই তদন্ত রিপোর্ট হাতে না পাওয়া পর্যন্ত তাকে সব ধরনের ক্রিকেট থেকে দূরে সরিয়ে রাখা হচ্ছে। পরে এ বিষয়ে বিসিবি’র পক্ষ থেকে একটা সংবাদ বিজ্ঞপ্তিও দেওয়া হয়।
দুর্নীতির ব্যাপারে তাদের ‘জিরো টলারেন্স’-এর কথা উল্লেখ করে বিসিবি সভাপতি বলেন, বিপিএল আসলেই খেলোয়াড়দের পাওনা বিতর্ক, মালিকদের আচরণ, ফিক্সিং বিতর্ক মিলিয়ে একটা ‘পেইন’-এ পরিণত হয়েছে। তবে তিনি বিপিএলকে অন্তত একটা স্বচ্ছ ইমেজে ফিরিয়ে আনতে চান। তিনি আরো বলেন, আকসুর বিপিএল নিয়ে তদন্তের ভেতর বাংলাদেশের কিছু আন্তর্জাতিক ম্যাচ নিয়েও সন্দেহ উঠে এসেছে। সেগুলো নিয়ে আইসিসির উদ্যোগে অধিকতর তদন্ত করা হবে। সেই সঙ্গে পাপন সবাইকে সতর্ক করে দিয়ে বলেন, ‘অপরাধ করে যাতে কেউ পার না পায়, সেটাই আমরা নিশ্চিত করতে চাই। আমরা এমন একটা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে চাই, যেখানে চাইলেও অন্যায় করা খুব কঠিন হয়ে যাবে। সেই সঙ্গে যাদের বিপক্ষে প্রমাণ পাওয়া যাবে, বোর্ডের সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রয়োগ করে তাদের শাস্তির আওতায় আনা হবে।’
প্রসঙ্গত, বিপিএল নিয়ে চলতি বিতর্কটা শুরু হয় ফেব্রুয়ারিতে শেষ হওয়া বিপিএলের দ্বিতীয় আসর থেকে। সে আসরের পরপরই আকসু জানায়, এই আসরে কয়েকটি ম্যাচে কয়েকজন খেলোয়াড় ও কয়েকজন কর্মকর্তা অন্যায়ের সঙ্গে যুক্ত। এরপর বিসিবি তাদের অধিকতর তদন্ত করার সবুজ সংকেত দিলে আকসু দফায় দফায় তদন্ত করতে থাকে। এক পর্যায়ে আশরাফুলসহ আরো কয়েকজনের জড়িত থাকার প্রমাণ পায় তারা। জিজ্ঞাসাবাদে সব স্বীকারও করেন আশরাফুল। তার এই ‘প্রতারণা’র স্বীকৃতি নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধাক্কা।
কোটি মানুষের স্বপ্ন ভাংলেন আশরাফুল !
২০০১ সালে কলম্বোতে মুত্তিয়া মুরালিধরণ, চামিন্দা ভাসের বোলিং এর বিপক্ষে টেস্ট সেঞ্চুরি করে সর্বকনিষ্ঠ সেঞ্চুরিয়ান হিসেবে অভিষেক হয়েছিল আশরাফুলের। এরপর বাংলাদেশকে ভারত, দক্ষিণ আফ্রিকা, অস্ট্রেলিয়া, শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ওয়ানডেতে অসামান্য সব জয় এনে দিয়েছে আশরাফুলের ব্যাট। সর্বশেষ শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ‘কামব্যাক’ সিরিজে গলে ১৯০ রানের মহাকাব্যিক এক ইনিংস খেলে আরেকবার স্বপ্ন দেখান আশরাফুল। কিন্তু সব স্বপ্ন কার্যত শেষ হয়ে গেল তার এই স্বীকারোক্তির ভেতর দিয়ে!
পাশাপাশি এই ঘটনার মধ্য দিয়ে প্রায় এক যুগ দীর্ঘ ক্রিকেট ক্যারিয়ারেরও কার্যত সমাপ্তি ঘটলো আশরাফুলের। ক্যারিয়ারে ৬১টি টেস্ট খেলে ২৭৩৭ রান, ১৭৭টি ওয়ানডে খেলে ৩৪৬৮ রান এবং ২৩টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ৪৫০ রান করেছেন তিনি। তিন ধরনের ক্রিকেটে যথাক্রমে ২১, ১৮ ও ৮টি উইকেট নিয়েছেন আশরাফুল।
তবে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন,আশরাফুলের ক্রিকেট ক্যারিয়ার এখানেই শেষ হয়ে যাবে কি-না; সেটা সময়ই বলে দেবে। কিন্তু একটা বিষয় বেশ স্পষ্ট যে জীবনের এই পর্যায়ে এসে ক্রিকেট ক্যারিয়ারের চেয়েও যেন তিনি গুরুত্বপূর্ণ মনে করছেন সবকিছু স্বীকার করাকে। আশরাফুলের বক্তব্যও সেটাই প্রমাণ করে। যখন তিনি বলেন, ‘আমি কারো নামে কোনো অভিযোগ করিনি। আইসিসি যা জানতে চেয়েছে, ক্রিকেটের স্বার্থে আমি সব বলেছি। যা অন্যায় করেছি, বলে দিয়েছি। ১২ বছরের ক্রিকেট ক্যারিয়ারে এই প্রথম আমাকে কোনো তদন্ত সংস্থা ডেকেছে। আমি এবার আর কিছু লুকাইনি। আমি আবারও সবার কাছে ক্ষমা চাই।’
[আরও খবর খেলার পাতায়]
