বাংলাদেশে টেকসই উন্নয়ন ভাবনা ভুল পথে চলছে

আপডেট : ০৪ জুন ২০১৩, ২২:৩২
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় নগর পরিকল্পনাবিদ রবার্ট ব্রজনেন মনে করেন বাংলাদেশে নগরায়ন তথা উন্নয়নের ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা ও অব্যবস্থাপনা প্রকট। অভাব রয়েছে সুষ্ঠু পরিকল্পনারও। এখানে উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনার ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষীয় দ্বৈত ভূমিকাও (ওভারল্যাপিং) একটি বড় সমস্যা। সে কারণে এখানকার টেকসই উন্নয়নের ভাবনা অনেকখানি ভুল পথে চলছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তার মতে, একটি কার্যকর পরিকল্পনা ও কর্ম-প্রক্রিয়া এবং সমন্বিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই দূরদর্শী ও টেকসই উন্নয়ন সম্ভব। বিক্ষিপ্ত ও বিশৃঙ্খল উন্নয়ন তত্পরতা দীর্ঘমেয়াদে নানারকম দুর্ভোগ ও নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে। উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে বাংলাদেশের সামনে এখনো পরিকল্পিত টেকসই উন্নয়নের যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। তিন দিনের বাংলাদেশ সফরকালে সোমবার অপরাহ্নে ঢাকায় আমেরিকান সেন্টারে বসে ইত্তেফাক প্রতিনিধিকে দেয়া একান্ত সাক্ষাত্কারে এই অভিজ্ঞ নগরায়ন বিশেষজ্ঞ আরও বলেন, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে নগরায়ন ও সামগ্রিক অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে দুই ধরনের পরিকল্পনার সমন্বয় সাধন করা হয়। সেখানে ফেডারেল সরকারের পরিকল্পনা যেমন রয়েছে, তেমনি রাজ্য পর্যায়ে এবং সকল স্থানীয় সরকার পর্যায়েও পৃথক পরিকল্পনা অনুসরণ করতে হয়। সবচেয়ে বড় কথা হলো, বিধিবদ্ধ নিয়মগুলো সেখানে যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করার জন্য বাংলাদেশেও এর কোনো বিকল্প নেই। আইন বা নীতিমালার বাস্তবায়ন করাটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। তা না হলে এসব আইন ও নীতি থাকা এবং না থাকা প্রায় সমান। রবার্ট ব্রজনেন বলেন, যে কোনো জনপদে উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিবেশ এবং ভূ-প্রকৃতির বৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রাখার বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ দু’টি বিষয়কে এড়িয়ে টেকসই উন্নয়ন একেবারেই অসম্ভব। ভূমির প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য রক্ষা করতে হলে এর শ্রেণীভিত্তিক জোনিং করা এবং সে অনুযায়ী ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের বাস্তবতা বিরাজমান নেই। এখানে অনেকেই কৃষিজমি ও নিচুভূমি ইচ্ছেমতো ভরাট করে বিভিন্ন ধরনের অট্টালিকা নির্মাণসহ উন্নয়ন কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছেন। অথচ নিচুভূমিতে অপরিকল্পিত নগরায়ন ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে। এ ব্যাপারে সরকারি ভূমিকা আরও কার্যকর এবং পরিষ্কার থাকা দরকার। তিনি বলেন, নগর উন্নয়নের ক্ষেত্রে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো পরিবহন। নগরীর সঙ্গে আশপাশের জনপদসমূহের যাতায়াত ব্যবস্থা অত্যন্ত সহজলভ্য হওয়াটা জরুরি। তাহলে নগরীর ওপর জনসংখ্যার চাপ কমে যায়। ঢাকা নগরীর পরিবহন ব্যবস্থায় বিশৃঙ্খলার বিষয়টি উল্লেখ করে যুক্তরাষ্ট্রের খ্যাতিমান এই নগর পরিকল্পনাবিদ বলেন, একই রাস্তায় একসঙ্গে যান্ত্রিক ও অযান্ত্রিক যানবাহন চলাচলের প্রচলিত রীতি নগরীর পরিবহন ব্যবস্থাকে মারাত্মক গতিহীন করে রেখেছে। নগরীর ব্যবস্থাপনায় স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, যে কোনো শহর বা জনপদের স্থানীয় সমস্যাগুলো সমাধান এবং নাগরিকদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করার দায়িত্বটি স্থানীয় সরকারের হাতেই থাকা উচিত। তবে কোনো স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী ও কার্যকর কথা বলে সেটিকে দ্বিখণ্ডিত করার নীতি প্রশংসনীয় কিছু নয় বলে মন্তব্য করেন তিনি। নিজের পরিকল্পনায় যুক্তরাষ্ট্রের আর্লিংটন শহরের উন্নয়নের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করতে গিয়ে রবার্ট ব্রজনেন বলেন, সেখানে সুবিধা হলো পেশাদার পরিকল্পনাকারীরা নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিসহ সব ধরনের কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে সর্বাত্মক সহায়তা ও সমর্থন পেয়ে থাকেন। কাজ করার ক্ষেত্রে তাদের পূর্ণ স্বাধীনতাও থাকে। এছাড়া সেখানে রেগুলেটরি বা ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে ওভারল্যাপিং নেই।