উজ্জ্বল নক্ষত্রের মহাপ্রয়াণ

আপডেট : ০৫ জুন ২০১৩, ১৮:৪০
ঋতুপর্ণ ঘোষ। ভারতের বিশিষ্ট চলচ্চিত্র নির্মাতা। একইসাথে শক্তিমান অভিনেতাও। মাত্র ১৯টি চলচ্চিত্র নির্মাণ করেই পেয়েছেন ১২টি জাতীয় পুরস্কার। কলকাতার বাঙালি ঋতুপর্ণ ঘোষ বাংলাদেশের চলচ্চিত্রপিপাসুদের কাছেও ছিলেন সমান জনপ্রিয়। রুপালি পর্দার অসামান্য এই প্রতিভাপুরুষ গত ৩০ মে চলে গেছেন না ফেরার দেশে। তার অকাল মৃত্যুতে পুরো উপমহাদেশের চলচ্চিত্র অঙ্গনে শোকের ছায়া পড়েছে। এই বিশিষ্ট চিত্রনির্মাতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে আমাদের এবারের মূল ফিচার। লিখেছেন খালেদ আহমেদ ঋতুপর্ণ ঘোষ সারা বিশ্বেই ছড়িয়েছেন সাফল্যের দ্যুতি। বুধবার সকালে ঘুমের মধ্যেই হূদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেন বাংলা চলচ্চিত্রের প্রখ্যাত এই পরিচালক। তবে অনেক দিন আগে থেকেই প্যানক্রিয়াটাইটিস রোগে ভুগছিলেন তিনি। এই রোগের কারণে মাঝেমধ্যেই কাজে বিরতি নিতে হয়েছে তাকে। তবে কাজপাগল ঋতুপর্ণ ঘোষ কখনও সেই বিরতি দীর্ঘায়িত করেননি। এমনকি অসুস্থ থাকা অবস্থায়ও তিনি অংশ নিয়েছেন শুটিংয়ে। অবাক করার মতো বিষয় হলো, তার হাত ধরে সব কাজই প্রায় সফলতা অর্জন করেছে। সত্যজিত্ রায়, ঋত্বিক ঘটকদের মতো কালজয়ী পরিচালকদের প্রতিচ্ছবি দৃশ্যমান ছিল ঋতুপর্ণ ঘোষের মাঝে। তাদের একমাত্র উত্তরসূরিও ধরা হতো তাকে। তবে ঋতুপর্ণের মৃত্যুর মধ্য দিয়ে সমাপ্তি ঘটেছে এই ধারার চলচ্চিত্র অধ্যায়ের। জন্ম ও শিক্ষাজীবন ১৯৬৩ সালের ৩১ আগস্ট কলকাতায় জন্ম। তার বাবা-মা উভয়েই চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বাবা সুনীল ঘোষ ছিলেন তথ্যচিত্র-নির্মাতা ও চিত্রকর। তিনি সাউথ পয়েন্ট হাই স্কুলে পড়াশোনা করেন এবং যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতি বিষয়ে ডিগ্রি অর্জন করেন। বিজ্ঞাপন দুনিয়ায় চলচ্চিত্র জগতে আসার আগে ঋতুপর্ণ ঘোষ ছিলেন কলকাতার একজন ‘অ্যাডভারটাইসমেন্ট কপিরাইটার’। ১৯৮০-র দশকে বাংলা বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায় বেশ কিছু জনপ্রিয় এক লাইনের শ্লোগান লিখে দিয়েছিলেন তিনি। সেই সময় কলকাতায় ইংরেজি ও হিন্দি বিজ্ঞাপনগুলো বাংলায় অনুবাদ করে চালানো হতো। ঋতুপর্ণ বাংলায় স্বতন্ত্র বিজ্ঞাপনী শ্লোগানের ধারা সৃষ্টি করেন। তার সৃষ্ট বিজ্ঞাপনগুলোর মধ্যে শারদ সম্মান ও বোরোলিনের বিজ্ঞাপনদুটি বিশেষ জনপ্রিয় ছিল। কোনো কোনো সমালোচকের মতে, বিজ্ঞাপনী চিত্র নির্মাণের মাধ্যমে দর্শকদের কাছে আবেদন পৌঁছে দেওয়ার এক বিশেষ দক্ষতা তিনি অর্জন করেছিলেন, যা বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বাঙালি সমাজে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা পায়। চলচ্চিত্র জীবন ঋতুপর্ণ ঘোষ তার গোটা সৃজন-জীবন ধরেই এই রূপান্তরের কাজটাই খুব দক্ষ হাতে করে গিয়েছেন। পরিচিত কোনো গল্প থেকেও যদি ছবি বানিয়েছেন, তা হয়ে উঠেছে স্বকীয়তায় উজ্জ্বল এক ট্রান্সক্রিয়েশন। ঋতুপর্ণ পরিচালিত প্রথম ছবি ছিল ‘হীরের আংটি’ নামের শিশুতোষ চলচ্চিত্র। ১৯৯২ সালে নির্মিত শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে এই চলচ্চিত্রটিই তার প্রথম সৃষ্টি। চলচ্চিত্র হিসেবে ‘হীরের আংটি’ জনপ্রিয় হয়েছে, মূল গল্পের মেজাজ এবং দক্ষ কাহিনীকার শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের নিজস্বতা, অর্থাত্ গল্প বলার সহজিয়া কায়দা, তাকে সম্পূর্ণ অটুট রেখেই। এরপরই তৈরি করেন তিনি ‘ঊনিশে এপ্রিল’। গুরু বার্গম্যানের অটাম সোনাটা ছবির দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি এই চলচ্চিত্রটি নির্মাণ করেন। অপর্ণা সেন, দিপঙ্কর দে, দেবশ্রী রায় এবং প্রসেনজিত্ অভিনীত এই চলচ্চিত্র মুক্তির সঙ্গে সঙ্গে আলোচনার কেন্দ্রে চলে আসে। দ্বিতীয় ছবিতেই ঋতুপর্ণ ভারতীয় জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার ছিনিয়ে নেন। মা ও কন্যার অনুভূতিশীল সম্পর্ক আর ডিটেইলের ব্যবহার এই চলচ্চিত্রকে আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়েছে। মা-বাবা-মেয়ের পারিবারিক সম্পর্কের বিষয়টি তার একাধিক চলচ্চিত্রেই উঠে এসেছে। ‘অসুখ’ চলচ্চিত্রেও দেখা যায় অভিনেত্রীর কন্যা রোহিনী এবং তার মা-বাবার সম্পর্ক নিয়ে টানাপোড়েন হচ্ছে। আকস্মিক রোহিনীর মায়ের অসুখকে কেন্দ্র পুরো পরিবারে সংকট তীব্রতর হয়ে ওঠে। পারিবারিক সম্পর্কের সংকট ও অনুভব ঋতুপর্ণকে বরাবরই ভাবিয়েছে। তার ‘তিতলি’ চলচ্চিত্রে অপর্ণা সেন ও কঙ্কনা সেন অভিনয় করেছেন মা-মেয়ের চরিত্রে যারা বাস্তব জীবনেও মা-মেয়ে। নির্জন এক পাহাড়ি এলাকায় মেয়ে তিতলির স্বপ্নের নায়ক রোহিত রায় এসে হাজির হয় শুটিং করতে। তিতলির ঘরে এই নায়কের ছবি, তার তরুণ মনে রোহিতকে নিয়ে অনেক স্বপ্ন। এমন সময়ই দার্জিলিংয়ের পাহাড়ি পথে রোহিত রায়ের গাড়ি নষ্ট হয়ে গেলে তিতলিদের গাড়িতে তিনি লিফট নেন। তিতলির মা উর্মিলা মেয়ের এই বালখিল্যকে খুব একটা গুরুত্ব দেন না। এক পর্যায়ে উর্মিলা ও রোহিতের মধ্যে পাইন বনের ধারে কথা হয়। জানা যায়, রোহিত আর উর্মিলা ভালোবেসেছিল একে অপরকে। কিন্তু রোহিতের নায়ক হওয়ার অনিশ্চিত স্বপ্নের কারণেই তাদের বিয়েটা হয়নি। তাদের কথার আড়ালে তিতলি এসে সব শুনে ফেলে। এবার আর সে রোহিতকে সহ্য করতে পারে না। মা-মেয়ের একই স্বপ্নের নায়ক নিয়ে গুমোট এক পরিবেশ তৈরি হয়। ছবির শেষে দেখা যায় তীব্র বৃষ্টি হচ্ছে আর উর্মিলা কাঁদছে এবং ক্রন্দসী মায়ের পাশে মেয়ে তিতলিই সান্ত্বনা বয়ে আনছে। শুধু গল্প নয়, পরিবেশ, বিষয়, এ ছবির লোকেশন, সংলাপ, কবিতার ব্যবহার, বিশেষ করে কালিদাসের মেঘদূতের উদ্ধতি এ চলচ্চিত্রকে অদ্ভুত সৌন্দর্য আর মাধুর্য এনে দিয়েছে। দার্জিলিংয়ে মনোরম লোকেশনে কয়েকজন মাত্র শিল্পী নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্র মুন্সিয়ানার দাবিদার। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘চোখের বালি’ উপন্যাস অবলম্বনে ২০০৩ সালে তিনি তৈরি করেন ‘চোখের বালি’ চলচ্চিত্র। ঐশ্বরিয়া রাই, প্রসেনজিত্, রাইমা সেন অভিনীত এই চলচ্চিত্র পরবর্তীতে হিন্দিতে ডাবিং করে প্রচার করা হয়, যা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে খ্যাতি অর্জন করে। দেশ-বিদেশের সমালোচকদের কাছে আলোচিত এই চলচ্চিত্র সুইজারল্যান্ডের লোকার্নো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে গোল্ডেন লেপার্ড সেরা চলচ্চিত্র পুরস্কার জিতেছে। শিকাগো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র ও টরেন্টো আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উত্সবে এটি বিশেষ সম্মানের সাথে প্রদর্শিত হয়েছে। সদ্য বিধবা তরুণীর প্রেম-বেদনা-কামনার এক সাহসী চিত্রায়ণ ঘটেছে ‘চোখের বালি’ চলচ্চিত্রে। উনিশ শতকের জমিদারি প্রেক্ষাপটে নির্মিত ‘অন্তরমহল’ চলচ্চিত্রেও ঋতুপর্ণ যথেষ্ট সাহসিকতা দেখিয়েছেন। রাজা ভুবনেশ্বর চৌধুরী ব্রিটিশ সরকারকে খুশি করতে গিয়ে দেবী দুর্গার প্রতিমাতে রানি ভিক্টোরিয়ার আদল দিতে বলেন। অন্যদিকে তিনি নিঃসন্তান। একাধিক বিয়ে করলেও আসলে তিনি সন্তান জন্ম দিতে অপারগ। তার নতুন রানি যশোমতী অবশেষে এক ভাস্করের সঙ্গে মিলিত হয়। জ্যাকিশ্রফ, অভিষেক বচ্চন, সোহা আলি খান, রূপা গাঙ্গুলির মতো শিল্পী নিয়ে নির্মিত এই চলচ্চিত্র বিষয় ও ভাবনার দিক থেকে পরিণত এবং প্রাপ্তবয়স্ক। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে নির্মিত ‘দোসর’ ছবিতে দেখা যায় দাম্পত্য সম্পর্কের আড়ালে গড়ে ওঠা এক পরকীয়া প্রেমের ভয়ঙ্কর পরিণতি। কৌশিক আর কাবেরি আপাত সুখী দম্পতি। একটি সড়ক দুর্ঘটনায় সব পাল্টে যায়। দুর্ঘটনার পর কৌশিক মারাত্মকভাবে আহত হয়। জানা যায় তার পাশে ছিল তার অফিসের সহকর্মী ও প্রেমিকা মিতা। মিতা আর কৌশিক প্রায়ই অফিসের নাম করে নানা জায়গায় যেত। এই দুর্ঘটনায় মিতার মৃত্যু আর কৌশিকের জীবন-মরণ লড়াই স্বামী-স্ত্রী সম্পর্ককে নতুন করে ভাবতে শেখায়। ঋতুপর্ণ ঘোষের অনেক দিনের শখ ছিল সাদা-কালোতে সাম্প্রতিক বিষয়ে একটি চলচ্চিত্র করবেন। তাই ২০০৬ সালে নির্মিত ‘দোসর’ ছবিটি তিনি চিত্রায়িত করেন সাদাকালোয়। তার মুক্তিপ্রাপ্ত শেষ ছবি ‘চিত্রাঙ্গদা’তে এক অসম্ভব জটিল থিম। আমাদের অপরিচিত এক মনোজগত থেকে উত্সারিত লিঙ্গান্তরকামিতার কথা বলেছেন পরিচালক। যা দারুণ সাহস এবং সংবেদনশীলতার সঙ্গে, যা একইরকম সহজে ছুঁয়ে গিয়েছে বৃহত্তর নাগরিক সমাজকে। একদিকে তিনি ছিলেন পরিচালক, অন্যদিকে সামাজিক আন্দোলনের অগ্রসৈনিক। এ ছাড়াও সংবাদ প্রতিদিনের জনপ্রিয় রবিবার ম্যাগাজিনের সম্পাদক ছিলেন মৃত্যুর আগ মুহূর্ত পর্যন্ত। এর আগে আনন্দবাজার গোষ্ঠীর প্রকাশনা আনন্দলোকের সম্পাদক হিসেবে কাজ করেছেন দীর্ঘদিন। ওই সময় বাংলাদেশের বহু লেখকের সঙ্গে ছিল তার প্রত্যক্ষ যোগাযোগ। সম্পাদকের দায়িত্ব পালন ছাড়াও ঋতুপর্ণ নৃত্য পরিচালক, স্ক্রিপ্ট রাইটার, চলচ্চিত্র গবেষক ও শিল্প নির্দেশকের গুরুদায়িত্ব পালন করেছেন অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে। সত্যজিত্ রায়ের পর এতগুলো গুণ নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাতাদের মধ্যে তার চেয়ে কেউ এগিয়ে নেই। এ কারণেই অল্প সময়ে ভারতের চলচ্চিত্র মহলে তিনি সবার শ্রদ্ধাভাজন হয়ে উঠেছিলেন। টালিগঞ্জ ও মুম্বাইয়ের বলিউডে তাকে পাওয়া গেছে কাছের মানুষ, কাজের মানুষ এবং একজন শিক্ষক হিসেবে। তার যত চলচ্চিত্র হীরের আংটি (১৯৯২) উনিশে এপ্রিল (১৯৯৪) দহন (১৯৯৭) বাড়িওয়ালি (১৯৯৯) অসুখ (১৯৯৯) তিতলি (২০০২) শুভ মহরত (২০০৩) চোখের বালি (২০০৩) রেইনকোট (২০০৪) অন্তরমহল (২০০৫) দোসর (২০০৬) দ্য লাস্ট লিয়ার (২০০৭) খেলা (২০০৮) সব চরিত্র কাল্পনিক (২০০৮) আবহমান (২০১০) নৌকাডুবি (২০১০) আরেকটি প্রেমের গল্প (২০১১) সানগ্লাস (২০১২ মুক্তি পায়নি) চিত্রাঙ্গদা (২০১২) চোরাবালি (অসমাপ্ত)