হঠাত্ জীবনের সূচিটা বদলে গেছে। জিম, অনুশীলন, প্রিমিয়ার লিগ নিয়ে চিন্তা; কতো কী করার কথা ছিল এই সময়ে! কিন্তু কিছুই করছেন না আশরাফুল। নিজের বাসায় নিজেকে আটকে ফেলেছেন। সারাদিন বাসায় বসে থাকা, দু’একজন ‘সাবেক’ সতীর্থ বা শিক্ষকরা কেউ এলে; একটু গল্প করা এবং সারাদিন টিভিতে চোখ বোলানো; গত দু’দিন ধরে এই আশরাফুলের দৈনন্দিন জীবন। এই জীবনই এখন মেনে নিতে হচ্ছে বাংলাদেশের সাবেক অধিনায়ক, দেশের প্রথম বড় তারকা মোহাম্মদ আশরাফুলকে। মেনে না নিয়ে উপায়ও নেই। আপাতত তিনি যে ক্রিকেট থেকে নির্বাসিত! বাংলাদেশে প্রিমিয়ার লিগে (বিপিএল) এবং কমপক্ষে তিনটি আন্তর্জাতিক ম্যাচে স্পট ফিক্সিংয়ের অপরাধ নিজের মুখেই স্বীকার করে নিজেকে নির্বাসনে পাঠানোর কাজটা তরান্বিত করেছেন আশরাফুল। আইসিসির দুর্নীতি দমন ইউনিটের (আকসু) কাছে স্বীকারোক্তি দেয়ার ফলে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি) তাকে তদন্ত রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত সব ধরনের ক্রিকেট থেকে দূরে সরিয়ে রেখেছেন। তদন্ত রিপোর্ট এলে এই নির্বাসনটা বহিষ্কারে পরিণত হওয়ারই কথা।
এখন তাই ক্রিকেটবিহীন জীবনের সঙ্গে মানিয়ে নিতেই হবে আশরাফুলকে।
আশরাফুল কাল বিকালে যা বলছিলেন, তাতে বোঝাই যাচ্ছিল, এই মানিয়ে নেয়াটা খুব সহজ হচ্ছে না। ম্লান হেসে ফোনে বলছিলেন, ‘এই সন্ধার পর একটু বাসা থেকে নামলান। ফোন নম্বর তেমন কেউ জানে না; তাই ফোন-টোনও কম আসছে। দু’একজন টিমমেট এসেছিল। এ ছাড়া চুপচাপ বাসায়ই থাকার চেষ্টা করছি।’
আশরাফুল এই পরিস্থিতির সঙ্গে হয়তো নিজেকে মানিয়ে নিচ্ছেন; কিন্তু তাকে ছাড়া বাংলাদেশের ক্রিকেটের মানিয়ে নেয়াটা খুব সহজ হবে না। এ মাসেরই ২০ তারিখ প্রিমিয়ার ক্রিকেটের দল বদল, এরপর শুরু হবে প্রিমিয়ার, শুরু হবে ক্রিকেটের আরও অনেক প্রস্তুতি। এর কোনো কিছুর মধ্যেই আর থাকবেন না আশরাফুল।
সেটা ভেবে তার সতীর্থরা বিস্মিত, শোকাহত। মিরপুর স্টেডিয়ামে কাল অনুশীলনে এসে বেশিরভাগ খেলোয়াড়ই মুখে তালা লাগিয়ে রাখতে চাইলেন। তারও মাঝে মাশরাফি বিন মুর্তজা বা জিয়াউর রহমান বললেন, তাদের কষ্টের কথা, এখনও বিশ্বাস করে উঠতে না পারার কথা।
বিশ্বাস আসলে কেউই করতে পারছে না। সারা পৃথিবীর ক্রিকেটে একটা আলোড়ন তৈরি হয়ে গেছে আশরাফুলের এই স্বীকারোক্তিতে। মুম্বাই, করাচি, মেলবোর্ন, সিডরি, লন্ডন, কলম্বো, জ্যামাইকা থেকে শুরু করে সেই নিউইয়র্ক পর্যন্ত বড় বড় পত্রিকাগুলোর খেলার পাতায় আশরাফুলের বড় বড় ছবি, আর আশরাফুলকে নিয়ে বিস্ময়বোধক একটা হেডলাইন। সিডনি মর্নিং হেরাল্ড পত্রিকা একাই সবার হয়ে বলে দিয়েছে সব কথা—ফল অব আ হিরো; একজন নায়কের পতন!
এই ‘নায়কের’ পতনে ধাক্কা খেয়েছেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটাররাও। কমবেশি অনেকেই যার যার বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। আশরাফুল যে মুশতাক মোহাম্মদের রেকর্ড ভেঙে সবচেয়ে কম বয়সে সেঞ্চুরি করেছিলেন, সেই পাকিস্তানি গ্রেট মুশতাকও নিজের বিস্ময় ও শোক চেপে রাখতে পারেননি। একটি পত্রিকাকে বলেছেন, ‘এতো ভালো একটা ছেলে, এতো ভালো খেলোয়াড়! ও এমন করবে, কল্পনা করিনি।’ সবাই এখন এই কল্পনা করতে না পারা ব্যাপারটা মেনে নেয়ার লড়াইয়ে আছেন।
