প্রধানমন্ত্রী ও সংসদ নেতা শেখ হাসিনা অচিরেই একটি গার্মেন্টস শিল্পপার্ক গড়ে তোলা হবে জানিয়ে দেশের তৈরি পোশাক খাতে বর্তমানে সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি সম্পর্কে বলেছেন, যে কোনো শিল্প-কারখানা প্রথমে গড়ে ওঠে নিজেদের মতো করে। কিন্তু আশির দশকে গার্মেন্টস শিল্প বিকাশের সময় ক্ষমতাসীন সরকারগুলো কোন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি বলেই আজ যত্রতত্র গার্মেন্টস শিল্প গড়ে উঠেছে। অচিরেই একটি গার্মেন্টস শিল্পপার্ক গড়ে তোলার পাশাপাশি দেশের সাত বিভাগে সাতটি অর্থনৈতিক অঞ্চল গড়ে তোলার মাধ্যমে গার্মেন্টস শিল্প ঢাকার পাশাপাশি সারাদেশেই গড়ে তোলা হবে।
বুধবার বিকালে জাতীয় সংসদের অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। স্পিকার ড. শিরিন শারমিন চৌধুরী অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন। সংসদ সদস্য আবদুর রহমান ও মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী শ্রমিকদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধিতে ওয়েজবোর্ডের ঘোষণা দিয়ে বলেন, দেশের গার্মেন্টস শিল্পে নিরাপদ কর্ম-পরিবেশ সুরক্ষা, দুর্ঘটনা প্রতিরোধ এবং শ্রমিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে উচ্চ পর্যায়ের একটি শক্তিশালী কমিটি গঠন করা হয়েছে। সাভারে ভবন ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের সার্বিক পুনর্বাসনের ঘোষণা দিয়ে তিনি বলেন, সাভারের রানা প্লাজা ধসে ক্ষতিগ্রস্তদের পিছনে সরকার এ পর্যন্ত প্রায় ৭ কোটি টাকার অনুদান দিয়েছে। আহতরা সুস্থ না হওয়া পর্যন্ত তাদের চিকিত্সার সার্বিক ব্যয় সরকার বহন করবে। নিহত প্রতিটি পরিবারকে এমনভাবে সহযোগিতা করা হচ্ছে যাতে তারা ভবিষ্যতে উপার্জনের ক্ষমতা অর্জন করে।
প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে বিরোধী দল অনুপস্থিত থাকলেও পরে অবশ্য অধিবেশনে অংশগ্রহণ করেন। তৃতীয় দিনেও যথারীতি বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়া ছিলেন অনুপস্থিত। প্রশ্নোত্তর পর্বের শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী দেশের ইতিহাসে প্রথম নারী স্পিকার নির্বাচিত হওয়ায় ড. শিরিন শারমিন চৌধুরীকে অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, নারী আন্দোলনের পথিকৃত বেগম রোকেয়ার আক্ষেপ ছিল- ‘নারী হয়ে জন্মেছি বলেইকি আমরা জজ-ম্যাজেস্ট্রেট হতে পারবো না?’ আমরা বেগম রোকেয়ার সেই আক্ষেপ পূরণ করেছি। শুধু জজ-ম্যাজিস্ট্রেট বা বিচারপতিই নয়, পৃথিবীর ইতিহাসে বাংলাদেশই প্রথম যেখানে সংসদ নেতা, বিরোধী দলীয় নেতা, সংসদ উপনেতা ও জাতীয় সংসদের স্পিকার এই চারজনই নারী। আমরাই নারীর ক্ষমতায়নে সারাবিশ্বে নজীর সৃষ্টি করেছি।
জাসদের কার্যকরী সভাপতি মইনউদ্দীন খান বাদলের এক সম্পূরক প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীও আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলেন, বাংলাদেশেও যেকোনো সময় বড় ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে। রাজধানী ভূ-কম্পন এলাকা হওয়া সত্ত্বেও বিগত সরকারগুলো তা মোকাবেলার কোনই প্রস্তুতি নেয়নি। ’৯৬ সালে প্রথম সরকারে এসে ভূমিকম্প মোকাবেলায় আমরা ব্যাপক পদক্ষেপ গ্রহণ করি। শুধুমাত্র আধুনিক যন্ত্রপাতিই আমদানী নয়, ভূমিকম্প মোকাবেলায় দেশে-বিদেশে ব্যাপক ট্রেনিংয়েরও ব্যবস্থা করেছি।
সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য বেগম রওশন জাহান সাথীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সাভারের রানা প্লাজা ভবন ধসের ঘটনায় এ পর্যন্ত ২ হাজার ৪৩৮ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ১ হাজার ৫৯৬ জনকে বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিত্সা সেবা প্রদান করা হয়েছে। সশস্ত্র বাহিনীর ১৮টি মেডিক্যাল টিম কাজ করেছে। গুরুতর আহত ২১ জনের অঙ্গহানি হয়েছে এবং ১৯০ জনের দীর্ঘমেয়াদী চিকিত্সা প্রয়োজন। রোগীদের সকল প্রকার চিকিত্সা, ওষুধ ও অন্যান্য সামগ্রী বিনামূল্যে প্রদান করেছে সরকার। আহতরা সম্পূর্ণ আরোগ্য না হওয়া পর্যন্ত চিকিত্সার সব ব্যয় সরকার বহন করবে।
তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর সার্বিক তত্ত্বাবধানে কেন্দ্রীয় মনিটরিং সেল চিকিত্সা সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় তদারকি করছে। বিভিন্ন হাসপাতালে পরিদর্শনকালে আমার ব্যক্তিগত উদ্যোগে আহত প্রত্যেককে ১০ হাজার টাকা করে ৭৫০ জনকে মোট ৭৫ লাখ টাকা প্রদান করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, জেলা প্রশাসকদের কাছ থেকে প্রাপ্ত তালিকা অনুযায়ী চার পর্যায়ে ৫৫৫ জন নিহত ব্যক্তির পরিবারকে প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে মোট ৬ কোটি ২৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা প্রদান করেছি। পঙ্গুত্ববরণকারী ২৪ জনকে আজীবন ‘পারিবারিক সঞ্চয়পত্র’ চালুর লক্ষ্যে ২ কোটি ৬৫ লাখ টাকা আর্থিক সাহায্য প্রদান করা হয়েছে। সাভারস্থ ২২টি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে আহত রোগীদের চিকিত্সার খরচ বাবদ ১ কোটি ৪২ লাখ ১৪ হাজার টাকা পরিশোধ করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত ২০ মে থাইল্যান্ড সফরকালে উভয় পক্ষের মধ্যে বৈঠকের সময় থাই প্রধানমন্ত্রী ইংলাক সিনাওয়াত্রা সাভার ট্রাজেডিতে অঙ্গচ্ছেদ রোগীদের কৃত্রিম অঙ্গ প্রদানের প্রস্তাব করেন। আমি তাকে সম্মতি প্রদান করি। এছাড়া ভারত সরকারের অনুরূপ একটি প্রস্তাবও বিবেচনাধীন আছে।
সিলেট-৩ আসনের সংসদ সদস্য মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরীর প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রী গার্মেন্টস সেক্টরে তার সরকারের সফলতা তুলে ধরে বলেন, গার্মেন্টস শিল্প সেক্টরে ন্যূনতম মজুরি ১ হাজার ৬৬২ টাকা থেকে বৃদ্ধি করে ৩ হাজার টাকা করা হয়েছে-যা ২০১০ সালে ১ নভেম্বর থেকে কার্যকর হয়েছে। তিনি বলেন, মুন্সিগঞ্জ জেলার গজারিয়া উপজেলার বাউসিয়া এলাকায় একটি গার্মেন্টস শিল্প পার্ক স্থাপন প্রকল্প দ্রুত বাস্তবায়নের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের মহাপরিচালকের নেতৃত্বে একটি কমিটি কাজ করছে।
১৬৭ পরিবারকে অনুদানের চেক প্রদান
বাসস জানায়, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাভারে সম্প্রতি ভবন ধসের ঘটনায় নিহত আরো ১৬৭ জন গার্মেন্টস শ্রমিকের পরিবারের মধ্যে আর্থিক সহায়তার চেক বিতরণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বুধবার ঢাকায় তার কার্যালয়ে আর্থিক সহায়তার এসব চেক বিতরণ করেন। পরে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব আবুল কালাম আজাদ সাংবাদিকদের জানান, সাভার দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর মধ্যে এ পর্যন্ত ৪৫২টি পরিবার প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পর্যন্ত আর্থিক সহায়তা গ্রহণ করেছে।
প্রধানমন্ত্রী গুরুতরভাবে আহত ৪ জন গার্মেন্টস শ্রমিককে হুইল চেয়ারও দেন। আহত এসব শ্রমিক প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে তাদের আঘাতের ব্যাপকতা অনুযায়ী ১০ থেকে ১৫ লাখ টাকা পাবেন। খাদ্যমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক, বিজিএমইএ সভাপতি আতিকুল ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সচিব মোল্ল¬া ওয়াহিদুজ্জামান এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর সহকারী একান্ত সচিব সাইফুজ্জামান শিখর অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন।
এদিকে আরো সংস্থা ও ব্যক্তিবিশেষ সাভার ভবন ধসে আহত এবং নিহতদের পরিবারগুলোর জন্য প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিলে আর্থিক সহায়তার চেক হস্তান্তর করেছেন। প্রধানমন্ত্রী আজ ১৫টি সংস্থা ও ব্যক্তিবিশেষের কাছ থেকে অনুদানের চেক গ্রহণ করেন।
রাষ্ট্রপতির কার্যালয় এবং পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে তাদের একদিনের বেতনের সমপরিমাণ অর্থ দান করেন।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেন, প্রতিমন্ত্রী মাহবুবুর রহমান ও সচিব শেখ আলতাফ আলি মন্ত্রণালয় এবং এর অধীনস্থ বিভিন্ন দফতরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের একদিনের বেতনের চেক প্রধানমন্ত্রীর কাছে হস্তান্তর করেন।
ঢাকা আইনজীবী সমিতির সভাপতি কাজী এম নজিবুল্ল¬াহ হীরা ও সাধারণ সম্পাদক মো. খোরশেদ মিয়া আলমের নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর কাছে সমিতির ২২ হাজার সদস্যের অনুদানের চেক হস্তান্তর করেন।
বাংলাদেশ ইন্স্যুরেন্স অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে অ্যাসোসিয়েশনের একটি চেক হস্তান্তর করেন।
অন্য যেসব প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিলে অনুদানের চেক হস্তান্তর করেন তারা হচ্ছেন— মমতাজ ফারুক আদমজী ক্যান্টনমেন্ট স্কুল এন্ড কলেজ প্রাক্তন ছাত্র সমিতি, আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট গার্লস স্কুল এন্ড কলেজ, রোডস এন্ড হাইওয়েজ ডিপ্লোমা ইঞ্জিনিয়ার্স অ্যাসোসিয়েশন, আবদুল সালাম চৌধুরী, মাহমুদুন নবী বাকি, পটুয়াখালী পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট, যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগ, প্ল¬াস্টিক সামগ্রী প্রস্তুতকারক সমিতি, মিরপুর বঙ্গবন্ধু কলেজের চেয়ারম্যান এম এ হান্নান ও বগুড়া আওয়ামী লীগের আনছার আলী মৃধা।
‘গাছ লাগান পরিবেশ বাঁচান’
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রাজনৈতিক সহিংসতার সময় সড়ক ও মহাসড়কের ওপর গাছ কেটে ফেলা এবং প্রকৃতির বিরুদ্ধে যেকোন ধরনের বৈরি কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে সকলের সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছেন। প্রধানমন্ত্রী বুধবার ঢাকায় বঙ্গবন্ধু আন্তর্জাতিক সম্মেলন কেন্দ্রে বিশ্ব পরিবেশ দিবস, তিন মাসব্যাপী জাতীয় বৃক্তরোপণ কার্যক্রম এবং মাসব্যাপী বৃক্ষমেলা-২০১৩ উদ্বোধনকালে একথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, পুকুর অথবা লেক ছাড়া সরকার আবাসন অথবা শিল্প প্রকল্পের অনুমোদন দেবে না। তিনি বলেন, গাছ কেটে ফেলার জন্য দায়ী সকল ব্যক্তিকে পরিবেশ আইনের অধীনে বিচারের আওতায় আনা হবে। ক্ষতি পুষিয়ে নিতে তিনি জাতীয় বৃক্ষরোপণ মাসে নিজেদের বৃক্ষরোপণে যুক্ত করার জন্য বৃক্ষ ধ্বংসকারীদের প্রতি আহ্বান জানান।
বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয় আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন বন ও পরিবেশ মন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ। জাতীয় বৃক্তরোপণ কার্যক্রমের প্রতিপাদ্য হচ্ছে ‘গাছ লাগিয়ে ভরবো দেশ, তৈরি করবো সুখের পরিবেশ।’ প্রধানমন্ত্রী ধরিত্রীর প্রকৃতি রক্ষায় বর্ষা মৌসুমে প্রত্যেক নাগরিককে অন্তত তিনটি চারা—একটি ফলের, একটি ওষধি ও একটি কাঠ গাছ লাগানোর আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রী প্রাকৃতিক পরিবেশ সুরক্ষায় সকল উন্মুক্ত স্থান, বসতবাড়ি, পতিত জমি এবং রেললাইন, বাঁধ ও সড়কের পাশেসহ নতুন জেগে ওঠা চরে বৃক্ষরোপণের জন্য সকলের প্রতি আহ্বান জানান।
অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে জাতীয় পরিবেশ পদক ও বঙ্গবন্ধু পদক এবং বৃক্ষরোপণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ পদক বিতরণ করেন।
এ বছর তিনজনকে জাতীয় পরিবেশ পদক এবং অপর তিনজনকে বঙ্গবন্ধু পদক প্রদান করা হয়। বৃক্ষরোপণের জন্য ৩০ ব্যক্তি ও সংস্থাকে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ পদক প্রদান করা হয়। প্রধানমন্ত্রী এসময় বিশ্বপরিবেশ দিবস-২০১২ স্মারক ডাক টিকেট উন্মোচন করেন।
