বিস্ময়কর ঘটনা সম্বলিত রসূল (স.)-এর মেরাজ

আপডেট : ০৬ জুন ২০১৩, ১৮:০৫
(পূর্ব প্রকাশের পর) তারপর আমরা চলতেই থাকি। ইত্যবসরে একটি নারী তার বাহু দুটি উলঙ্গ করে এবং সবরকম সৌন্দর্য যা আল্লাহ সৃষ্টি করেছেন তার মধ্যে তা রয়েছে। অতঃপর সে বলে, হে মুহাম্মদ (স.)! আমাকে দেখুন, আমি আপনাকে কিছু জিজ্ঞেস করবো। আমি তার দিকে তাকালাম না। পরিশেষে আমরা বাইতুল মুকাদ্দাসে এসে গেলাম। অতঃপর আমি আমার জন্তুটাকে সেই চক্রে বাঁধলাম, যাতে নবীগণ (তাঁদের জন্তুগুলো) বাঁধতেন। তারপর আমি পথে আমাকে আহ্বানকারীদের সম্পর্কে জিবরীলকে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বলেন, ডানদিকের আহবানকারীটি ইহুদী। আপনি যদি ওর ডাকে সাড়া দিতেন তাহলে আপনার উম্মত ইহুদী হয়ে যেত। বামদিকের আহ্বানকারীটি খৃষ্টান। আপনি যদি ওর ডাকে সাড়া দিতেন তাহলে আপনার উম্মত খৃষ্টান হয়ে যেতো। আর উলঙ্গ বাহু রংঢং করা নারীটি এই পৃথিবী। আপনি যদি ওর ডাকে সাড়া দিতেন তাহলে আপনার উম্মত পরকালের ওপর এই দুনিয়াকে প্রাধান্য দিত। তারপর আমি এবং জিবরীল বাইতুল মুকাদ্দাসে প্রবেশ করলাম। অতঃপর আমাদের প্রত্যেকেই দু-রাকাআত নামায পড়লাম। আবু সায়ীদ খুদরীর (রা.) বর্ণনায় আছে, নবী (স.) বলেন, আমি যখন বাইতুল মুকাদ্দাসের কর্মসূচি থেকে অবসর পেলাম তখন একটি সিঁড়ি আমার কাছে আনা হল। এর চেয়ে সুন্দর জিনিস আমি দেখিনি। এটাই সিঁড়ি যার দিকে মরণাপন্ন ব্যক্তি চেয়ে থাকে যখন তার কাছে মরণ হাজির হয়। অতঃপর জিবরীল আমাকে তাতে চড়িয়ে দিলেন। পরিশেষে আমি আকাশের দরজাগুলোর মধ্যে একটি দরজার কাছে পৌঁছলাম। যার নাম বা-বুল হাফাযাহ্ তথা সংরক্ষিতকারীদের দরজা। তাতে একজন ফেরেশতা আছে। যার নাম ইসমায়ীল। তার অধীনে বার হাজার ফেরেশতা আছে। ওদের মধ্যকার ফেরেশতার অধীনে বার হাজার করে ফেরেশতা আছে (তাফসীরে ত্ববারী, ১৫ খণ্ড, ১১ পৃষ্ঠা, তাহযীবুল সীরাতি ইবনে হিশাম ১ ম খণ্ড, ৯২ পৃষ্ঠা)।বাইহাকীর বর্ণনায় আছে, পৃথিবীর অতি নিকটবর্তী ফেরেশতার নাম ইসমায়ীল। তার সামনে আছে সত্তর হাজার ফেরেশতা। তার প্রত্যেক ফেরেশতার সাথে একলাখ ফেরেশতার বাহিনী আছে। তিনি বলেন, অতঃপর জিবরীল আকাশটির দরজা খোলার প্রার্থনা করলেন। বলা হল, কে? তিনি বললেন, জিবরীল। আবার বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ (স.)। বলা হয়, তার কাছে লোক পাঠানো হয়েছে কি? তিনি বললেন, হ্যাঁ। অতঃপর আদম (আ.) কে সেই আকৃতিতে দেখা গেল যে-আকৃতিতে আল্লাহ তাকে প্রথম দিনে সৃষ্টি করেছিলেন (তাফসীর ইবনে কাসীর ৩য় খন্ড, ১৩ পৃষ্ঠা)।তারপর আমাদের ২য় আসমানে চড়ানো হল। অতঃপর জিবরীল দরজা খোলার প্রার্থনা করলেন। তখন বলা হল, আপনি কে? তিনি বললেন জিবরীল। বলা হল, আপনার সাথে কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বল হল, তার কাছে (দূত) পাঠানো হয়েছে কি? তিনি বললেন, পাঠানো হয়েছে। অতঃপর আমাদের জন্য দরজা খোলা হল। হঠাত্ আমি দুই খালাতো ভাইকে পেলাম। তারা হলেন, ঈসা ইবনে মারয়্যাম এবং ইয়াহ্ইয়া ইবনে যাকারিয়্যা। তারা দু’জন আমাকে স্বাগতম জানালেন এবং আমার ভালোর জন্য দুআ দিলেন (মুসলিম, ১ম খন্ড, ৯১ পৃষ্ঠা)। তারপর আমাকে নিয়ে জিবরীল ৩য় আসমানে চড়লেন। অতঃপর দরজা খোলার আবেদন করলেন। বলা হল কে? তিনি বললেন, মুহাম্মদ। বলা হল, তার কাছে দূত পাঠানো হয়েছে কি? তিনি বললেন হাঁ। এবার বলা হল তাঁকে স্বাগতম। অত:পর কি সুন্দর আগমন এটা। তারপর দরজা খোলা হল। অত:পর যখন আমি (৩য় আকাশে) পৌঁছলাম তখন ইউসুফকে পেলাম। জিবরীল বললেন, ইনি ইউসুফ। তাকে সালাম করুন। তাই আমি তাঁকে সালাম করলাম। তিনি সালামের জওয়াব দিলেন, তারপর বললেন, সত্ ভাই ও সত্ নবীকে স্বাগতম! (বুখারী, মুসলিম, মিশকাত ৫২৭ পৃষ্ঠা)। অন্য বর্ণানায় আছে, ইউসুফকে দুনিয়ার অর্ধেক সৌন্দর্য দান করা হয়েছে। (মুসলিম ১ম খণ্ড, ৯১ পৃষ্ঠা)। আর এক বর্ণনায় আছে, তিনি পূর্ণিমার চাঁদের মত (তাহযীবু সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খণ্ড ৯৩ পৃষ্ঠা)।তারপর একে একে চতুর্থ আকাশে হযরত ইদ্রিস (আ.), পঞ্চম আকাশে হযরত হারুন (আ.), ষষ্ঠ আকাশে হযরত মুসা (আ.)-এর সাথে সাক্ষাত্ করলেন।তারপর সপ্তম আসমানে হযরত ইব্রাহিম (আ.)-এর সাথে সাক্ষাত্ হলে—জিবরীল (আ.) বললেন, ইনি আপনার বংশ পিতা, তাঁকে সালাম করুন। তাই আমি তাকে সালাম দিলাম। তিনিও সালামের জবাব দিলেন এবং বললেন সত্ পুত্র ও সত্ নবীকে স্বাগতম।তারপর আমাকে সিদ্রাতুল মুন্তাহা পর্যন্ত তোলা হল। অত:পর হঠাত্ দেখলাম, ওর ফলগুলো বড় বড় কলসির মত এবং ওর পাতাগুলো হাতীর কানের মত। তিনি বললেন, এটা সিদ্রাতুল মুন্তাহা। ওখানে ৪টি নদী আছে। দুটি নদী ভেতরমুখী এবং দুটি নদী বাহিরমুখী। আমি বললাম, এ দুটি কি? হে জিবরায়ীল! তিনি বললেন, ভেতরমুখী দুটো জান্নাতের মধ্যকার নদী। আর বাহিরমুখী দু’টি (মিসরের) নীল এবং (ইরাকের) ফোরাত নদী। তারপর আমাকে বাইতুল মামূরে তোলা হল। তারপর আমার কাছে কতিপয় পাত্র আনা হল- মদের পাত্র ও দুধের পাত্র এবং মধুর পাত্র। আমি দুধটাকে ধরলাম। জিবরীল বললেন, এটাই তো প্রকৃত স্বভাব যার ওপরে আপনি আছেন এবং আপনার উম্মতও আছেন (বুখারী ও মুসলিম, মিশকাত, ৫২৭ পৃষ্ঠা)।অন্য বর্ণানায় আছে, আমি আসমানে বাইতুল মামুরে পিট ঠেকিয়ে সুন্দরতম পুরুষের বেশে আমাদের বংশ পিতা হযরত ইবরাহীমকে দেখলাম। তার সঙ্গে কিছু লোকও ছিল। আত:পর আমি তাঁকে সালাম দিলাম। তিনিও আমাকে সালাম দিলেন। অতঃপর আমি আমার উম্মতকে দু’টি দলে দেখলাম। একটি ভাগ এমন যাদের দেহে সাদা কাপড় রয়েছে। তারা যেন কাগজের মত। আর একটি ভাগ এমন যাদের দেহে ছাইরং কাপড় রয়েছে। অত:পর আমি বাইতুল মামূরে প্রবেশ করলাম। এমতাবস্থায় আমার সাথে তারাও ঢুকলো যারা সাদা কাপড় পরিহিত ছিল। তারা একপাশে থাকলো। তবে তারা ভার অবস্থায় ছিল। আমি এবং সঙ্গীরা বাইতুল মামূরে নামাজ পড়লাম। তারপর আমি এবং সঙ্গীরা বেরিয়ে এলাম। তিনি (জিবরীল) বলেন, বাইতুল মামূর এমন ঘর যাতে প্রত্যেক দিন সত্তর হাজার ফেরেশ্তা নামাজ পড়েন তারপর কেয়ামত পর্যন্ত তারা ফিরে আসার সুযোগ আর পায় না। (বাইহাকীর দালা-য়িলুন নুবুওঅহ্, ২য় খন্ড ১৩৯ পৃষ্ঠা, তাফসীর দুর্রে মানসুর ৪র্থ খণ্ড, ২৬৮ পৃষ্ঠা)। তারপর আমাকে সিদরাতুল মুন্তাহার দিকে তোলা হল। এর প্রত্যেকটি পাতা ওই উম্মতকে প্রায় ঢেকে ফেলতে পারে। এর মধ্যে একটি ঝর্ণাও আছে। যার নাম সাল্সাবীল তা থেকে দুটি স্রোতধারা বের হচ্ছে। একটির নাম কাওসার এবং অপরটির নাম নাহ্রুর রহ্মাহ বা করুনা-ধারা। অত:পর তাতে আমি গোসল করলাম।তারপর আমাকে জান্নাতের দিকে তোলা হল। অত:পর একটি যুবতী আমাকে স্বাগতম জানালো। আমি বললাম, তুমি কার জন্য? হে যুবতী। সে বললো, (আপনার পালকপুত্র) যায়দ বিন হা-রিসার জন্য। অত:পর আমি কতিপয় নহরধারা দেখলাম স্বচ্ছ পানির এবং কতিপয় নহর দুধের যার স্বাদ পাল্টায়নি। যা পালনকারীদের জন্য মজাদার এবং কতিপয় নহর খাঁটি মধুর। আর ওর পাখীগুলো যেন বড় বড় উটের মত। ওর কাছে এসে রসূলুল্লাহ (স.) বলেন, নিশ্চয় আল্লাহ তার সত্ বান্দাদের জন্য এমন জিনিস তৈরি করে রেখেছেন যা কোন চোখ দেখেনি এবং কোন কান শোনেনি। আর কোন মানুষের মনের কল্পনায়ও তা আসতে পারে না। (ঐ, প্রথমোক্ত, ১৪০ পৃষ্ঠা এবং শেষোক্ত, ১৪০ পৃষ্ঠা এবং শেষোক্ত, ২৬৮ পৃষ্ঠা)। তারপর আমার সামনে জাহান্নাম পেশ করা হল। তার মধ্যে আল্লাহর গযব ও রাগ এবং তার ডাঁট ও শাস্তি রয়েছে। তার মধ্যে যদি পাথর ও লোহা ফেলা হয় তাহলে সে ওটাকে খেয়ে ফেলবে। (চলবে) ই-মেইল: [email protected]