বিজ্ঞানের আলোকে ইস্রা বা মেরাজ

আপডেট : ০৬ জুন ২০১৩, ১৮:০৫
বিশ্বমানবতার মুক্তিদূত মহানবী হযরত মুহাম্মদ মোস্তফা (স.) নবুওয়াত প্রাপ্তির পর তাঁর মক্কী জীবনের শেষ দিকে, মতান্তরে হিজরতের তিন বছর আগে রজব মাসের ২৭ তারিখের রাতে তিনি জাগ্রত অবস্থায় সশরীরে বোরাক নাম বাহনযোগে মক্কা মুকাররমা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাস এবং সেখান থেকে রফরফ যোগে ঊর্ধ্বালোকে পরিভ্রমণের মাধ্যমে সৃষ্টির অনন্ত রহস্য অবলোকন এবং আল্লাহপাকের পরম সান্নিধ্য অর্জন করেন। এর পর বায়তুল মুকাদ্দাস ফিরে এসে সব নবী-রাসূলের ইমাম হয়ে নামাজ আদায় করে মক্কায় ফিরে আসেন। নবীজির (স.) মক্কা থেকে বায়তুল মুকাদ্দাসের ভ্রমনকে ‘ইসরা’এবং বায়তুল মোকাদ্দাস থেকে উর্ধ্বালোকে ভ্রমনকে ’মেরাজ’ বলা হয়। মেরাজ আরবি শব্দ, যার অর্থ ওপরে ওঠার সিঁড়ি বা সোপান। ইসরা সম্পর্কে আল কুরআনের ১৭ নং সূরা ইসরা বা বনী ইসরাঈলের প্রথম আয়াতে (পবিত্র ও মহামহিমাময় তিনি যিনি তাঁর বান্দাকে রাতের আঁঁধারে ভ্রমণ করিয়েছিলেন ও মসজিদুল হারাম বায়তুল্লাহ হতে মসজিদুল আকসা বায়তুল মুকাদ্দাসে, যার পরিবেশ আমি আল্লাহ বরকতময় করেছিলাম তাঁকে আমার নির্দেশসমূহ দেখানোর জন্য”) এবং মেরাজ সম্পর্কে আলকুরআনের ৫৩ সংখ্যক সূরা আন নাজমের ৮ থেকে ১০ এবং ১৩ থেকে ১৮ নং আয়াতে উল্লেখ রয়েছে। আল কুরআনের পাশাপাশি বহুসংখ্যক বিশুদ্ধ হাদিসেও ইসরা ও মেরাজের ঘটনা বিস্তারিতভাবে বর্ণিত হয়েছে। প্রখ্যাত ফরাসী চিকিত্সক ও চিন্তাবিদ মরিস বুকাইলি (১৯২০-১৯৯৮) তাঁর The Bible, The Qur’an and Science (১৯৭৬) গ্রন্থে কুরআনে বর্ণিত তথ্য অকাট্য এবং সেখানে কল্পনার কোনো স্থান নেই বলে অভিমত রেখেছেন। তিনি কোরআনে বর্ণিত ‘অলৌকিক’ ঘটনাবলীর বৈজ্ঞানিক ভিত্তি প্রমাণের প্রয়াসও পেয়েছেন। আল কোরআনে ইসরা ও মেরাজের মত এমন আরও বাস্তব ঘটনা বর্ণিত হয়েছে যেমন হযরত মুসা (আ.)-এর দলবলসহ হেঁটে নীলনদ পার হওয়ার ঘটনা (৭ম সূরা আরাফ), হযরত ইবরাহিম (আ.) এর নমরুদের বিশাল অগ্নিকুন্ড থেকে রক্ষা পাওয়া (২১ সূরা আম্বিয়া আয়াত ৬৮- ৬৯), হযরত ঈসা (আ.)-এর উম্মতের জন্য আকাশ থেকে গায়েবি খাদ্য মান্না ও সালওয়া নামিয়ে দেয় (২ সূরা বাকারা ৫৭ আয়াত), হজরত ঈসা (আ.)-এর উম্মতের জন্য খাদ্যসজ্জিত টেবিল আকাশ থেকে নামিয়ে দেয়া (৫ সূরা মায়েদা ১১২-১৩ আয়াত), হযরত সুলাইমান (আ.)-এর নির্দেশে বিশেষ ফিতারের জ্ঞানী এক ব্যাক্তিত্ব রাষ্ট্রের রানী বিলকিসের সিংহাসনকে চোখের পলকে ইয়ামন থেকে উঠিয়ে আনা (২৭ সূরা নামল, আয়াত ৪০)। ১৪০০ বছর আগে রাসূল (স.) আল্লাহর আরশ পর্যন্ত ৫ হাজার বছরের পথ মুহুর্তের মধ্যে ভ্রমণ করে ফিরে আসার ঘটনা জগতের চিন্তাশীল ও বিজ্ঞানীদের গবেষণা কর্মের প্রেরণাকে প্রজ্জলিত করে। মহাকাশ সম্পর্কে অনুসন্ধিত্সা এবং চিন্তাভাবনা বহু আগে থেকে থাকলেও মহাকাশ বিজ্ঞানীদের সশরীরে মহাকাশ অভিযান শুরু হয় বিশ শতকের পাঁচের দশকে। এ অভিযানে প্রথম সফলতা আসে ১৯৬৯ নালে ২১ জুলাই। ২ লাখ ৫২ হাজার মাইল ভ্রমণ শেষে (্অ্যাপোলো ১১ নভোযানে) নীন আর্মস্ট্রং চাঁদের বুকে প্রথম পা রাখেন। আধুনিক যুগে মানুষ মহাশুন্যে পাড়ি দিচ্ছে। মানুষ এখন পৃথিবী থেকে সাড়ে ৩ কোটি মাইলদূরের মঙ্গলগ্রহেও বসবাসের চিন্তা করছে। বিজ্ঞানময় কোরআন, পদার্থ বিজ্ঞান, মহাজাগতিক বিজ্ঞান, আলোক বিজ্ঞান গতি বিজ্ঞানসহ সময়ের সর্বশেষ গবেষণালব্ধ ঘটনাগুলো ধরাবাহিকভাবে পর্যালোচনায় প্রমাণিত হয়েছে ইসরা ও মিরাজের সত্যতা স্পষ্ট ও সুপ্রমানিত। বিজ্ঞানীরা প্রমান করেছেন, ঘন্টায় ২৫ হাজর মাইল বেগে ঊর্ধ্বালোকে ছুটতে পারলে পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি থেকে মুক্তি লাভ করা যায়। একসময় মনে করা হতো পৃথিবীর মধ্যাকর্ষণ শক্তি অতিক্রম করে ঊর্ধ্বালোকে গমন সম্ভব নয়। কিন্তু এখন প্রমানিত হয়েছে শূন্যে অবস্থিত কোনো স্থুল বস্তুকে পৃথিবী যে সব সময় সমভাবে আকর্ষণ করতে পারে না। কেননা প্রত্যেক গ্রহের একটি নিজস্ব আকর্ষণী শক্তি আছে। পৃথিবী ও সূর্যের মাঝখানে এমন একটা স্থান আছে যেখানে কোনো আকর্ষণ-বিকর্ষণ নেই। তাই পৃথিবীর কোনো বস্তু যদি এই নিউট্রন জোনে পোঁছতে পারে অথবা এই সীমানা অতিক্রম করে সূর্যের সীমানায় পৌঁছে যেতে পারে তবে তার আর পৃথিবীতে ছিটকে পড়ার সম্ভাবনা থাকে না। গতি বিজ্ঞান স্থির করেছে, পৃথিবী থেকে কোনো বস্তুকে যদি প্রতি সেকেন্ড ৬.৯০ অর্থাত্ মোটামুটি সাত মাইল বেগে ঊর্ধ্বালোকে ছুড়ে দেয়া যায়, তবে তা আর পৃথিবীর বুকে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই। বোরাক আরবি বারকু শব্দ থেকে উদ্ভুত, যার অর্থ হলো বিদ্যুত (Electricity)। আর রফরফ-এর আভিধানিক অর্থ নরম তুলতুলে, সবুজ বিছানা। রফ রফ হলো বোরাকের চেয়েও শক্তিশালী, যা মানুষ কল্পনাও করতে পারবে না । বোরাক এবং রফ রফ এ গতি আলো বা বিদ্যুতের চেয়ে বেশি ছিল বলেই নবীজির(স.) পক্ষে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণ শক্তি ভেদ করা সম্পূর্ণ সম্ভব ছিল। গতির তারতম্যে সময়ের তারতম্য ঘটে। আধুনিক বিজ্ঞানীরা বলেন আলোর গতির যতই কাছে যাওয়া যায় সময় ততই শ্লথ হয়ে আসে এবং আলোর গতি অপেক্ষা বেশি দ্রুতগতি হলে সময় উল্টা দিকে প্রবাহিত হয়। রাসূল (স.)-এর বাহনের গতি আলোর গতির চেয়ে বেশি ছিল বলেই অল্প সময়ের মধ্যে ইসরা ও মিরাজের মতো এত বড় দীর্ঘ ভ্রমণ সম্ভব হয়েছিল। স্থান, কাল, জগত সব কিছুই গতির ওপর নির্ভরশীল। চোখের পলকে লাখ কোটি মাইল পথ অতিক্রম করার ক্ষমতা আল্লাহপাক বোরাক ও রফরফ কে দিয়েছেন। সূর্যরশ্মির চেয়েও ক্ষিপ্র রফরফ এর গতিবেগ। এটা নূরের তৈরি জান্নাতি বাহন। আলোর গতিবেগ অপেক্ষা অনেক বেশি অর্থাত্ এর গতি অকল্পনীয় দ্রুত। বিদ্যুত বা আলোর গতি প্রতি সেকেন্ডে ১ লাখ ৮৬ হাজার মাইল। বোরাক এর গতি এর চেয়েও দ্রুত হওয়ার কারণেই অতি অল্প সময়ের ব্যবধানে রাসূল (স.) এর সপ্তাকাশ ভ্রমণ সম্ভব হয়েছে। নবীজীর মেরাজ সশরীরে হয়েছিল বলেই বোরাক ও রফরফ-এর মতো বাহন ব্যবহূত হয়েছিল। লেখক :সাবেক সচিব ও এনবিআরের চেয়ারম্যান