১৯১৩ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ঠ সম্মাননা নোবেল পুরস্কার লাভ করেন। জানা যায়, ১৯১৩ সালে ১৩ নভেম্বর রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সংবাদ শান্তিনিকেতনে এসে পৌঁছে এবং তারপরই সারা দেশে এ সংবাদ ছড়িয়ে পড়ে। পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন অঞ্চলেও এই আনন্দবার্তা প্রচারিত হয়। এক-শ বছর আগে কোথায় কীভাবে সম্মাননা ও আনন্দ-উত্সব উদ্যাপিত হয়, তার বিস্তৃত বিবরণ সংগৃহীত না হলেও যা সংগ্রহ করতে পেরেছি, তা তুলে ধরলাম।
লক্ষণীয় বিষয়, ঠিক এ ঘটনার এক বছর পূর্বে ১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথের পঞ্চাশ বর্ষপূতি উপলক্ষে কলকাতার বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে কবিকে সংবর্ধনা জানানো হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখযোগ্য, কলকাতায়ও সে সময় রবীন্দ্র-সংবর্ধনার বিরুদ্ধে জনরব উঠেছিল। এমনকি রবীন্দ্রনাথ এ সংবর্ধনার জন্য লোলুপ ছিলেন এমন কটূক্তিও শোনা গেছে। দুঃখ করে রবীন্দ্রনাথ রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদীকে লিখেছিলেন, ‘ভগবানের কৃপায় আমি সত্য মিথ্যা অনেক নিন্দা জীবনে বহন করিয়া আসিয়াছি ; আজ আমার পঞ্চাশ বত্সর পূর্ণ হইবার মুখে এই আর একটি নিন্দা আমার জন্মদিনের উপহাররূপে লাভ করিলাম এই যে, আমি আত্মাসম্মানের জন্য লোলুপ হইয়াছি।’
কৌতুকের বিষয়, ঢাকার একমাত্র সংবাদপত্র ‘ঢাকাপ্রকাশ’ রবীন্দ্র-সংবর্ধনাকে ব্যঙ্গ করে ‘রবিপূজা’ শিরোনামে এক সুদীর্ঘ সম্পাদকীয় প্রকাশ করে। ইতিপূর্বে অনেক সুযোগ্য এবং দুস্থ সাহিত্যিক দেশবাসীর কাছ থেকে সংবর্ধনা বা সহানুভূতি পায়নি—এই দুঃখে পত্রিকাটি নিন্দাবাচক মন্তব্য লিখে কবির প্রতি চরম অসম্মাননা প্রদর্শন করে। প্রসঙ্গক্রমে বলা হয়—
কবিবর শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর অনন্যসাধারণ প্রতিভাশালী ! তাঁহার কবি-প্রতিভা ভাষার পরিপুষ্টি সাধনে যথেষ্ট চেষ্টা করিয়া সফলতা লাভ করিয়াছে সন্দেহ নাই। কিন্তু সূর্য্যকিরণে স্বাস্থ্য ও রোগজনন প্রবণতা দুইই আছে। রবি প্রতিভায়ও একদিকে সেইরূপ ভাষার পুষ্টিসাধনের সঙ্গে সঙ্গে পূতিগন্ধময় আবর্জনার সৃষ্টি করিয়া রাখিয়াছে। তাঁহার অন্ধভক্তের দল ভক্তিবন্যার প্রবল স্রোতে পড়িয়া রবীন্দ্রনাথের ভালমন্দ সকল দিকই সমান দেখিয়া গ্রহণ করিতেছেন। তাহাতে দেশের কি অনিষ্ট সাধিত হইতেছে, আমরা সময়ান্তরে তাহার সমালোচনা আশা রাখি।
এত বিরোধিতা ও বিরূপতা থাকা সত্ত্বেও ১৯১২-র ২৮ জানুয়ারি কলকাতার টাউন হলে মহাসমারোহে সংবর্ধনা অনুষ্ঠান উদ্যাপিত হয়। এই সংবর্ধনা সভায় কবিকে ‘শুভ্র হস্তিদন্তনির্মিত সুবর্ণ মণ্ডিত’ অভিনন্দনপত্র প্রদান করা হয়। অভিনন্দনপত্র পাঠ করেন ‘বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের’ সভাপতি রামেন্দ্রসুন্দর ত্রিবেদী।
১৯১৩ সালে নভেম্বর মাসেই সারা বাংলাদেশে রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির সংবাদ বহুল প্রচারিত হয়। ৩০ নভেম্বর ঢাকায় পূর্ববঙ্গ সাহিত্য সমাজের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই সভার স্থায়ী সভাপতি ছিলেন ঢাকার প্রখ্যাত আইনজীবী ও সমাজসেবী আনন্দচন্দ্র রায় (১৮৪৪-১৯৩৫)। সেদিন তিনি সভায় উপস্থিত হতে না পারায় ঢাকার ‘সারস্বতসমাজ’-এর প্রতিষ্ঠাতা প্রসন্নচন্দ্র বিদ্যারত্ন উক্ত সভায় সভাপতিত্ব করেন। ঢাকা প্রকাশের এক সংবাদে প্রকাশ—
সভা কবিবর শ্রীযুক্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মহাশয়ের উচ্চ সম্মান লাভে আনন্দ প্রকাশ করিয়াছেন। সভার প্রারম্ভে ও অন্তে গ্রামোফোন সহযোগে কবিবরের স্বরচিত চারিটি সঙ্গীত হইয়াছিল (ঢাকা প্রকাশ, ১৪ অগ্রহায়ণ ১৩২০/ ৩০নভেম্বর ১৯১৩)।
গ্রামোফোন রেকর্ডে চারটি রবীন্দ্র-সংগীত বাজানোর সংবাদে মনে হয়, সে সময় ঢাকায় সম্ভবত রবীন্দ্র-সংগীত-শিল্পীর সংখ্যা কম ছিল।
পরবর্তী বছর, ১৯১৪ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে (১০ ও ১১ ফাল্গুন ১৩২০) তারিখে পাবনা শহরে উত্তরবঙ্গ সাহিত্য সম্মিলনের সপ্তম অধিবেশন সুসম্পন্ন হয়। পাবনার কৃতী সন্তান বিচারপতি আশুতোষ চৌধুরী অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতি এবং নাটোরের মহারাজ শ্রীযুক্ত জগদিন্দ্রনাথ রায় সম্মিলনের সভাপতি নির্বাচিত হন। এ ছাড়াও কলকাতা থেকে আগত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, প্রমথনাথ চৌধুরী, যোগেশচন্দ্র চৌধুরী এবং ব্যোমকেশ মুস্তফী প্রমুখ বহু সাহিত্যসেবী পাবনা আগমন করেন। ১০ ফাল্গুন বেলা দুটার সময় সভা আরম্ভ হয়; প্রায় আড়াই হাজার লোক সভায় সমবেত হয়েছিল। রাজশাহীর খ্যাতনামা ঐতিহাসিক অক্ষয়কুমার মৈত্রেয় মহাশয়ের প্রস্তাবে মহারাজ জগদিন্দ্রনাথ রায় মহোদয় সভাপতির আসন গ্রহণ করে তাঁর অভিভাষণ পাঠ করেন। ঢাকা প্রকাশে বলা হয়, ‘সভাপতি মহোদয়ের অভিভাষণ পাঠ শেষ হইলে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির নিমিত্ত রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরকে ধন্যবাদ দেওয়া হয় এবং তদন্তরে তিনি এক বিনয়পূর্ব্বক বক্তৃতা করেন’ (ঢাকা প্রকাশ, ২৪ ফাল্গুন ১৩২০, ৮ মার্চ ১৯১৪)।
স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপস্থিতিতে এই সম্মাননা বিশেষ তাত্পর্যময়।
১৩১৯ সালে ময়মনসিংহের বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ এবং রয়েল এশিয়াটিক সোসাইটির সদস্য কেদারনাথ মজুমদার ‘সৌরভ’ নামে একটি উচ্চাঙ্গের সাহিত্য-পত্রিকা প্রকাশ করেন। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তি উপলক্ষে ‘সৌরভ’ পত্রিকার সম্পাদক ‘কবির সম্মান’ নামে বিশেষ সম্পাদকীয়তে কবির প্রতি সম্মাননা প্রদর্শন করেন। এই সম্পাদকীয় প্রবন্ধের শুরুতেই বলা হয়—
রবীন্দ্রনাথ বাঙ্গালী জাতির মুখোজ্জ্বল করিয়াছেন। তাঁহার যশঃ সৌরভ আজ পৃথিবী পরিব্যাপ্ত। ইংলণ্ড আমেরিকার মনীষিগণ বাঙ্গালী কবিকে যেরূপ সম্মান করিয়াছেন, তাঁহার স্মৃতি বিশ্ব-মানব সাহিত্যে চিরকাল দেদীপ্যমান থাকিবে (সৌরভ, ভাদ্র ১৩২০)।
রবীন্দ্রনাথের ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের ইংরেজি অনুবাদের জন্য তিনি এই পুরস্কার লাভ করেন। এ সম্পর্কে ‘সৌরভ’ পত্রিকার মন্তব্য বলা হয়, ‘রবীন্দ্রনাথের চারু তুলিকা স্পর্শে কবিতার সুকোমল দেহে যে কমনীয় সুষমা পরস্ফুিট হইয়া উঠে, ইংরেজি “গীতাঞ্জলি”তে তাহার অভাব বাঙ্গালী পাঠক মাত্রই তীব্রভাবে অনুভব করিবেন।’
তথাপি, ‘গীতাঞ্জলি’তে এমন কী মাদকতা আছে, যে জন্য ইংরেজি ‘গীতাঞ্জলি’ পাঠ করে ইংল্যান্ডের চিন্তাশীল ব্যক্তিগণ ‘আনন্দে আত্মহারা’ হয়ে গেলেন? এ প্রশ্নের জবাবে কেদারনাথ মজুমদার লিখেছেন—
ভোগ বিলাস বিষে জর্জ্জরিত হইয়া শান্তিলাভের আশায় কোন কোন সুসভ্য দেশের নরনারীগণ ভারতীয় নিবৃত্তিমার্গের অনুসরণ করিতেছেন ; তৃষ্ণাতুর আত্মার তৃপ্তি সাধনের জন্য উপনিষদে সার-সত্যের অনুসন্ধান করিতেছেন। সুতরাং ‘গীতাঞ্জলি’ তাঁহাদিগের নিকট অভিনব চিন্তার পথ উন্মুক্ত করিয়া দিবে ইহাতে আর আশ্চর্য্যের বিষয় কি ? ত্যাগ, নির্লিপ্ততা, সংযম ও পূর্ণতা যে ‘গীতাঞ্জলি’র উপাদান, তাহা জড়বিজ্ঞানের বহির্ভূত তপস্যালব্ধ সম্পদ।
এই সম্মাননা প্রবন্ধে আমরা আর একটি বিশেষ সংবাদ লাভ করি যে, ভারতের বড় লাটের সিমলা শৈলাবাসে রেভারেন্ড এন্ড্রুজ এক সাক্ষাত্কারে রবীন্দ্রনাথের কবিপ্রতিভা বিশ্লেষণ করে বলেছিলেন, ‘ষোড়শ শতাব্দীতে ইতালীর সাহিত্যে যেমন ইংলণ্ডে নবযুগ (রেনেসাঁ) প্রবর্ত্তন করিয়াছিল, তেমনি রবীন্দ্রনাথের “গীতাঞ্জলি”ও সম্ভবতঃ পাশ্চাত্য জাতির সম্মুখে ভাবরাজ্যের এক অভিনব পথ উন্মুক্ত করিয়া দিবে।’
প্রত্যুত্তরে বড় লাট রবীন্দ্রনাথকে ‘এশিয়ার রাজকবি’ (পোয়েট
লরেট অব এশিয়া) আখ্যা প্রদান করেন। এ প্রসঙ্গে ‘সৌরভ’ পত্রিকায় বলা হয়, ‘এই সকল প্রশংসা তোষামোদপ্রিয় স্তাবকের অত্যুক্তি নহে’ (সৌরভ, ভাদ্র ১৩২০)।
১৩১৮ সালে ঢাকা থেকে প্রকাশিত হয় একটি দ্বিভাষিক সাহিত্যপত্র। এই মাসিকপত্রের নাম ছিল ‘ঢাকা রিভিউ ও সম্মিলন’। ইংরেজি ও বাংলা ভাষার জন্য শিরোনাম হয় যথাক্রমে ‘ঢাকা রিভিউ’ এবং ‘সম্মিলন’। পত্রিকাটির সম্পাদক ছিলেন বিধুভূষণ গোস্বামী ও সত্যেন্দ্রনাথ ভদ্র। সত্যেন্দ্রনাথ ভদ্র ছিলেন জগন্নাথ কলেজের অধ্যাপক। রবীন্দ্রনাথের নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তির পর কার্তিক-অগ্রহায়ণ ১৩২০ সংখ্যায় ললিতমোহন চট্টোপাধ্যায়-রচিত একটি সুদীর্ঘ ও মনোজ্ঞ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটির মেধা ও পাণ্ডিত্য বিচারে অনুমান করি ললিতমোহন চট্টোপাধ্যায়ও জগন্নাথ জলেজের অধ্যাপক ছিলেন। ‘নোবেল পুরস্কার লাভ’ শিরোনামে এই প্রবন্ধের শুরুতে লেখক লিখেছেন—
আজ আমাদের বিশেষ আনন্দ ও গৌরবের দিন। আমাদের ঘরের কবি রবীন্দ্রনাথকে আজ পাশ্চাত্য সভ্যজগত আদর করিয়া কবিত্বের রাজটীকা পরাইয়া দিয়াছেন। যিনি আমাদের নিকট চির-পরিচিত ছিলেন, তিনি জগতের নিকট পরিচিত হইলেন।
প্রবন্ধকার এ প্রবন্ধে ইংরেজ কবি শেলী ও কিটসের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের সাদৃশ্য বিচার করেছেন। প্রসঙ্গক্রমে রবীন্দ্রকাব্য থেকেও কিছু উদ্ধৃতি তুলে ধরা হয়। আলোচনা শেষে তিনি বলেছেন, ‘রবীন্দ্রনাথের কবিতার সার-কথা এই যে, তিনি নিজের জীবনকে আনন্দময় ভগবানের লীলাক্ষেত্র করিতে চাহেন। বিশ্বের দেবতা কবির হূদয় মনের ভিতর দিয়া সমগ্র বিশ্বে যে আনন্দ, যে সৌন্দর্য্য, যে সঙ্গীত আছে তাহা উপভোগ করিতে চাহেন।’
প্রবন্ধ-লেখক ললিতমোহন আক্ষেপের সুরে বলেন, ‘আমাদের এতদিন জাতীয় কবি কেহ ছিলেন না।’ তবে, তাঁর মতে ‘রবীন্দ্রনাথই আমাদের প্রথম জাতীয় কবি।’
উপসংহারে লেখক বলেছেন, ‘কত শুদ্ধ আনন্দ, কত প্রেমের বেদনা, কত নব উত্তেজনা, কত আশা, কত মঙ্গল-কামনা কবির হূদয়ে উঠিতেছে, পড়িতেছে। ভবিষ্যত ক্ষণে ক্ষণে তাহার আবরণ অপসৃত করিয়া কবিকে সুদূরের ছবি দেখাইতেছে। সেইখানে পৃথিবীর সকল কবির সভা, যেখানে রবীন্দ্রনাথ আছেন।’
এ যেন রবীন্দ্রনাথকে ‘বিশ্বকবি’ আখ্যা প্রদানেরই শুভ সূচনা।
