অনেকেই ছবি আঁকেন, ভাবেন—শিল্পী নাসরীন বেগম তেমনই একজন বিরল শিল্পী, যিনি চিত্রকর্মের পরিসরে সততই দীপ্ত এবং জীবন্ত। তাঁর চিত্রকর্মের প্রদর্শনী শিল্পী-রসিকদের আলোড়িত করে—কারণ তিনি মাটির কথা বলেন। মাটির কাছাকাছি থাকা অন্ত্যজ মানুষের গল্প বলেন, বলেন ঝরাপাতার কাব্য, লতাগুল্মের ভালোবাসার, গল্প জলপিপির গল্প। বৃক্ষপত্রের জীবনচক্রের কান্নার ধ্বনি কবিতার আকারে চিত্রপটে সমন্বয় ঘটান। তাঁর ছবি দেখতে দেখতে রবীন্দ্রনাথের একটি কবিতার চরণ বারবার মনে পড়ে ‘যে আছে মাটির কাছাকাছি সেই কবির বাণীর লাগি কান পেতে আছি।’
দীর্ঘ আট বছর পর শিল্পী নাসরীন বেগমের একক চিত্রপ্রদর্শনী উপস্থাপন করল অ্যাথেনা গ্যালারি অব ফাইন আর্টস। প্রদর্শনী চলবে ১১ জুন ২০১৩ পর্যন্ত। আঠারো দিনব্যাপী এই প্রদর্শনীর শিরোনাম ‘বেয়ন্ড হিউম্যান ন্যাচার’। আট বছরের ব্যাবধানে শিল্পীর চিত্রভাবনায় এসেছে নানান বাঁক। অতীতের সিটিস্কেপ, ল্যান্ডস্কেপ, ক্যাকটাস সিরিজ থেকে সি গার্ল, হেরিটেজসহ অধুনা লিফ সিরিজও আছে। প্রদর্শিত শিল্পকর্মগুলো বেশিরভাগই অ্যাক্রিলিক রঙে আঁকা। শিল্পী প্রকৃতিকে দেখেছেন তাঁর নিজস্ব অন্তর্জগত্ দিয়ে। তিনি বলেন, ‘প্রকৃতির প্রেমে আপ্লুত থাকি। তাই প্রকৃতিই আমার ছবি আঁকার প্রেরণা। প্রকৃতির অফুরন্ত ভান্ডার থেকে অতি সামান্য কিছু বিষয় আমার ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে পেরেছি।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি প্রতিনিয়তই বিশ্ব প্রকৃতির যাবতীয় বিষয়াবলি ও মানুষের আচরণ, স্বভাব, অভ্যাস, অন্তর-বাহির ইত্যাদি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করি। এ থেকে অতি ক্ষুদ্র ফুলের রেণু, পানির ফোঁটা, ক্ষুদ্র পাতা, ঘাস, শামুক-ঝিনুক, পিঁপড়ারাও বাদ যায় না। আসলে ক্ষুদ্র বিষয়গুলোই বৃহত্ জগতের রহস্য উন্মোচন করে।’
শিল্পী নাসরীন বেগম প্রাচ্যকলার ছাত্রী ছিলেন। বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রাচ্যকলা বিভাগে অধ্যাপনা করছেন। তাঁর ছবির ঘরানাও বিশ শতকের গোড়ার দিকে কলকাতায় গড়ে ওঠা বেঙ্গল স্কুলের প্রাচ্যরীতি—যে রীতিতে আমরা দেখি চিত্রের কুশীলবদের রোমান্টিক ভাবালুতায় পর্যবসিত হতে, গল্পের নায়ক-নায়িকারা যেন কেউ রক্ত-মাংসের মানুষ নয়, যেন স্বর্গের সুরসুন্দরী—শিল্পী নাসরীন সেই অতি চেনা রীতিকে একেবারে একঘেয়ে করে ফেলেননি। তিনি সেই পৌরাণিক সুরসুন্দরী, কিন্নর-কিন্নরীদের মাটিতে টেনে আনেন। ধরাধামে সতত ব্যস্ত কর্মচঞ্চল নারীতে রূপান্তর ঘটান। তেমনি একটি ছবির উদাহরণ টানা যাক, লালমাটি এক ও দুই অ্যাক্রিলিকে আঁকা ছবিতে দেখা যায় দুই পাহাড়ি মেয়ে কলসিতে পানি ভরছে। ছবির ওপরে কুমড়ো ফুলের প্যাটার্ন। ছবির পশ্চাদ্পটে লাল রঙের আভা। গোধূলির আমেজ মুহূর্তেই লালপাহাড়ির দেশে টেনে নিয়ে যায়।
‘ফিলিং ব্লু ক্যাকটাস ১’ শীর্ষক ছবিতে দেখা যায়, ক্যাকটাস গাছের আদলে নারী, মাথার শীর্ষে ফুল ফুটছে। আসলে নারী ও প্রকৃতি সমার্থক—প্রতিকী এই চিত্রে তা-ই দেখা যায়। গায়ে তার কাঁটা, কাঁটার বিষে নীল তার গত্রবর্ণ, জীবন তার কণ্টকময়। কণ্টকময় জীবনের কৃচ্ছসাধানের পরও যে সন্তান জন্ম দেয়, এই অন্নময়ী শাকম্ভরীরা শস্যদানা উত্পাদন করছে অথচ সে-ই হচ্ছে উপেক্ষিত, লীন।
‘হেরিটেজ ১, ২’ শীর্ষক ছবিতে ক্ষয়িষ্ণু ঐতিহ্যের কথা বলেন শিল্পী। উনিশ শতকের জমিদারদের তৈরি করা ঘরবাড়ির চিত্র। চিত্রে দেখা যায় অর্ধবৃত্তাকার দরজা। দরজার কড়িকাঠ ভেঙে পড়ছে। ওপর থেকে চুন-সুড়কি খসে পড়ছে। কঙ্ককালসার দেয়ালে গজাচ্ছে লতাগুল্ম। এই ক্ষুধিত পাষাণ কেবল অতীতের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
‘আনরেভেল ১, ৩’ শীর্ষক ছবিটি—ওপর থেকে দেখা ল্যান্ডস্কেপের ছবি ঠিক যেমনটি মানচিত্রে দেখা যায়—তেমন। এর ওপর দিয়ে আঁকবাঁকা রেখা বয়ে যাচ্ছে, অর্থাত্ আমাদের দেশের ওপর দিয়ে রাজনৈতিক জটিলতার ঝড় বয়ে যাচ্ছে। আশাবাদী এই শিল্পী মনে করেন রাজনৈতিক জট খুলে গিয়ে সুবাতাস বইবেই।
ইম্প্র্রেশন চার, পাঁচ, ছয়, সাত শীর্ষক ছবিগুলোতে তিনি প্রাচ্যরীতিকে আধুনিক রূপে উপস্থাপন করেন। লেয়ারের পর লেয়ার দিয়ে পাতার নানান ইমেজ তৈরি করেন। বর্ণিল পাতার রূপ দর্শকদের মধ্যে আনন্দের অনুরণন তৈরি করে।
প্রদর্শিত ছবির উজ্জ্বল রঙের স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশ এবং অন্তর্গত চেতনার বিন্যাস ও বস্তুর সরল আকৃতি আমাদের মুগ্ধ করে। শিল্পী নাসরীন বেগম তাঁর নান্দনিক বোধ দিয়ে আমাদের ঐতিহ্যের সঙ্গে সমকালীন জীবনবোধের মেলবন্ধন ঘটান। শিল্প তখনই সার্থক—একটি পূর্ববর্তী পরম্পরা বা ঐতিহ্য থেকে আত্মস্থ করা সম্পদ, অন্যটি সমকালীন সমাজ ও বাস্তবতার পরস্ফূিটন। শিল্পী যথার্থই তা করতে পেরেছেন।
