নজরুল-অন্বেষণায় ভিন্ন দৃষ্টি

আপডেট : ০৬ জুন ২০১৩, ১৮:১১
নজরুল কেন নজরুল শান্তনু কায়সার জাতীয় সাহিত্য প্রকাশ প্রচ্ছদ :আবুল খায়ের প্রকাশকাল : ফেব্রুয়ারি ২০১৩ মূল্য :১৭০ টাকা। সাহিত্য আলোচনার গতানুগতিকতা এড়িয়ে কাজী নজরুলকে ভিন্নভাবে দেখার প্রয়াস পেয়েছেন নজরুল গবেষক ও অধ্যাপক শান্তনু কায়সার ‘নজরুল কেন নজরুল’ বইয়ে। ভিন্ন আঙ্গিক ও দৃষ্টিকোণে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্যশৈলী বিচার ও তাঁর জীবনানুষঙ্গ অন্বেষা কার্যত শ্রমসাধ্য। যেখানে বিদ্রোহী এ সাহিত্যযোদ্ধার জীবনী ও সাহিত্যকর্ম নিয়ে রয়েছে প্রচুর আলোচনাসম্ভার, সেখানে তাঁর রচনাকর্ম কিংবা জীবনের অনুল্লিখিত অধ্যায় স্বতন্ত্র দৃষ্টিকোণে বিশ্লেষণ অবশ্যই গবেষকের চিন্তার গভীরতা নির্দেশক। বইয়ে অন্তর্ভুক্ত ১৫টি নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধে এর সাক্ষ্য মেলে। ‘নজরুলকে বোঝার জন্য যেমন নজরুল সাহিত্য পড়া দরকার তেমনি নজরুল সাহিত্যের ভেতরে প্রবেশ করার জন্যও নজরুলকে অধ্যয়ন করা প্রয়োজন’—বইয়ের ফ্ল্যাপে লিখিত এ কথাটির সত্যতা পাওয়া যায় প্রবন্ধগুলো পাঠে। এখানে ‘পড়া’ অর্থে পাঠ করা এবং ‘অধ্যয়ন’ বলতে গবেষণার ওপর জোর দিয়েছেন তিনি। ‘কবিকে আবিষ্কারের অন্বেষণা থেকেই লেখা হয়েছে “নজরুল কেন নজরুল”। তাঁকে যারা ব্যবহার ও কুক্ষিগত করতে চায় তাদের হীন স্বার্থের বিরুদ্ধে এই বই’—গবেষকের চিন্তার এই দার্ঢ্য প্রত্যেকটি প্রবন্ধে ছড়িয়ে রয়েছে, যা গতানুগতিক আলোচনা এড়িয়ে স্বতন্ত্র মহিমায় বিকশিত। বইয়ের প্রবেশক প্রবন্ধ ‘নজরুল কেন নজরুল’-এ লেখক নজরুলের দূরদৃষ্টির পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করেছেন, সংযোজন করেছেন প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত। ভাষা প্রয়োগের ক্ষেত্রে নজরুলের দূরদৃষ্টি যেমন এ প্রবন্ধে উঠে এসেছে তেমনি উঠে এসেছে সামাজিক ও প্রান্তিক মানুষ নিয়ে নজরুলের ভাবনা। ‘বাংলা সাহিত্যে নজরুলের স্বাতন্ত্র্যকে বুঝতে হলে তাঁর দুই স্বঘোষিত অভিভাবকের কথিত প্রভাবকে তিনি কীভাবে এড়িয়ে গিয়েছেন তথা অস্বীকার করেছেন তা একটু বোঝা দরকার।’ এ ব্যাপারটিতে জোর দিয়েছেন প্রাবন্ধিক। নজরুলের ‘রচনাংশের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত উদ্ধৃতি দিয়ে’ সে সময়ে কারা জল ঘোলা করতে চেয়েছেন সে সম্পর্কেও বিশদ ব্যাখা মেলে এ প্রবন্ধে। ‘নজরুল ইসলাম কোনো ধর্মের শাস্ত্র নয়, তার সত্য তথা মর্মকে নিয়ে সাহিত্য রচনা করেছেন’ এবং এভাবেই নজরুল সকল দেশের ও সকল মানুষের, দেশ-সমাজ ও ধর্মের সঙ্কীর্ণতাকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছেন। বঙ্গীয় সারস্বত সমাজের পক্ষ থেকে জাতীয় সংবর্ধনা সভায় নজরুল বলেন, ‘পড়-পড় বাড়িটিকে কর্পোরেশনের যে কর্মচারী এসে ভেঙ্গে দেয়, অন্যায় তার নয়, অন্যায় তার যে ঐ পড়-পড় বাড়িটিকে পুষে রেখে দশজনের প্রাণনাশের ব্যবস্থা করে রাখে।’ নজরুলের বক্তব্যশ্লিষ্ট দূরদৃষ্টি প্রমাণে প্রাবন্ধিক সাভারে নয়তলা ভবন ধসে পড়ার সাম্প্রতিক ঘটনার উল্লেখ করেছেন। কিন্তু বইয়ে মুদ্রিত প্রকাশকালের (ফেব্রুয়ারি ২০১৩) সঙ্গে সাভারের মর্মান্তিক ঘটনার সময়কাল (২৪ এপ্রিল ২০১৩) নিয়ে সচেতন পাঠক বিভ্রান্ত হতে পারেন। বইটি প্রকাশের অনেক পরের ঘটনা বইয়ে সংযোজন নিয়ে প্রকাশকের আরও সচেতন হওয়ার দরকার ছিল। তবু এ ক্ষুদ্র বিভ্রান্তি সত্বেও ‘নজরুল কেন নজরুল’ কিংবা নজরুল কেন স্বতন্ত্র সে বিষয়টি বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে এ প্রবন্ধে। ‘নজরুল : আধুনিক ও সমকালীন প্রাসঙ্গিকতা’ প্রবন্ধে নজরুল সম্পর্কে জীবনানন্দ দাশের উদ্ধৃতি ব্যবহার করা হয়েছে। নজরুলের সমকালীন কবিরা নজরুলকে একজন পদ্যকার মনে করতেন। কেউ কেউ মনে করতেন ‘হুজুগে’। এসময় তাঁর সমসাময়িক কবিরা যখন রবীন্দ্রবলয় থেকে বেরিয়ে আসতে সচেষ্ট তখন নজরুল তাঁর আপন দর্শন ও স্বতন্ত্র কাব্য রচনা থেকে বিচ্যুত হননি। তিনি ‘কল্লোল’-এ লিখলেও অভিযোগ ছিল, তিনি আধুনিক নন। প্রাবন্ধিক বিশ্লেষণ করেছেন, ‘নজরুলের আধুনিকতা উদ্বাস্তু বা বাইরের কোনও বিষয় নয়, বরং তা তাঁর গভীর ও অন্তর্গত বিশ্বাসেরই অংশ।’ নজরুল কেন হুজুগে, সে ব্যাখ্যাও প্রাবন্ধিক তুলে ধরেছেন নজরুলের বয়ানে। ‘নজরুল কেন নজরুল’ বইয়ে সূচিভুক্ত ‘নজরুল সাহিত্যে নিম্নবর্গ’, ‘নজরুল :একবিংশ শতাব্দীর বাংলাদেশে’, ‘নজরুল বর্জিত নজরুল’, ‘ভাগ হয়না কো নজরুল’, ‘নজরুলের “কৈফিয়ত” ও আমাদের দায়’, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও নজরুল’, ‘নজরুল ব্যবসার দুর্বৃত্তায়ন’, ‘দৌলতপুর : নজরুল কাব্যের উত্সভূমি’, ‘নজরুলকে নিয়ে ভ্রান্তি ও ব্যবসা’, ‘নজরুলকে কীভাবে চাই’, ‘“বিদ্রোহী’’র নব্বই’, ‘নজরুল সাহিত্যের রাজনৈতিক দর্শন’ এবং ‘শওকত ওসমানের চোখে নজরুল’ প্রবন্ধে নজরুল সম্পর্কিত বিশদ ব্যাখ্যা তুলে ধরা হয়েছে। প্রবন্ধগুলোতে প্রাবন্ধিকের নিজস্ব বিশ্লেষণে সামগ্রিকভাবেই নজরুলকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখার চেষ্টা করা হয়েছে। সুচিন্তিত বাক্য বিন্যাস ও উপযুক্ত তথ্যের ভিত্তিতে লিখিত এ বইয়ের প্রশ্নশীল প্রবন্ধগুলো পাঠে জানা যায়— নজরুলজীবন ও নজরুল সাহিত্যের বিকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে তাঁকে কীভাবে খণ্ডিত করার অপচেষ্টা করা হয়েছে। ‘দুর্নীতি ও রাজনৈতিক দুর্বৃত্তায়ন’-এর বিরুদ্ধে আজীবন সংগ্রামী ছিলেন নজরুল। অথচ তিনি নিজেই দুর্বৃত্তায়নের শিকার হয়েছেন। রাজা-প্রজা কবিতায় নজরুল বলেছেন, ‘দেড়শত কোটি মানুষের ঘাড়ে চড়ে দেড়শত চোর’। বর্তমান দেশের প্রেক্ষাপটেও নজরুলের এ উক্তিটি প্রাসঙ্গিক। জাতীয় কবি নজরুলের জন্ম বা মৃত্যুবার্ষিকী ঘটা করে পালন করা হয় একথা সত্য। কিন্তু এসব ফাঁপা অনুষ্ঠানে কীভাবে নজরুলের দর্শন বর্জন করা হয় সে সম্পর্কে প্রাবন্ধিক যুক্তিযুক্ত ব্যাখ্যা দিয়েছেন ‘নজরুল বর্জিত নজরুল’ প্রবন্ধে। নজরুলের রাজনৈতিক দর্শনের মূলে রয়েছে শোষণ ও অপশাসনের বিরুদ্ধে সোচ্চার মতবাদ। তত্কালীন সাহিত্যবোদ্ধা ও সাহিত্যিক মহলে নজরুলের আধুনিকমনস্কতা নিয়ে যেমন প্রশ্ন উত্থাপিত হয়েছিল তেমনি একাধারে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা ও কবিতার দোর্দণ্ড প্রতাপের বিষয়টিও ছিল আলোচনার শীর্ষে। নিম্নবর্গ চিহ্নিত করে নজরুলকে কীভাবে সমকালে খাটো করা হয়েছিল এবং নিম্নবর্গ সম্পর্কে নজরুলের সাহিত্যিক দর্শন তাঁর রচনা থেকেই উদ্ধৃতি সহযোগে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে ‘নজরুল সাহিত্যে নিম্নবর্গ’ প্রবন্ধে। বইয়ের অন্যান্য প্রবন্ধে নজরুল সাহিত্যের গুরুত্ব এবং নজরুল কেন খণ্ডিত হওয়ার বিষয় নয়, তা প্রাবন্ধিক নিজস্ব যুক্তিশৈলীতে সুনিপুণভাবে তুলে ধরেছেন। নজরুল নিজেই বলেছিলেন, ‘যে কুলে, যে সমাজে, যে ধর্মে, যে দেশেই জন্মগ্রহণ করি, সে আমার দৈব। আমি তাঁকে ছাড়িয়ে উঠতে পেরেছি বলেই কবি।’ নজরুলের এ মহান উক্তির মধ্য দিয়েই প্রমাণিত হয় তাঁর চেতনার পরিধি। কালক্রমে কীভাবে নজরুল সাহিত্যের আদর্শ বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী ছাড়িয়ে বিশ্বসাহিত্যেও ব্যাপৃত হয়েছে, ব্যাখ্যা করা হয়েছে সেটিও। পরিশেষে বলা যায়, বইয়ে অন্তর্ভুক্ত ১৫টি প্রবন্ধই সুলিখিত, তথ্যসমৃদ্ধ এবং প্রাবন্ধিকের গবেষণার সুফসল। বইটি যেমন নজরুল জিজ্ঞাস্য পাঠকের তৃষ্ণা মেটাতে সক্ষম তেমনি তরুণ প্রজন্মের নজরুল গবেষকদের জন্যও বইটি একটি আকরগ্রন্থ। প্রশ্নশীল গদ্যশৈলী ও ভিন্ন দৃষ্টিতে নজরুল অন্বেষণার কারণে ‘নজরুল কেন নজরুল’ বইটি নজরুল আলোচনাসম্ভারে বিশিষ্টতা নিয়ে হাজির থাকবে এ প্রত্যাশা করা যায়। বইটির বহুল প্রচার আশা করছি।