মানবশরীরের কষ্টচর্চিত গদ্য

আপডেট : ০৬ জুন ২০১৩, ১৮:১১
মানুষই এই বাসভূমে সবচেয়ে বোধসম্পন্ন প্রাণী। পৃথিবীর নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাতে। আবার কোথায় যেন মানুষের হাতে কিছুই নেই। কোনো রকম শতছিন্ন বস্ত্রের আচ্ছাদন দিয়ে ঢেকে রাখে বেয়াড়া শরীর। জীবনধ্যানে মগ্ন বাউলিয়ানা, সুফিয়ানা মুটে, মজুর, কৃষক তার দগদগে ঘা সেরে না উঠতেই আরেক কালিমা লেপে পথ চলতে থাকে। মাঈনউদ্দীনের শিল্পের ভাষায় মানুষের অবয়ব বারবার দেখা যায়। কথা বলতে থাকেন উঁচু-নিচু সব তলার মানুষের সাথে। সহজিয়া রূপ বর্ণনা করেন কালি, কলম, কয়লা আর কালো-সাদা রঙের আঁচড়ে। আধুনিক শিল্পকলায় মানব শরীরের ভঙ্গি রচনায় রেমব্রান্ড, গোইয়া, গঁগ্যা, সেজান অনেক বেশি সংখ্যক ছবি উপহার দিয়েছেন। পিকাসো মানুষকে নিয়ে জ্যামিতি গড়েন। জ্যামিতির আচ্ছাদনে মানব শরীরে দ্রোহ তৈরি হয়। এই উপমহাদেশে অবয়বধর্মী বা ফিগারেটিভ শিল্পভাষা দরবারি আমলে চর্চিত হয়েছে। এই ধারাবাহিকতায় আমরা পেয়েছি গুরু জয়নুল, কামরুল, সুলতান, সফিউদ্দিন হয়ে কাইয়ূম চৌধুরী, রফিকুন নবী, হাশেম খান, মুর্তজা বশীর, শাহাবুদ্দিন, নাজলী, ঢালী আল মামুন, শিশির ভট্টাচার্য্য, নিসার হোসেন, জামাল আহমেদ, মোহাম্মদ ইকবালকে। এরপর শূন্যের দশকে অবয়বধর্মী চর্চায় হাল ধরেন মাঈনউদ্দীন। শিল্পকলার ছাত্রত্ব শেষ না করেও মনোযোগ হারাননি বাস্তব রং-রেখার প্রয়োগে। তারুণ্যের মাঝে বিপ্লব প্রোথিত থাকে। আধুনিকতা বপন হয়ে যায় শিরায় শিরায়। মোড়কে আবৃত সমাজতান্ত্রিক আবরণে কখনো উত্তাল হয়ে যায় তারুণ্য। সামন্তপ্রথাকেই মেনে চলে একসময়। চে, মার্কস, মাও, লেনিনের পুঁজিবাদের বিপক্ষের লড়াই তারুণ্য ধারণ করে না। সাম্রাজ্যবাদী আস্তরণ স্তিমিত করে দেয় দ্রোহ আর যন্ত্রণাকে। আমরা ভুলে যাই সমাজ লৌহ গরাদ বেষ্টনীর ভেতরে থাকা অভিজাত মৌজ-মজমায়। মাঈনউদ্দীন হাইকোর্টের মাজারে যান, চলে যান লুই আই কানের সংসদ ভবনের কাছে, তারপর কার্জন হল, দৃষ্টিনন্দন আরও কিছু ভবনের দরজায়। এখানে তাঁর ক্যানভাস তৈরি হয় অসংখ্য কালিঝুলিমাখা মানবশরীর নিয়ে। বৃদ্ধ মানুষের মাথায় হাত। বাউল আর বাউলিয়ানায় সঙ্গ দেওয়া মানুষ দোতরায় সুর তোলে। ডিজিটাল ব্যানার মুড়িয়ে উদ্ধত যৌবন ঢেকে রাখে যুবতী। বড় স্ক্রলের পরিধি ১৭৯৮ গুণন ২৪৩ সেন্টিমিটার। পেইন্টিং না বলে এটিকে এককথায় বাংলার লোকশিল্পের পটচিত্রের করণ-কৌশল বলা চলে। মেঘলা আকাশের দিকে চেয়ে থাকা শিশুগুলো বাস করে সুরম্য অট্টালিকার বারান্দায়। সংবাদপত্রের হরফ হুবহু ছবির জমিনে জুড়ে দিয়ে কালো কালিতে সংবাদ মুছে দেন। সত্যিই কি আমাদের জন্যে কোনো শুভ সংবাদ প্রত্যুষে দরজার নিচ বেয়ে ফিরে আসে? বাংলার এই রূপ মাঈনউদ্দীন চারকোলের গতির সাথে তুলে ধরেন। গুরু জয়নুলের দুর্ভিক্ষের চিত্রমালায় এক টান টান অনুভূতি তৈরি হয়েছিল। সেসব মাঈনউদ্দীন স্মরণ করেন। গত শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে এই শতকের শুরুর দশকে আবার অবয়বধর্মী চিত্রনির্মাণে শিল্পীমন জেগে ওঠে। দারিদ্র্যপীড়িত মানুষের রূপের খোঁজে মাঈনউদ্দীন ছুটে যান পথ থেকে প্রান্তরে। কারণ, এ বঙ্গে শুধু ঝকঝকে গাড়ির সারি আর বন্ধকরা ডার্ক গ্লাসের ভেতর উঁকি দেওয়া দু-চোখই শুধু বাংলাদেশ নয়। ছাপ্পান্ন হাজার বর্গমাইলের সহস চোখ, যারা চেয়ে থাকে আকাশের দিকে। ঘাম ঝরিয়ে এগিয়ে চলে জীবনের খোঁজে, তাদের দেহভঙ্গির ভাষা শিল্পী অবিরাম তুলে ধরেন। এটাই বাংলাদেশ। মাঈনউদ্দীনের রং-রেখা বিদীর্ণ করুক আমাদের আয়েশি খিড়কির কপাট। গত ৩১ মে ঢাকা আর্ট সেন্টারে শুরু হওয়া ‘নিরবধি জনসে াত’ শিরোনামের প্রদর্শনী শেষ হবে আগামী ১২ জুন।