কবিতাকে অভিশাপ দিয়ে লাভ নেই। কেননা কবিতা কিছুই দেয় না, বরং জীবন থেকে কেড়ে নেয় অনেক কিছু। কবিতায় মথিত হতে হতে কবি জীবন-যৌবনের স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষা থেকে ছিটকে পড়েন। সারাক্ষণ বাস করেন অন্য এক জগতে। কবিতার জন্য এ ত্যাগ একজন কবিকে মেনে নিতেই হয়। এ কারণে দায়-দেনার হিসাব চলে না কবিতার সঙ্গে। যদি কোনোভাবে একটি উত্তম কবিতা লেখা হয়ে যায়, তা বরং আনন্দের।
কিন্তু কী করে বুঝব কবিতাটি উত্তম? এ রহস্যময় প্রশ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে উত্তর খোঁজার ব্যর্থ চেষ্টা করি। অসংখ্য কবিতাই তো লেখা হয়ে ছাপা হয়ে ঝরে যায়, সংখ্যাহীন কবিতাগ্রন্থ প্রকাশিত হয়ে পাঁচ-দশ জনের হাত ঘুরে হারিয়েও যায়। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে, সময় থেকে সময়ে, স্বদেশ-স্বকালে প্রবাহিত হতে পারে না অনেকের কবিতা। কেন এ রকম হয়? তবে কি শেষপর্যন্ত ব্যর্থ হয়ে যায় জীবন-জগতের সঙ্গে সম্পর্কহীন অদ্ভুত ও উদ্ভট ফ্যান্টাসির সৃষ্টি-প্রয়াস?
আমার কাছে এরও সঠিক উত্তর জানা নেই। তবুও মনে হয়, জীবনকে উপেক্ষা করে, স্পর্শ ও স্পন্দনকে ব্যাহত করে কবিতার মুখোমুখি হওয়া সম্ভব নয়। জীবনকে ছুঁয়ে-ছেনেই হদিস করতে হয় কবিতার। একজন কবির কাজ এ ক্ষেত্রে কঠিন ও রোমাঞ্চকর। কবিকে সেই রোমাঞ্চকর জগতে বাস করতে হয় প্রতিদিনই।
আধুনিকতা-উত্তরাধুনিকতার নামে নানা ইজম-ফিজমের ফাঁদে পা দিয়ে, নিরীক্ষার নামে উত্কট নাড়িছেঁড়ার মধ্য দিয়ে জটিল থেকে জটিলতর হয়ে উঠেছে বিশ্বকবিতা। বাংলা কবিতাও তার ব্যতিক্রম নয়। কবিতা চারদিকের জটিলতা কিংবা সরলতা নিয়ে এগিয়ে চলেছে পাগলপারা হয়ে। স্রোতধারা যখন এগিয়ে যায়, তখন কখনো ঘোলা স্রোত কখনো নির্মল ধারা এতে সংযুক্ত হতে পারে। সব পানীয় পানযোগ্য নয়, অপ্রয়োজনীয়ও নয়।
আমার কাছে কবিতা উজানে চলার নিত্যসঙ্গী, ভালোবাসার তরী। স্রোতের বিপরীতে যাঁরা সাঁতার কাটেন, চলতে ভালোবাসেন, তাঁরা জানেন উজানে চলতে গেলে শিরা-উপশিরা, হাড়-মজ্জাসহ সমস্ত দেহমনে শক্তি লাগে খুব। একবার চলা শুরু করলে তাঁরা সবদিকেই সাঁতরাতে পারেন। কিন্তু যিনি গা ভাসিয়ে থাকতে চান স্রোতের সাম্পানে, তাঁদের সেই মনোদৈহিক জোর নেই। একজন প্রকৃত কবিকে উজানে চলার জন্য সাধনা করতে হয়। কবিতার জন্য এই সাধনা বড় আনন্দের, বেদনারও।
