রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর দুরবস্থা কাটছেই না। শিল্প ও সেবা খাতের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোয় সরকারের ভর্তুকি যেমন বাড়ছে, তেমনি পাল্লা দিয়ে বাড়ছে প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাংক ঋণের পরিমাণ। ক্রমাগত লোকসানের মুখে প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিচালন ব্যয়ও বাড়ছে। এসব প্রতিষ্ঠানকে লাভজনক করতে কোন ফর্মুলাই কাজে আসছে না। চলতি অর্থবছরে (২০১২-২০১৩) সরকারের নিয়ন্ত্রণাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোকে এক হাজার ৩৮১ কোটি ৮৩ লাখ টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়েছে। আগের অর্থবছরে তা ছিলো এক হাজার ৩১৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকা।
রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো শুধু ভর্তুকির অর্থ দিয়েই চলছে না, দেশের ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর এসব প্রতিষ্ঠান চাপ সৃষ্টি করছে। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো থেকে বিপুল অংকের ঋণ চলে যাচ্ছে এসব প্রতিষ্ঠানের অনুকূলে। সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, ২২টি রাষ্ট্রীয় সংস্থার কাছে রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ৩৭ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বকেয়া ঋণ রয়েছে।
মূলত: বিপুল অংকের লোকসান থেকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাঁচিয়ে রাখার লক্ষ্যে সরকার রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোতে ভর্তুকির পাশাপাশি ঋণ সরবরাহ করছে। সবশেষ হিসেবে দেখা যায় ২০১২-১৩ অর্থবছরের ২২ এপ্রিল পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো ৭ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে। ২০১১-১২ অর্থবছরে এ প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান ছিলো ৯ হাজার ৪১৪ কোটি টাকা।
তবে ভর্তুকি, ঋণ এবং লোকসান এ তিনটি সূচক ক্রমাগত বাড়তে থাকলেও প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের কোষাগারে যত্সামান্য মুনাফা জমা দিয়ে থাকে। ২০১২-২০১৩ অর্থবছরে ২২ এপ্রিল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারকে মাত্র ৯৬১ কোটি টাকা মুনাফা দেবে বলে প্রাক্কলন করা হয়েছে।
অনুদান অথবা ভর্তুকির নামে সবচেয়ে বেশি অর্থ ব্যয় হয়েছে বাংলাদেশ পানি উন্নয়ন বোর্ডে। এর পরিমাণ চলতি অর্থবছরে ৬৫২ কোটি টাকা। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনকে ২৯২ কোটি টাকা, বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষকে ১২৭ কোটি টাকা, বিসিককে ৬৪ কোটি টাকা, মুক্তিযোদ্ধা কল্যাণ ট্রাস্টকে ৭৫ কোটি ৬৫ লাখ টাকা, বাংলাদেশ পাটকল কর্পোরেশনকে ১৫৩ কোটি টাকা ভর্তুকি দেয়া হয়েছে।
চলতি অর্থবছরের মার্চ মাস পর্যন্ত রাষ্ট্রায়ত্ত বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলো সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে ৩৭ হাজার ১৯০ কোটি টাকার বকেয়া ঋণ পাবে। যেসব প্রতিষ্ঠান সেসব ঋণ ভোগ করছে তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে—বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন-প্রায় ২০ হাজার কোটি, পানি উন্নয়ন বোর্ড-৪ হাজার ৮১২ কোটি, বিসিআইসি-৩ হাজার ৯১০ কোটি, কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশন-১ হাজার ৭৪৪ কোটি টাকা উল্লেখযোগ্য।
এদিকে, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলো চলতি অর্থবছরের ২২ এপ্রিল পর্যন্ত মোট লোকসান দিয়েছে ৭ হাজার ৩৮৬ কোটি টাকা। কিছু প্রতিষ্ঠান মুনাফা করলেও বিদ্যুত্ উন্নয়ন বোর্ডের ৫ হাজার ৭৫০ কোটি এবং বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশনের ৬ হাজার ৯৪১ কোটি টাকা লোকসানের জন্য ওই মুনাফা ম্লান হয়েছে।
এদিকে সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো মুনাফা হিসেবে সরকারের কোষাগারে কিছু অর্থ জমাও করে। চলতি অর্থবছরের ২২ এপ্রিল পর্যন্ত কিছু প্রতিষ্ঠান মুনাফা হিসেবে সরকারের কোষাগারে ৯৬১ কোটি টাকা জমা দিয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ তৈল, গ্যাস ও খনিজ সম্পদ কর্পোরেশন একাই জমা দেবে ৮০০ কোটি টাকা।
