বিশাল ব্যয় :করভারে চমকাবে জনগণ

আপডেট : ০৬ জুন ২০১৩, ২২:৪১
কোন রকম চমক ছাড়াই বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে পেশ হলো মহাজোট সরকারের শেষ বাজেট। কেউ কেউ এটিকে নির্বাচনী বাজেট কিংবা নির্বাচনের আগে জনতুষ্টির বাজেট বলতে চাইবেন। কিন্তু বাস্তবে গতানুগতিক একটি বাজেট দিয়ে অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত সময়টা অতিক্রম করলেন মাত্র। নির্বাচনের আগে যদিও বিভিন্ন রকম প্রকল্প নেয়া হয়ে থাকে, ছাড় দেয়া হয় শুল্ক কাঠামোতেও। এবারে তিনি এরকম কিছু যে করেননি, তা বলা যাবে না। তবে বৃহত্ অর্থে দায়সারা একটি বাজেট দিয়ে তিনি কোনমতে তার সরকারের মেয়াদকাল শেষের অপেক্ষায় আছেন এমনটিই বলা বোধ হয় শ্রেয়। বরং বাজেট বক্তৃতায় অর্থমন্ত্রী যে রসাস্বাদনের লোভ দেখিয়েছেন জনগণকে, সেটিও ফলপ্রসূ হবে না। খোলামেলা বলতে গেলে, নতুন বাজেটটি বাস্তবায়নের দায় নিয়ে সংশয়-সন্দেহ এখনো কাটিয়ে ওঠা যায়নি। নির্বাচন আসন্ন, তাই মধ্যখানে যে প্রকারেরই হোক, একটি সরকার থাকবে। নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব নিয়ে এই বাজেটের বিভিন্ন লক্ষ্য কাটছাঁটও করতে পারে। সবচেয়ে বড় কথা, অনিশ্চয়তা যদি দীর্ঘ হয় তবে অর্থমন্ত্রী যত যাই বলুন না কেন, বাজেট বাস্তবায়নযোগ্য হবে না। সে কারণেই হয়তো একটি ‘পরাবাস্তব’ বাজেট জাতির সামনে উপস্থাপন করলেন তিনি। রাজনৈতিক বাস্তবতার কাছে অর্থনৈতিক যৌক্তিকতা বিগত সময়েও পরাভূত হয়েছে। প্রস্তাবিত বাজেটের বিভিন্ন লক্ষ্য ও প্রকল্প দেখলে তা স্পষ্ট হয়। সমাপ্তির জন্য চিহ্নিত প্রকল্পগুলোতে যথেষ্ট অর্থবরাদ্দের চিত্র প্রতিফলিত হয়নি। রাজনৈতিক সরকারের এজেন্ডায় নির্বাচন সবিশেষ খেয়ালে থাকে। সে চিন্তা থেকে পুরোপুরি বেরিয়ে আসতে পারেননি অর্থমন্ত্রী। একদিকে নির্বাচন, অন্যদিকে বিশাল ব্যয়ের অর্থ সংস্থানের চ্যালেঞ্জ। দুটোকেই সমান গুরুত্ব দিতে গিয়ে এমন লক্ষ্যগুলো স্থির করা হয়েছে, যা বাস্তবতাবিবর্জিত এবং বাস্তবায়ন অযোগ্য। বলা যায়, অর্থমন্ত্রী তার বাজেট বক্তৃতায় নির্বাচনী আমেজটা ধরে রাখার চেষ্টা করেছেন। বিভিন্ন গোষ্ঠীকে কিছু সুবিধা প্রদানে সযত্নে খেয়াল রেখেছেন তিনি। এরমধ্যে সরকারি বেতনকাঠামোও উল্লেখযোগ্য। আর তা করতে গিয়ে বেড়ে গেছে বাজেটের আকার ও লম্বা হয়েছে ব্যয়ের ফর্দ। তিনি ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬২১ কোটি টাকা অনুন্নয়ন বাজেট বরাদ্দ রেখেছেন যেখানে উন্নয়ন বরাদ্দ মাত্র ৬৫ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। এই দুটি অংকই কিন্তু ব্যয়ের জন্য। উন্নয়ন ব্যয় বিনিয়োগ হলেও অনুন্নয়ন ব্যয়ের মতই মোট ব্যয়ের হিসাবেই তা চলে আসে। প্রকারান্তরে তিনি মোট রাজস্ব আদায় করবেন বলে স্থির করেছেন ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। এরমধ্যে রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর আদায় করে দেবে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯০ কোটি টাকা। কিন্তু প্রাক্কলন করতে গিয়েই এনবিআর আপত্তি দিয়েছিল যে এই লক্ষ্যমাত্রা বাস্তবসম্মত নয়। তাহলে অর্থমন্ত্রী যে লক্ষ্য স্থির করেছেন এবং তা যে সংস্থা বাস্তবায়ন করবেন- উভয়ের মধ্যে মতদ্বৈততা রয়েছে। এ অবস্থায় আগামী বছরে যে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও কম রাজস্ব আদায় হবে- তাই সঠিক। কেননা, তিনটি সরকারের দায়িত্বে আর্থিক নীতির বাস্তবায়নের চেয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক ইস্যুগুলোই বেশি গুরুত্ব পাবে। আবার এও ঠিক যে, দৈনন্দিন ব্যয় নির্বাহে অর্থ সংস্থানের জন্য আয় বাড়াতে হবে। রাজস্ব ও বৈদেশিক উত্স থেকে আয় না বাড়লে ব্যাংক ঋণনির্ভরতা কাটিয়ে ওঠা যাবে না। বৈদেশিক উত্স থেকে আয় অর্থাত্ রফতানি, ঋণ ও অনুদান মিলিয়ে যে অর্থ ধরা হয়েছে তা পাওয়া যাবে না। রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে ইমেজ সংকট সৃষ্টি হয়েছে। ঋণ-অনুদানের ক্ষেত্রেও কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জিত না হওয়াই স্বাভাবিক। অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতায় সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর কথা বলেছেন। পদ্মা সেতুর জন্য বাড়তি ৬ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছেন। বছর বছর বরাদ্দ দিয়ে পদ্মা সেতু করা সম্ভব হবে কি না, জাতির সামনে তা বড় প্রশ্ন। যেখানে অর্থমন্ত্রীর হাতে আছে ভারতের দেয়া মাত্র ২০ কোটি ডলার। নির্বাচনকে সামনে রেখে পদ্মা ইস্যুটি বাজেটে স্থান পেয়েছে সেটাই বলা সমীচীন হতে পারে। সামগ্রিকভাবে অর্থসংস্থানের যে চিত্র তিনি তুলে ধরেছেন, সেই প্রক্ষেপণ কার্যত: কোন ফল দেবে না। বিদেশি সাহায্যে ভাটার মধ্যে অভ্যন্তরীণ উত্স থেকেই আয় বাড়াতে হবে। সে কারণেই তিনি ব্যাপকভাবে পরোক্ষ কর নির্ভর হয়ে পড়েছেন। জেলা-উপজেলা পর্যায়েও তিনি এমনভাবে পরোক্ষ করারোপ করেছেন, যা করতে গিয়ে জনগণকে ভোগান্তিই পোহাতে হবে। রাজস্ব কর্মকর্তাদের ওপর আয় বৃদ্ধির চাপ থাকবে। তা করতে গিয়ে হয়রানি বাড়বে করদাতাদের। নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনৈতিক অনিশ্চয়তায় এটি সহজেই অনুমেয় যে, যেখানে মোট জাতীয় উত্পাদনের ওপর রাজস্ব নির্ভর করে, সেখানে উত্পাদন আশানুরূপ না হলে রাজস্ব আয় বাড়বে কিভাবে? আগামী বছরের বাজেটের আরেকটি বড় দুর্বলতা হচ্ছে- বড় আকারের বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ বাড়বে। এই ঘাটতি অর্থায়ন মেটাতে শেষ পর্যন্ত ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে সরকার ঋণ নেবে। তাতে মূল্যস্ফীতি বাড়বে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ সংকুচিত করা হবে। বেড়ে যাবে সুদের হার। আর বেসরকারি বিনিয়োগ যদি না হয় তাহলে জাতীয় প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জিত হবে কিভাবে? অর্থনৈতিক অগ্রগতি নিয়ে যে আশার বাণী শুনিয়েছেন অর্থমন্ত্রী এবং উচ্চাভিলাষী আয় ও ব্যয়ের লক্ষ্যকে জায়েজ করতে চেয়েছেন, তার জন্য দরকার বিপুল অংকের বিনিয়োগ। কিন্তু সেটি কিভাবে করবেন অর্থমন্ত্রী? তার বাজেটে বিনিয়োগের জন্য অর্থসংস্থানের চ্যালেঞ্জ রয়েই গেল। আর বিনিয়োগ না হলে আয় যেমন বাড়বে না, তেমনি প্রবৃদ্ধির চাকাও ঘুরবে না। চলতি অর্থবছরে ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য স্থির করলেও প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ২ শতাংশ। লক্ষ্যণীয় যে, চলতি বছরজুড়ে দেশের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল বিনিয়োগ স্তিমিত হয়ে শিল্প উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হওয়া। গ্যাস-বিদ্যুতের তীব্র সঙ্কট, রাজনৈতিক অস্থিরতা, উচ্চ সুদের হার এবং অবকাঠামোগত দুর্বলতার কারণে বিনিয়োগ এতটাই কমেছে যে অর্থমন্ত্রী নিজেও হতাশা ব্যক্ত করেছেন। এদিকে বিনিয়োগ মন্দার কারণে কর্মসংস্থানের উপর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। প্রভাব পড়েছে কাঙ্ক্ষিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে। এ অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার সুনির্দিষ্ট কোন নির্দেশনা অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতায় নেই বরং তিনি মূল্যস্ফীতির হার ৭ শতাংশ নির্ধারণ করেছেন। ঘাটতি মেটাতে ব্যাংক ঋণ নির্ভরতা যখন বাড়বে, তখন মূল্যস্ফীতির এই হার ধরে রাখা সম্ভব হবে না। নতুন বছরের প্রস্তাবিত বাজেটে অর্থমন্ত্রীর জেলা বাজেটটিই নতুন। বারবার ঘোষণা দেয়ার পরও এতদিন করতে পারেননি জেলা বাজেট। শেষ পর্যন্ত মেয়াদের শেষ বছরে এসে পাইলট প্রকল্প হিসাবে টাঙ্গাইল জেলার জন্য জেলা বাজেটের কথা বলেছেন অর্থমন্ত্রী। শেষতক সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) হাল হয় কি না জেলা বাজেটের, তাই দেখার বিষয়। এদিকে শুল্ককাঠামোতে পরিবর্তন, কিছু খাতে কর অবকাশ সুবিধা দিলেও অনেক পণ্যে আমদানি শুল্ক বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে আমদানি শুল্কহার ৩ শতাংশের স্থলে ২ শতাংশ করা হয়েছে যা ইতিবাচক। কিন্তু অর্থসংকট গোছাতে না পারলে বিনিয়োগ হবে না এবং এর সুফল পাওয়া যাবে না। বিনিয়োগ না হলে মানুষের কর্মসংস্থান হবে না। আয় না বাড়লে জীবনযাপন দুরূহ হয়ে পড়বে। কিন্তু ব্যাপক হারে মূল্যসংযোজন কর বা ভ্যাট আদায়ে যে কঠোর মনোভাব রয়েছে অর্থমন্ত্রীর, তাতে পরোক্ষ করের ভারে জনগণের ত্রাহি দশা হবে। পণ্য ও সেবার বিনিময়ে গুণতে হবে বেশি অর্থ যা সাধারণের জন্য ভোগান্তির নামান্তর।