২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার বাজেট

আপডেট : ০৬ জুন ২০১৩, ২২:৪১
পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার লক্ষ্য সামনে রেখে আগামী ২০১৩-১৪ অর্থ বছরের বাজেট গতকাল বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে পেশ করেছেন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত। আয় ও ব্যয়ের ক্ষেত্রে উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নিয়ে তিনি মোট ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকার বাজেট উত্থাপন করেছেন। এই বাজেটে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হচ্ছে প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা। উচ্চ পরিমাণের এই রাজস্ব আদায়ের ক্ষেত্রে কর হার বাড়ানোর চেয়ে করের আওতা বাড়ানোর ব্যাপারেই নজর থাকবে বেশি। তবে কিছু কিছু ক্ষেত্রে করহারও বাড়ানো হবে। উন্নয়ন ও অনুন্নয়ন ব্যয়: নতুন বাজেটে এডিপির আকার নির্ধারণ করা হচ্ছে ৬৫ হাজার ৮৭০ কোটি টাকা। আর অনুন্নয়ন খাতের ব্যয় ধরা হচ্ছে ১ লাখ ৫৬ হাজার ৬২১ কোটি টাকা। উন্নয়ন ব্যয়ের মধ্যে পদ্মা সেতুতে বরাদ্দ ধরা হয়েছে ৬ হাজার ৮৫২ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা: জানা গেছে, সরকার আগামী অর্থ বছরে মোট ১ লাখ ৬৭ হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা রাজস্ব আদায়ের পরিকল্পনা করছে। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) আদায় করবে ১ লাখ ৩৬ হাজার ৯০ কোটি টাকা। এদিকে খোদ এনবিআর চেয়ারম্যান রাজস্ব আদায় লক্ষ্যমাত্রা ১ লাখ ২৫ হাজার কোটি টাকায় সীমাবদ্ধ রাখতে অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ করেছেন। একই অনুরোধ ছিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়েও। বিভিন্ন সময় এনবিআর চেয়ারম্যান প্রকাশ্যেই নিজের অপারগতার কথা জানিয়েছেন। বলেছেন, এই লক্ষ্যমাত্রা হবে অবাস্তব। এনবিআর বহির্ভূত খাত থেকে কর প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫ হাজার ১২৯ কোটি টাকা। কর বহির্ভূত খাত থেকে রাজস্ব প্রাক্কলন করা হয়েছে ২৬ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। ঘাটতি: আগামী বাজেটে ঘাটতি প্রাক্কলন করা হয়েছে ৫৫ হাজার ৩২ কোটি টাকা। যা মোট দেশজ আয়ের (জিডিপি) ৪ দশমিক ৬ শতাংশ। এ ঘাটতি পূরণে অভ্যন্তরীণ খাত থেকে ঋণ ধরা হচ্ছে ৩৩ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকা। আর বৈদেশিক খাত থেকে সংগ্রহ করা হবে ২১ হাজার ৬৮ কোটি টাকা। অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ঋণ করা হবে ২৫ হাজার ৯৯৩ কোটি টাকা। আর সঞ্চয়পত্র ও অন্যান্য খাত থেকে নেয়া হবে ৭ হাজার ৯৭১ কোটি টাকা। এদিকে প্রাক্কলন অনুযায়ী রাজস্ব আয় যদি না হয় সেক্ষেত্রে ঘাটতি আরও বেড়ে বাজেট বাস্তবায়নের চাপ বড় হয়ে উঠতে পারে। বেড়ে যেতে পারে সরকারের ঋণ গ্রহণ প্রবণতা। করমুক্ত আয়ের সীমা : বর্তমানে ব্যক্তিশ্রেণীর করমুক্ত আয়ের সীমা বার্ষিক ২ লাখ টাকা। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে নতুন বাজেটে ব্যক্তিশ্রেণী করমুক্ত আয়সীমা বর্তমানের ২ লাখ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২ লাখ ২০ হাজার টাকায় উন্নীত করার প্রস্তাব থাকছে। এটি আরো বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। একই সঙ্গে নারী, বয়স্ক ও প্রতিবন্ধীদের জন্য বার্ষিক করমুক্ত আয়সীমাও বাড়ছে। বর্তমানে সাধারণ মানুষের জন্য ন্যূনতম আয়করের পরিমাণ বছরে ৩ হাজার টাকা। শহরবাসীর জন্য এটি না কমলেও জেলা পর্যায়ে করদাতাদের ক্ষেত্রে তা ২ হাজার টাকা এবং উপজেলায় ন্যূনতম ১ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হতে পারে। শেয়ারবাজারে প্রণোদনা: ব্যক্তি শ্রেণীর করদাতার শেয়ার লেনদেন হতে অর্জিত আয় করমুক্ত রাখার বিদ্যমান সুবিধা অব্যাহত রাখার পাশাপাশি কিছু প্রণোদনা দেয়ার প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। কোম্পানির প্রিমিয়ামের (শেয়ারের অভিহিত মূল্যের অতিরিক্ত যে মূল্য কোম্পানি নেয়) উপর ৩ শতাংশ আয়কর প্রত্যাহারের বিদ্যমান বিধান রহিত করার প্রস্তাব করা হয়। এছাড়া বন্ড বিক্রির সময় মোট বিক্রয়মূল্যের উপর বিদ্যমান ০.০৫ শতাংশ উেস কর বিলোপ এবং সরকারির পাশাপাশি বেসরকারি মিউচুয়ালফান্ডে বিনিয়োগের উপর ১৫ শতাংশ হারে কর রেয়াত দেয়ারও প্রস্তাব করা হয়। শেয়ারবাজারের বিনিয়োগকারীদের বিনিয়োগে উত্সাহিত করতে করমুক্ত ডিভিডেন্ড (লভ্যাংশ) আয়ের সীমা ৫ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০ হাজার টাকায় উন্নীত করারও প্রস্তাব করেন অর্থমন্ত্রী। প্রবৃদ্ধি ও মূল্যস্ফীতি: আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৭ দশমিক ২ শতাংশ। চলতি অর্থবছরের প্রকৃত প্রবৃদ্ধি দাঁড়াবে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ থেকে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ। রাজনৈতিক অস্থিরতা ও গ্যাস-বিদ্যুতের সঙ্কটের মধ্যে উচ্চ অঙ্কের প্রবৃদ্ধি নিয়ে অর্থনীতিবিদরা বলছেন, ৭ দশমিক ২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির জন্য যে পরিমাণ বিনিয়োগ দরকার তা এই সময়ে করা অনেকাংশে অসম্ভব। আগামী বাজেটে মূল্যস্ফীতির হার ধরা হয়েছে ৭ শতাংশ। সংশোধিত বাজেট: খসড়া হিসাব অনুসারে চলতি অর্থবছরের মূল বাজেট থেকে ২ হাজার ৪১২ কোটি টাকা ছেঁটে ফেলা হয়েছে। গত বছরের ৭ জুন অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত এক লাখ ৯১ হাজার ৭৩৮ কোটি টাকার বাজেট পেশ করেছিলেন। তবে সংশোধিত বাজেটে তা কমিয়ে এক লাখ ৮৯ হাজার ৩২৬ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। বাজেটে রাজস্ব আয় ধরা হয়েছিল ১ লাখ ৩৯ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। যা সংশোধিত বাজেটে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। তবে বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিও (এডিপি) কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাস্তবায়ন করা যাচ্ছে না। ৫৫ হাজার কোটি টাকার এডিপি কমিয়ে আনা হয়েছে ৫২ হাজার ৩৬৬ কোটি টাকায়। এদিকে চলতি অর্থবছরের বাজেট ঘোষণায় ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৩৫ হাজার ৪৬ কোটি টাকা। সংশোধিত বাজেটে তা ৩ হাজার ৭৬২ কোটি টাকা বেড়েছে। ফলে সংশোধিত বাজেটে মোট ভর্তুকির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩৮ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। মূল বাজেটে প্রাক্কলিত ঘাটতি ধরা হয়েছিল জিডিপির ৫ শতাংশ। সংশোধিত বাজেটে তা সামান্য হ্রাস পেয়ে দাঁড়াবে ৪ দশমিক ৮ শতাংশে। রাষ্ট্রপতি ২০১৩-১৪ অর্থ বছরের বাজেটে অনুস্বাক্ষর করেছেন গতকাল সংসদে প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট ২০১৩-১৪ উপস্থাপনের আগে মন্ত্রীসভায় তা অনুমোদন করা হয়েছে। এরপর রাষ্ট্রপতি আব্দুল হামিদ প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট এবং সংশোধিত বাজেট ২০১২-১৩ তে অনুস্বাক্ষর করেন। রাষ্ট্রপতি গতকাল তাঁর জাতীয় সংসদ ভবনের অফিসে এই বাজেটে অনুস্বাক্ষর করেন। ডেপুটি স্পিকার শওকত আলী, অর্থসচিব ও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের চেয়ারম্যান এ সময়ে উপস্থিত ছিলেন। এর আগে রাষ্ট্রপতি সংসদ ভবনে এসে পৌঁছলে ডেপুটি স্পিকার, সংসদ সচিবালয়ের সচিব ও সার্জেন্ট অ্যাট আর্মস তাঁকে স্বাগত জানান।