বর্তমানে ব্যাংক হলো এমন একটি বিশ্বস্ত এবং নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান, যার মাধ্যমে দুনিয়ার যে কোন প্রান্তের সাথে ব্যবসায়িক সম্পর্ক স্থাপন করা যায়। পৃথিবীর উন্নত দেশগুলোতে চলছে ‘ভারচুয়াল ব্যাংকিং’-এর গবেষণা। যেখানে ব্যাংকিং কার্যাবলী পরিচালিত হবে মানববিহীন উচ্চ প্রযুক্তির সাহায্যে। প্রযুক্তির আশীর্বাদে স্থান-কালের দূরত্ব হ্রাস পেয়ে এখন সারা পৃথিবীটাই আমাদের হাতের ছোট্ট মুঠোফোনটিতে ঠাঁই পেয়েছে।
আজ থেকে ৫২ বছর পূর্বে ১৯৬১ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ‘ফাস্ট ন্যাশনাল সিটি ব্যাংক অব নিউইয়র্ক’ সর্বপ্রথম ই.পদ্ধতিতে হস্তান্তরযোগ্য আমানতি সনদ চালু করে। আর এক্ষেত্রে সর্বপ্রথম ইলেক্ট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার সিস্টেম (ইএফটিএস) নামক ব্যবস্থাটি চালু হয়। পরবর্তীতে ১৯৬৭ সালে যুক্তরাজ্যের বার্কলেজ ব্যাংক ক্যাশ ডিসপেনসার (সিডি) চালু করে। এ পদ্ধতিতে ব্যাংক তার গ্রাহকদের কাগজের ভাউচার প্রদান করতো— যা মেশিনে ঢুকিয়ে দিলে অনায়াসেই ১০ পাউন্ড বের হয়ে আসতো। তবে ভাউচারটি মেশিনেই থেকে যেতো। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে সিডি ছিল অফ-লাইন। ব্যাংকিং জগতে ১৯৭২ সালে সর্বপ্রথম অন-লাইন ক্যাশ পয়েন্ট মেশিন চালু হয় লিয়ডস্ ব্যাংকে। লেনদেন সম্পন্ন হওয়ার পর এই মেশিন কার্ডটি না রেখে গ্রাহককে ফিরিয়ে দিতো। এ মেশিনটিতে বর্তমানে কম্পিউটারের মতো গ্রাফিক্স মনিটর থাকে যার মাধ্যমে টাকা জমা বা উত্তোলন, স্থানান্তর, ঋণ পরিশোধ ইত্যাদি নির্দেশনা ও বাস্তবায়নের কাজে ব্যবহার করা হয়। বর্তমানে এটিএম কার্ড, ডেবিট কার্ড, ক্রেডিট কার্ড, হোম ব্যাংকিং, মোবাইল ব্যাংকিং, ইন্টারনেট ব্যাংকিং, এসএমএস ব্যাংকিংসহ নানাবিধ আকৃতি ও ধরনে ই.ব্যাংকিং মানুষের দোরগোড়ায় উন্নতমানের ব্যাংকিং সেবা পৌঁছি দিতে সক্ষম হয়েছে। ইলেক্ট্রনিক ডিভাইজ ব্যবহার করে নেটওয়ার্কিং-এর সাহায্যে বিভিন্ন ধরনের ব্যাংকিং কার্যক্রম পরিচালনায় আমাদের দেশও পিছিয়ে নেই। নিম্নে বহুলপ্রচলিত কয়েকটি ই.ব্যাংকিং সেবার বিবরণ অতি সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
অটোমেটেড টেলার মেশিন (এটিএম) বর্তমান সময়ে সবচেয়ে বেশি ব্যবহূত এবং জনপ্রিয় সেবা প্রদানকারী অনুষঙ্গ। এটি একটি প্লাস্টিক কার্ড, যা নগদ জমা এবং উত্তোলনের কাজে চব্বিশ ঘন্টা ব্যবহূত হয়ে থাকে। এটি এমন একটি স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র যা প্রতিষ্ঠানের লবিতে, এপার্টমেন্ট কমপ্লেক্স, বাণিজ্যিক এলাকা, শপিং সেন্টার, কারখানা এলাকা ইত্যাদি যে কোন এলাকায় স্থাপন করা যায়। এর মাধ্যমে ব্যাংকগুলো তাদের বিভিন্ন খুচরা সেবাগুলো গ্রাহকদের অতি সন্নিকটে পৌঁছে দিতে পেরেছে। সারা দেশে প্রায় প্রত্যেকটি ব্যাংকের নিজস্ব বুথের পাশাপাশি শেয়ারড বুথও রয়েছে। এতে সুবিধা হলো যেমন— ক) চেক প্রয়োজন হয় না, খ) স্বাক্ষর মিল-অমিলের কোন সংশয় নেই, গ) ৩৬৫ দিনের যে কোন সময়ে সেবাপ্রাপ্তির সুবিধা, ঘ) কাউন্টারে যন্ত্রণাদায়ক ভিড়ের মধ্যে পড়ে থাকতে হয় না, ঙ) সহজে বহনযোগ্য, চ) সকল পক্ষের সময় ও অর্থ সাশ্রয় ইত্যাদি।
‘ফ্রাঙ্কলিন ন্যাশনাল ব্যাংক’ ১৯৫১ সালে সর্বপ্রথম ক্রেডিট কার্ডের প্রচলন করে। ১৯৬৬ সালে ‘ব্যাংক অব আমেরিকা’ তার ক্রেডিট স্কীম চালু করার জন্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এবং অন্যান্য দেশের সর্বাধিক ব্যাংকগুলোকে এ লাইসেন্স দেয়। এ প্রক্রিয়ায় ব্যাংক কর্তৃক গ্রাহককে ব্যাংকের টাকা ব্যবহারের একটি লিমিট দেয়া হয়। গ্রাহক তার একাউন্টে টাকা না থাকা সত্ত্বেও এ কার্ড দিয়ে টাকা উত্তোলন করতে পারেন কিংবা বিভিন্ন শপিং প্রতিষ্ঠান থেকে কেনাকাটা সম্পন্ন করতে পারেন। ক্রেডিট কার্ডে খরচ করার জন্য কার্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান তার গ্রাহকদের প্রায়শ একটি অনুগ্রহ সময় দিয়ে থাকে। বর্তমানে পৃথিবীতে সর্বাধিক প্রচলিত ক্রেডিট কার্ডগুলো হলো ভিসা, এমেক্স, মাস্টার, আমেরিকান এক্সপ্রেস, গোল্ড কার্ড ইত্যাদি।
ব্যাংকের শাখায় মোবাইল নম্বর রেজিস্ট্রেশন করে এসএমএস ব্যাংকিং সেবা চালু করতে হয়। যে কোন সময় একাউন্ট ব্যালেন্স ও স্টেটমেন্ট পেতে এসএমএস ব্যাংকিং সেবা অতুলনীয়। এ সেবা সমপ্রসারণের মাধ্যমে শাখার গ্রাহকসেবার মান উন্নতি করা সম্ভব। যে সকল গ্রাহক শুধুমাত্র একাউন্ট ব্যালেন্স জানার জন্য শাখায় আসেন এসএমএস ব্যাংকিং চালু করলে ব্যালেন্স জানার জন্য তাদের শাখায় আসার দরকার হবে না। এতে ব্যাংকার ও গ্রাহকের সময়, শ্রম ও অর্থ সাশ্রয় হয়।
বাংলাদেশে ক্লিয়ারিং জগতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী একটি নাম বাংলাদেশ অটোমেটেড ক্লিয়ারিং হাউজ (বিএসিএইচ)। এই নেটওয়ার্কের আওতায় এখন কেন্দ্রীয়ভাবে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়ে ক্লিয়ারিং সম্পন্ন হয়ে থাকে। এতে গ্রাহকরা একদিনেই তার চেক তার ব্যাংকের যে কোন শাখার মাধ্যমে ক্লিয়ারিং করিয়ে অর্থ উত্তোলন করতে পারছেন, যা আগে ক্ষেত্র বিশেষে এক সপ্তাহও লেগে যেত। এক্ষেত্রে কেবল চেকের ইমেজ পাঠাতে হয়, পূর্বের মত মূল চেক পাঠানোর প্রয়োজন হয় না। এ ব্যবস্থা ব্যাংকিং-এ প্রভূত অগ্রগতি ও সাচ্ছন্দ্য আনয়ন করেছে।
বাংলাদেশ ইলেক্ট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফার নেটওয়ার্ক (বিফটিন) ই. ব্যাংকিং-এর অন্যতম একটি সংযোগ। এই সমন্বিত নেটওয়ার্ক আন্তঃব্যাংক লেনদেনে একটি যুগান্তকারী পদক্ষেপ। এর মাধ্যমে কোন ব্যাংক অন্য যে কোন ব্যাংকের যে কোন শাখায় যে কোন হিসেবে অর্থ জমা ও উত্তোলন করতে পারে। বিশেষত কর্পোরেট গ্রাহকদের হাজার হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেতন-ভাতা দেয়া, বৈদেশিক রেমিট্যান্স নির্দিষ্ট গ্রাহকের হিসাবে জমা করা এই পদ্ধতিতে খুবই সহজ। কর্পোরেট গ্রাহকদের বিভিন্ন পাওনা বিল আদায়ও এই পদ্ধতির অন্যতম সুবিধা। সকল তফসিলি ব্যাংক, বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকগুলো পুরোমাত্রায় এই সুবিধা ব্যবহার করে তাদের গ্রাহকদের সন্তুষ্টি বিধানে তত্পর রয়েছে।
মোবাইল ব্যাংকিং এমন একটি শাখাবিহীন ডিজিটাল ব্যাংকিং সিস্টেম যার মাধ্যমে স্বল্প খরচে দক্ষতার সাথে ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত মানুষের নিকট পৌঁছানো য়ায়। এ পদ্ধতির সাহায্যে প্রকৃত অন-লাইন সুবিধা পাওয়া যায়। ইন্টারনেট ব্যবহার করে মোবাইল ব্যাংকিং-এর মাধ্যমে মোবাইলে টাকা রিচার্জ করা যায়। এটি প্রত্যেকের জন্য প্রয়োজনী অতি কাঙ্ক্ষিত একটি সেবা। প্রি-পেইড প্যাকেজে ১০ টাকা থেকে ১০০০ টাকা পর্যন্ত দিনে সর্বোচ্চ পাঁচবার রিচার্জযোগ্য। পোস্ট-পেইড প্যাকেজে ৫০ টাকা থেকে ৫০০০ টাকা পর্যন্ত দিনে সর্বোচ্চ পাঁচবার রিচার্জযোগ্য। এতে কোন চার্জ প্রযোজ্য নয়। দিনে ২৪ ঘণ্টা, সপ্তাহে ৭ দিন ও বছরে ৩৬৫ দিন ব্যাংকিং সুবিধা। এ পদ্ধতিতে বিদেশ থেকে অর্থ প্রেরণ ও গ্রহণ,নগদ টাকা জমা/উত্তোলন,এক একাউন্ট হতে অন্য একাউন্টে অর্থ স্থানান্তর,একাউন্টের ব্যালান্স জানা,বেতন/ভাতা প্রেরণ ও গ্রহণ,মোবাইল টপ-আপ (রিচার্জ),পণ্য ক্রয়-বিক্রয়,যে কোন মোবাইল ফোন ও সিম ব্যবহার করে এই সুবিধা গ্রহণ,মাত্র ২০ টাকা জমা দিয়ে একাউন্ট খোলাসহ আরো অনেক সুবিধা গ্রহণ করা যায়। বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ডাচবাংলা ব্যাংক মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস চালু করে। ‘এম ব্যাংকিং’ নামে ইসলামী ব্যাংকও এ সেবা চালু করছে।
ডেবিড কার্ড ইলেক্ট্রনিক ফান্ড ট্রান্সফারের একটি অন্যতম পদ্ধতি, যা ‘ক্যাশ কার্ড’ বা ‘এসেট কার্ড’ হিসেবে বহুল প্রচলিত। এটি ব্যাংক ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান কর্তৃক আমানতকারীকে প্রদত্ত চুক্তিভিত্তিক সাংকেতিক নম্বরযুক্ত এক ধরনের বিশেষ প্লাস্টিক কার্ড। এর মাধ্যমে ইলেক্ট্রনিক উপায়ে তহবিল স্থানান্তর ও আমানত হিসাব থেকে টাকা উত্তোলন করা যায়। কার্ডটি নগদ টাকা, চেক বা ক্রেডিট কার্ডের বিকল্প হিসেবে ব্যবহূত হয়। সচ্ছল লোকদের নিকট এ কার্ডের গ্রহণযোগ্যতা বেশি।
