দেশটি গ্রীষ্মমণ্ডলে তো
বটে, এছাড়া এদেশে গ্রীষ্মকাল ছাড়া অন্য ঋতুর স্থায়িত্ব এতকম যে, সে যে এলো বোজা গেলো তো বোঝা গেলো না। আবার খর রোদে কেউ দিব্যি ভালো থাকেন অন্যরা হন তাপাহত। এর কারণও অজানা। একসময় মনে করা হত সূর্যের কড়া আলো পড়ে শরীরে, প্রচণ্ডতাপ ঢোকে শরীরের বাহির থেকে
ভেতরে ফলে পানিশূন্যতা। আর সেজন্যই যত সমস্যা। এই
তত্ত্বও ধোপে টিকেনা।
অনেক ক্রীড়াবিদ মেঘে ঢাকা
দিনে কেন, সূর্যালোক যখন
সরাসরি ছোয়না শরীরকে, তবু
কেন অসুস্থ হন। একটু শীতল
দিনে, ৮০ ডিগ্রীর নিচে তাপমাত্রা যখন তখনও কেন অসুস্থ হয় অনেকে। অনেকে জলপূর্ণ হবার পরও কেন সুস্থ হননা। কয়েক
বছর আগে অস্ট্রেলিয়ার মেলবর্ণ
এ দু’মাস ব্যবধানে দুটো
ট্রায়াথলনে পরীক্ষার ক্ষেত্র হলো তাপাহত হওয়া নিয়ে।
প্রথম যে ক্রীড়াটি অস্ট্রেলিয়ার গ্রীষ্মকালের শুরু হলো পনের
জন প্রতিযোগীকে এ জন্য
চিকিত্সা দেয়া হলো। এদের
মধ্যে তিন জনের হয়েছিলো
জীবন সংশয়ী হিটেস্ট্রাক। দ্বিতীয় একই রকম ট্রায়াথলন হলো খুব গরমের দিনে। কিন্তু কোনও দৌঁড়বিদই তেমন
কাবু হলেননা।
প্রথম মেলবোর্ন রেসে যে
দৌঁড়বিদরা অসুস্থ হয়েছিলেন
তাদের কারোরই যেন খুব
পানিশূন্যতা হয়েছিলো তা নয়। পানিশূন্যতার আগেই তাদের শরীর খারাপ হয়েছিলো। ডগ্লাস কাজা যিনি কানেকটিকাট্ বিশ্ববিদ্যালয়ে কিনেসিওলজির অধ্যাপক তিনি
উচ্চতাপে ক্রীড়াবিদদের পারফোরম্যান্স নিয়ে কেন
গবেষণা করছিলেন, তাঁর বক্তব্য, “আমরা তাপজনিত পীড়া সম্বন্ধে অনেক কিছুই এখনও জানিনা।” ডগলাস কাজা বলেন, ‘তাপ-পীড়া’ জিনিষটিই একটি বহুমাত্রিক বিষয়, সাত থেকে আটটি নানান অবস্থা
নিয়ে এই রোগসমষ্টি।” মৃদু তাপাহত হওয়া থেকে শুরু করে জীবন সংশয়ী হিট্ স্ট্রোক পর্যন্ত এর ব্যপ্তি। অস্ট্রোলিয়ায় হয়ত আগষ্ট মাসে এই তাপ-পীড়া বেশি, কারণ খর রোদের তাপ হলেও ক্রীড়াবিদ অনেকে ঘরের বাইরে শরীরচর্চা করতে পছন্দ করেন। ফুটবল টিমগুলো বছরের এ সময়
দিনে দুটো প্যাকটিস করতে
শুরু করেন। দৌঁড়বিদরা বেশি
দূর দৌঁড়ান। সাইক্লিস্টরাও। ক্রীড়াবিদরা এমন গরমে নিজেদেরকে এত প্রবলভাবে নিয়োজিত করলে যা হয়, তাতো বিজ্ঞানীরা জানেন। ভেতরে
উত্তাপে শক্ত হতে থাকে পেশী। চলমান পেশী থেকে বেরিয়ে
আসে প্রচণ্ড শক্তি, এর মাত্র
২৫ শতাংশ ব্যবহূত হয় পেশী সংকোচনে। বাকি ৭৫ শতাংশ পরিণত হয় দেহতাপে।
আমেরিকান কলেজ অব স্পোটর্স মেডিসিনের ২০০৭ সালের প্রকাশিত নিবন্ধে তাপ পীড়া নিয়ে ছিলো বেশ আলোচনা। ব্যায়ামের ফলে প্রতি পাঁচ মিনিটে দেহের অভ্যন্তরীন তাপ বেড়ে যেতে পারে ২ ডিগ্রী। দেহ তাপ যদি না বেরোয়, ইতিমধ্যে সূর্যালোক ও পরিবেশের বায়ুর তাপ, সমস্যা বাড়ায়। আর্দ্রতা
যোগ করে বাড়তি সমস্যা, ঘাম বাষ্পিভূত হওয়া রোধ
করে, দেহতাপ অপসারণের বড় একটি উপায় বটে এটি। তাপ পীড়া হলে বড় সমস্যা দেহের বাইরের তাপ নয়, বরং অভ্যন্তরের
তাপ। কোনও ব্যক্তির দেহের অভ্যন্তরীণ তাপ মান যদি ১০৫ ডিগ্রী ফারেন হাইট পর্যন্ত বাড়ে,
এই সংকট সীমা অতিক্রান্ত হলে পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। শ
রীর হয়ে উঠে অতি
উত্তপ্ত, চাপ পড়ে হূদপিন্ডের
উপর, দেহের প্রধান যন্ত্রে পাম্প
হয় কম রক্ত। প্রভাব পড়ে রক্ত
চাপের উপর। মাথা ঝিমঝিম, দিকভ্রম হতে পারে উপসর্গ।
কোষ পর্যায়ে যা ঘটে তাহলো দেহতরলের আয়তনে ও
কাষের ঝিল্লীর মধ্য
দিয়ে চলাচলে ঘটে বিপর্যয়। কোষগুলোর মরণ দশা শুরু হয়। তাপাহত হওয়ার এ পর্যায়টি
জীবন সংশয়ী। তীব্র এবং শ্রান্ত
করে দেয়ার মত হিটস্ট্রোকে
এসব ঘটে। মারাত্মক হতে
পারে। ব্যায়াম না করেও
অনেকের হতে পারে হিটস্ট্রোক, তবে তা ভিন্ন বটে। এক ভীষণ
ঘামে ফ্যাকাশে হয়ে যায় যারা ব্যায়াম করেন। আর ব্যায়াম
যারা করেন না এদের মুখ চোখ লাল হয়ে যায়, ত্বক হয় শুষ্ক।
কেউ হয়ত কোন এক গরম বিকেলে
শরীরের তাপ ক্ষয় করতে
পারেন না অন্য দিনের চেয়ে,
এও এক রহস্য। তাপাহত
কেন হয় মানুষ এনিয়ে
গবেষণা হয়েছে অনেক।
স্থূল হওয়া, বেঢপ আয়তন
শরীর হলে, ব্যায়ামের আগে মদ্যপান করলে, জ্বর হলে,
ভারি পোষাক পরলে- এফিড্রিন জাতীয় ওষুধ খেলে হতে পারে তাপাহত হবার ঘটনা। তাপে নিজেকে খাপ খাওয়াতে না পারলেও সমস্যা হয়। চর্চা না থাকলে শরীর তাপকে
মোকাবেলা করতে
পারে না সহজে। অবশ্য
ব্যাপারটি সত্যি শীতের
দেশের জন্য, আমাদের
জন্য নয়। গরমে যদি মাথা ঝিমঝিম করে, অস্বাভাবিক
ক্লান্ত লাগে, হয়ত অদ্ভূত লাগে- তখন শিথিল হতে হবে।
দৌঁড়ানোর সময় খারাপ লাগলে বাদ দিয়ে জগিং করুন।
জগিং করছেন, খারাপ গালছে, বাদদিয়ে হাঁটুন। ছায়ায় যান। পানির বোতল থেকে পানি পান করুন। পানির বোতল আইসকিউর দিয়ে রাখলে সুবিধা। তবু যদি কোনও দৌঁড়সঙ্গী ভয়ানক গরম
ও বিহ্বল হয়ে যান তাহলে বরফশীতল জলে অবগাহন।
