ঢাকায় সভা-সমাবেশ বন্ধ করা প্রসঙ্গে

আপডেট : ০৭ জুন ২০১৩, ২১:২০
ঢাকায় এক মাসের জন্য সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ হবার ঘোষণায় দেশ তোলপাড়। রাজনীতিবিদ ও সুশীল সমাজ বলছেন এ ‘অগণতান্ত্রিক’, ‘স্বৈরতান্ত্রিক’, ‘অসাংবিধানিক’, ‘মৌলিক অধিকার পরিপন্থী’, ‘নজিরবিহীন ঘটনা’ ‘ঘূর্ণিঝড়ের খোঁড়া অজুহাত’, ‘বিরোধীদলের আন্দোলন দমন-পীড়ন মূলক’ ইত্যাদি। বিপরীতে ব্যবসায়ী মহলের কাছে তা ‘যৌক্তিক’, ‘সময়োচিত, ‘অর্থনীতির জন্য মঙ্গলজনক’। তাদের চোখে এখনো জ্বলজ্বলে ৫মে হেফাজতে ইসলামের সমাবেশকে কেন্দ্র করে পল্টন এলাকায় ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানে পরিচালিত সেই ধ্বংসযজ্ঞ ও নারকীয় তাণ্ডব। আমজনতাও বেজার নয়— ‘রাজায় রাজায় যুদ্ধ হয়, উলুখাগড়ার প্রাণ যায়’ এই উদ্ধারহীন বন্দী দশা কিছুুদিন তো অন্তত ভুলে থাকা যাবে! আচ্ছা এ বিষয়ে আইন কী বলে? ‘সমাবেশের স্বাধীনতা’র সাংবিধানিক ভিত অনুচ্ছেদ ৩৭। ওই অনুচ্ছেদ বাংলাদেশের প্রত্যেক নাগরিককে কোনো স্থানে সমবেত হওয়ার এবং জনসভা ও শোভাযাত্রায় যোগদানের অধিকার দিয়েছে। তবে তা হতে হবে শান্তিপূর্ণ ও নিরস্ত্র অবস্থায়। তাছাড়া ‘জনশৃঙ্খলা’ বা ‘জনস্বাস্থ্যে’র স্বার্থে ‘আইন আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ’ও এক্ষেত্রে মানতে হবে। শব্দগুলো (terms) একটু বিশ্লেষণ করা যাক। ‘জনশৃঙ্খলা’ বলতে রাষ্ট্রে দাঙ্গা-বিদ্রোহ, উচ্ছৃঙ্খলতা, সহিংসতা কিংবা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা বিঘ্নকারী কর্মকাণ্ডের অনুপস্থিতিকে বোঝায়। গণশান্তি ও জননিরাপত্তা বিঘ্নকারী সবকিছুই জনশৃঙ্খলার পরিপন্থী। ‘জনস্বাস্থ্য’ বলতে জনগণের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতাকে বোঝায়। যেমন সংক্রামক ব্যাধিগ্রস্ত কোনো ব্যক্তিকে সভা-সমাবেশে যোগ দিতে দেওয়া যাবে না। কারণ তার উপস্থিতি, মানুষকে রোগাক্রান্ত করবে অর্থাত্ জনস্বাস্থ্যের পরিপন্থী। ‘জনশৃঙ্খলা’র স্বার্থে প্রচলিত আইনে সমবেত হওয়া বা সভা-সমাবেশে যোগদান প্রসঙ্গে বিভিন্ন বিধি-নিষেধের কথা বলা আছে। যেমন দণ্ডবিধিতে ‘গণশান্তির বিরুদ্ধে অপরাধ’ শিরোনামে একটা অধ্যায় (৮ম) আছে। ওই অধ্যায়ে বেআইনি উদ্দেশ্যে পাঁচ বা ততোধিক ব্যক্তির সমবেত হওয়াকে ‘বেআইনি সমাবেশ’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে, যার শাস্তি সর্বোচ্চ ছয়মাস কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড বা উভয়দণ্ড যোগ্য (ধারা:১৪১ ও১৪৩)। আর বেআইনি সমাবেশের সাধারণ উদ্দেশ্য পূরণে এর কোনো সদস্য কর্তৃক বলপ্রয়োগ বা সহিংসতা ছড়ানো আখ্যায়িত হয়েছে ‘দাঙ্গা’ হিসেবে, যার শাস্তি সর্বোচ্চ দু’বছর কারাদণ্ড বা জরিমানা বা উভয়দণ্ড (ধারা: ১৪৬-১৪৭)। অধ্যায়টিতে সমবেত হওয়া বা সভা-সমাবেশ কেন্দ্রিক বিচিত্র অপরাধ ও তার সাজার বর্ণনা রয়েছে। অন্যদিকে ফৌজদারি কার্যবিধির ১২৭ ধারাবলে বেআইনি সমাবেশ বা গণশান্তি নষ্ট করতে পারে এমন সমাবেশকে ছত্রভঙ্গ করা যাবে। প্রয়োজনে সামরিক বা অসামরিক শক্তি প্রয়োগও করা যাবে (ধারা: ১২৮-১২৯)। কোনো জনসমাবেশ এবং শোভাযাত্রা জান-মাল-গণশান্তির জন্য প্রচণ্ড বিপজ্জনক হয়ে ওঠার আশঙ্কা জাগালে ১৪৪ ধারা জারি করা যাবে। তাছাড়া ১৮৬১ সালের পুলিশ আইন এবং ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনেও রয়েছে কিছু নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থা। অন্যদিকে ‘জনস্বাস্থ্যে’র স্বার্থে দণ্ডবিধির ২৬৯ ও ২৭০ ধারায় রোগের সংক্রমণ বিস্তারকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। ফৌজদারি কার্যবিধির ১৩৩ ধারাবলে কোনো প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেট শারীরিক আরাম-আয়েশের পক্ষে ক্ষতিকর সবকিছু নিষিদ্ধ বা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ‘আইন আরোপিত বাধা-নিষেধ’ বলতে এরূপ বিধি-বিধানকেই বোঝায়। জরুুরি অবস্থাকালে সংবিধানের ১৪১খ অনুচ্ছেদ বলে নির্বাহী আদেশে সমাবেশের অধিকারসহ বিভিন্ন মৌলিক অধিকার স্থগিত করা হয়। কিন্তু দেশে ১৪১ক অনুচ্ছেদ বলে এখনো জরুরি অবস্থা ঘোষিত হয়নি। অর্থাত্ আইনগতভাবে দেশে স্বাভাবিক অবস্থা বিরাজমান। আর স্বাভাবিক অবস্থায় ঢাকা মহানগরীতে সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করতে চাইলে ১৯৭৬ সালের ঢাকা মহানগর পুলিশ অধ্যাদেশ অনুসারে করতে হয়। ওই অধ্যাদেশের ২৯ ধারা বলে ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার ১) জনশান্তি ও নিরাপত্তার স্বার্থে, ২) লিখিত আদেশ দ্বারা এবং ৩) সর্বোচ্চ ৩০ দিন মিছিল ও সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করতে পারেন। নিষেধাজ্ঞা ৩০ দিনের বেশি রাখতে চাইলে সরকারের অনুমতি লাগবে। অথচ স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে ওই ধারা অনুসরণ করা হয়নি। পত্রিকান্তরে যতটা জেনেছি, তাতে এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় কোনো প্রজ্ঞাপন বা পরিপত্র জারি কিংবা ডিএমপি কর্তৃক কোনো লিখিত আদেশ প্রদানের খবর পাইনি। পারিপার্শ্বিক অবস্থা, আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতি ও আদালতের রায় বিবেচনায় সভা-সমাবেশ বন্ধে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বা স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ব্যাখ্যাকে ‘আইন আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধা-নিষেধ’ হিসেবে গণ্য করার সুযোগও নেই। ঠিক কিসের ভিত্তিতে বা কোন আইনে বা কোন প্রক্রিয়ায় সরকারের এ সিদ্ধান্ত— তাও অস্পষ্ট। অর্থাত্ গুণগত বা পদ্ধতিগত মান বিচারে ঢাকায় সভা-সমাবেশ বন্ধের সরকারি সিদ্ধান্তকে কোনোভাবে আইনসম্মত বলার সুযোগ নেই। ঢাকা