ঊর্ধ্বতনদের মাসোহারা দিতেই ঘুষ খাই

আপডেট : ০৭ জুন ২০১৩, ২২:৫৪
সাভার ও সোনারগাঁও থানা হেফাজতে দুই তরুণ ব্যবসায়ীকে শারীরিক নির্যাতন করে হত্যা করা হয়। পুলিশের চাহিদা অনুযায়ী ঘুষ দিতে না পারায় ওই দুই ব্যবসায়ীকে জীবন দিতে হয়েছে। এক ব্যবসায়ী হত্যাকাণ্ডে এসআইসহ চার পুলিশকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অপর ব্যবসায়ী হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা নিয়ে চলছে নানা ষড়যন্ত্র। সাভার ও সোনারগাঁও থানা পুলিশ হেফাজতে খুন হয়েছেন যথাক্রমে তরুণ ব্যবসায়ী শামিম সরকার (৩৪) ও শামিম রেজা (৩৫)। ময়না তদন্ত রিপোর্টে এই দুই ব্যবসায়ীকে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। অপর দিকে খোদ রাজধানীতে মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের এক উপ-পুলিশ কমিশনারের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের ধরে নিয়ে ঘুষ আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছিল। অবশেষে গুলশানের এক ব্যবসায়ীকে ধরে নিয়ে এক কোটি টাকা আদায়ের মধ্য দিয়ে এর সত্যতা মেলে। এই সব ঘটনা নিয়ে পুলিশ প্রশাসনে এখন তোলপাড়। অভিযুক্ত পুলিশের এক কর্মকর্তা শীর্ষ এক কর্মকর্তাকে প্রকাশ্যে বলে দেন ‘স্যার, আপনাদের অর্থাত্ এসপি ও ডিআইজিদের পদে পদে ঘুষ নেয়া বন্ধ করতে হবে। তাহলে থানায়ও ঘুষ বাণিজ্য অনেক কমে যাবে।’ এ প্রসঙ্গে এক কর্মকর্তা বলেন, প্রতি মাসে থানা থেকে এসপি ও ডিআইজিদের নির্ধারিত হাতে ঘুষের প্যাকেট পৌঁছে দিতে হয়। এই ঘুষ না দিলে সত্ অফিসার হলেও অসত্ অফিসার হিসেবে তার এসিআর-এ ওই কর্মকর্তা উল্লেখ করে দেন। ৯৮ ভাগ থানায় নিরীহ মানুষ কিংবা বিরোধী দলীয় নেতাকর্মীদের ধরে এনে ঘুষ আদায়ের বাণিজ্য চলে। চার শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, রাজধানী ঢাকা ও আশপাশে কিংবা চট্টগ্রামে কিছু সংখ্যক থানায় একেক ওসি বদলি হয়ে আসতে এসপি, ডিআইজি এবং শীর্ষ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের ২০ থেকে ৫০ লক্ষ টাকা পর্যন্ত উেকাচ দিতে হয়। একইভাবে কোন কোন রেঞ্জের ডিআইজি এবং জেলার এসপি বদলি হতে শীর্ষ প্রশাসনকে উেকাচ দিতে হয়। আর এ উেকাচ নেয়ার জন্য শীর্ষ প্রশাসনে ‘বহিরাগত ক্যাশিয়ার’ থাকে। এই ক্যাশিয়ারের কাছে নির্ধারিত উেকাচ জমা দেয়ার পর তিনি শীর্ষ কর্মকর্তার কাছে গ্রিন সিগনাল দেন। এরপর ভাল জায়গায় অর্থাত্ ঘুষ বেশি পরিমাণে আদায়ের বাণিজ্যের জায়গায় বদলির আদেশ জারি হয়ে যায় বলে উক্ত কর্মকর্তারা জানান। কোন কোন জেলা এসপি ও রেঞ্জের ডিআইজি সরাসরি থানার ওসি ও এসআইদের কাছ থেকে ঘুষ গ্রহণ করেন। থানায় যোগদানের আগে মাসিক ঘুষ প্রদানের রেটটাও ওই সকল ওসি-এসআইদের জানিয়ে দেন। কয়েক থানার ওসি এর সত্যতা স্বীকার করে বলেন, এসপি আর ডিআইজির জন্য ঘুষ আদায়ের ধান্ধা করতে সারাদিন যায়। থানার অন্যান্য মামলার তদন্ত দারুণভাবে ব্যাহত হয় বলে তারা জানান। প্রায় এক ডজন এসপি ও ডিআইজি পদমর্যাদার কর্মকর্তার বাংলাদেশের বাইরে বাড়ি-গাড়িসহ বিপুল সম্পদ রয়েছে, এমন অভিযোগও পাওয়া যায়। সর্বশেষ ঘুষের টাকা আদায়ের জন্য সাভার থানার পুলিশের শিকার তরুণ ব্যবসায়ী শামিম সরকার। গত বুধবার রাতে হেমায়েতপুর এলাকা থেকে সাভার থানার এসআই এমদাদ ও এএসআই আকিদুল ইসলামের নেতৃত্বে শামিম সরকার ও সাইফুল ইসলাম নামে দুই জনকে ধরে নেয়া হয়। তাদেরকে থানায় নিয়ে শারীরিক নির্যাতন চালানো হয়। ব্যবসায়ী শামিমকে বাঁচতে হলে পাঁচ লক্ষ টাকা ঘুষ দিতে হবে বলে এসআই এমদাদ ও এএসআই আকিদুল ইসলাম সাফ জানিয়ে দেন। এতো টাকা শামিমের পক্ষে দেয়া সম্ভব নয় বলে জানান পুলিশকে। দর কষাকষিতে দুই লাখ টাকা দিতে হবে বলে পুলিশ শামিমকে জানিয়ে দেয়। রাত ১২টা পর্যন্ত ওই ঘুষের টাকা আত্মীয়-স্বজনরা যোগাড় করতে না পারায় শামিমের ওপর পুলিশের নির্যাতনের মাত্রা বেড়ে যায়। এক পর্যায়ে শামিম থানায় নিস্তেজ হয়ে পড়ে। এসআই এমদাদ ও আকিদুল ইসলাম হেমায়েতপুরে অস্ত্র উদ্ধারের কথা বলে থানা থেকে শামিমকে নিয়ে বের হয়ে পড়ে। তাকে সজ্ঞাহীন অবস্থায় হাসপাতালে নেয়ার পর কর্তব্যরত চিকিত্সক মৃত ঘোষণা করেন। থানায় ফিরে এএসআই আকিদুল ইসলাম হেন্ডকাপ রেখে বাসায় ফেরেন এবং স্ত্রীকে নিয়ে সাভার থেকে পালিয়ে যান। তার গ্রামের বাড়ি ময়মনসিংহে গতকাল শুক্রবার পুলিশ অভিযান চালায়। এদিকে গত বৃহস্পতিবার রাতে ঢাকা রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মিজানুর রহমানের নেতৃত্বে শামিমের হত্যাকাণ্ডের ঘটনা তদন্ত করেন। গভীর রাত পর্যন্ত তদন্ত করে শামিমকে ঘুষ আদায়ের জন্য পিটিয়ে হত্যার প্রমাণ পাওয়া গেছে। এই ঘটনায় থানায় হত্যা মামলা দায়ের করা হয়। এসআই এমদাদসহ চার পুলিশকে গ্রেফতার করা হয়। এএসআই আকিদুল ইসলাম পলাতক রয়েছেন। গ্রেফতারকৃত অপর তিন কনস্টেবল হলেন ইউসুফ, মোজাম্মেল ও রমজান। এর আগে সাভারে এসআই এমদাদ এক ট্রাক অস্ত্র আটক করেছিলেন। মোটা অংকের উেকাচ আদায়ের মাধ্যমে ট্রাকভর্তি অস্ত্র ছেড়ে দেয়া হয়। ওই সময় পুলিশ প্রশাসনে এ নিয়ে তোলপাড় হয়েছিল। এসআই এমদাদকে ওই সময় কিশোরগঞ্জে বদলি করা হয়। কিন্তু এক শীর্ষ কর্মকর্তা মোটা অংকের উেকাচ নিয়ে ওই বদলির আদেশ বাতিল করে এসআই এমদাদকে সাভার থানায় রেখে দেন। বিনিময়ে ওই কর্মকর্তাকে এসআই এমদাদ মাসে পাঁচ লক্ষ টাকা করে উেকাচ দিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। গত বৃহস্পতিবার স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ মর্গে শামিম সরকারের লাশের ময়নাতদন্ত শুরু হয়। ময়নাতদন্তকালে চিকিত্সক শামিমের দেহে অসংখ্য প্রহারের চিহ্নের আলামত পেয়েছেন। তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে চিকিত্সক ময়নাতদন্ত রিপোর্টে উল্লেখ করেন। তরুণ ব্যবসায়ী শামিম হত্যাকাণ্ড নিয়ে সাভার এখন উত্তাল। গত ১৪ মে নারায়ণগঞ্জ জেলার সোনারগাঁও থানার ফোর মার্ডারে জড়িত থাকার অভিযোগে প্রতাবের চর গ্রামের বাসিন্দা আলাউদ্দিনের পুত্র তরুণ ব্যবসায়ী শামিম রেজাকে পুলিশ গ্রেফতার করে। থানায় নিয়ে নির্দয়ভাবে শারীরিক নির্যাতন চালায়। রাতভর থানা ও ওসির বাসভবনে শামিমের ওপর চলে নির্যাতন। তাকে বাঁচতে হলে পাঁচ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হবে বলে পুলিশ কর্মকর্তারা জানিয়ে দেন। সর্বশেষ দুই লাখ টাকা উেকাচ দিলেও শামিম বাঁচতে পারেননি। পুলিশের নির্যাতনেই শামিম মারা যান। শীর্ষ পুলিশ কর্মকর্তারা তদন্ত করে শামিমকে থানায় আটক রেখে ঘুষ আদায়ের নামে নির্যাতন করে হত্যা করার প্রমাণ পান। সোনারগাঁও থানার ওসি আতিকুর রহমান, ওসি (তদন্ত) অরূপ তরফদার, এসআই পল্টু ঘোষ ও সার্কেলের এএসপি উত্তম প্রসাদ পাটক শামিমের নির্যাতনের সঙ্গে সরাসরি জড়িত। ওসি আতিকুর রহমান ছাড়া অভিযুক্ত অপর তিন কর্মকর্তাকে প্রত্যাহার করা হয়। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ মর্গে ২২ মে শামিমের লাশের ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়। ময়নাতদন্ত রিপোর্টে চিকিত্সক তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে উল্লেখ করেন। এই ময়নাতদন্ত রিপোর্ট ২৭ মে সাভার থানার কনস্টেবল রমজান ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ ফরেনসিক বিভাগ থেকে স্বাক্ষর করে গ্রহণ করেছেন। শামিমের এই ময়নাতদন্ত রিপোর্ট গতকাল পর্যন্ত সোনারগাঁও থানায় পৌঁছেনি। অভিযুক্ত পুলিশ কর্মকর্তারা শামিম হত্যাকাণ্ড ধামাচাপা দেয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছেন বলে তার পরিবারের অভিযোগ। ১৯ এপ্রিল রাতে সোনারগাঁও থানার পিরোজপুর ইউপির চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলামের বাসায় তার স্ত্রী শামিমা ইসলাম সুমা, শ্যালক রানা ও দুই গৃহকর্মী রেখা ও মনিকে হত্যা করা হয়। এই ফোর মার্ডারের মূল হোতা চেয়ারম্যান রফিককে রক্ষা করতে শামিমকে ধরে নিয়ে ঘুষ আদায়ের নামে হত্যা করা হয়েছে বলে আত্মীয়-স্বজন অভিযোগ করেছেন। নারায়ণগঞ্জের পুলিশ সুপার সৈয়দ নুরুল ইসলাম বলেন, শামিমের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট এখনো পাননি। এই রিপোর্ট প্রাপ্তির পর মামলা দায়ের করা হবে বলে তিনি জানান। পুলিশের আইজি হাসান মাহমুদ খন্দকার বলেন, থানায় ধরে নিয়ে পিটিয়ে হত্যার সঙ্গে জড়িত কাউকে ছাড় দেয়া হবে না। এছাড়াও যে কোন থানায় নিরীহ মানুষকে কিংবা কাউকে ধরে এনে ঘুষ আদায়ের নামে হয়রানি করা হলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলেও তিনি সতর্ক করে দেন।