প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা এবং অনিচ্ছায় কি জাতীয় সংসদের মেয়াদ নির্দিষ্ট হতে পারে? চাইলেই কি প্রধানমন্ত্রী সংসদ ভেঙ্গে দিতে পারেন? সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার এই ক্ষমতা কি প্রধানমন্ত্রীর স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা? বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে এ বিতর্ক দেখা দিয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের সংসদীয় দলের সভায় প্রধানমন্ত্রী আগামী ২৫ অক্টোবর সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি সংসদ সদস্যদের বলেছেন ২৫ অক্টোবরই হবে এই সংসদের শেষ কার্যদিবস। গত শুক্রবার দেশের জাতীয় দৈনিকগুলোতে এ সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে। আমাদের সংবিধান জাতীয় সংসদের মেয়াদ ৫ বছর নির্দিষ্ট করেছে। সংবিধানের ৭২(৩) অনুচ্ছেদে উল্লেখ রয়েছে, “রাষ্ট্রপতি পূর্বে ভাঙ্গিয়া না দিয়া থাকিলে প্রথম বৈঠকের তারিখ হইতে ৫ বত্সর অতিবাহিত হইলে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবে।” নবম জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশন বসেছিলো ২০০৯ সালের ২৫ জানুয়ারি। এই হিসাব অনুযায়ী আগামী বছরের ২৪ জানুয়ারি সংসদের মেয়াদ শেষ হবে। প্রধানমন্ত্রীর ওই ঘোষণা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি ২৫ অক্টোবর সংসদ ভেঙ্গে দিলে মেয়াদ অবসানের তিন মাস আগেই সংসদ বিলুপ্ত হবে। এখন প্রশ্ন হলো প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছায় কি সংসদের আয়ুষ্কাল নির্ধারিত হবে?
দুটি কারণে আমাদের সংবিধানে সংসদ বিলুপ্তের নির্দেশনা রয়েছে। প্রথমত সংবিধানের ৭২(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মেয়াদ অবসানজনিত কারণে; দ্বিতীয়ত ৫৭(২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী প্রধানমন্ত্রী সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারালে এবং অন্য কাউকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন হিসেবে পাওয়া না গেলে। ৫৭(২) অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থন হারাইলে প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করিবেন কিংবা সংসদ ভাঙ্গিয়া দিবার জন্য লিখিতভাবে রাষ্ট্রপতিকে পরামর্শদান করিবেন এবং তিনি অনুরূপ পরামর্শদান করিলে রাষ্ট্রপতি, অন্যকোন সংসদ সদস্য সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের আস্থাভাজন নহেন এই মর্মে সন্তুষ্ট হইলে, সংসদ ভাঙ্গিয়া দিবেন।”
সুতরাং সংসদ ভেঙ্গে দেয়া প্রধানমন্ত্রীর কোন স্বেচ্ছাধীন ক্ষমতা নয়। তিনি কেবল সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থন হারালেই রাষ্ট্রপতিকে সংসদ ভেঙ্গে দিতে বলবেন। এক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রীকে রাষ্ট্রপতিকে সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থন হারানোর কথা লিখিতভাবে জানাতে হবে। বর্তমান জাতীয় সংসদে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটের দুই-তৃতীয়াংশ সংসদ সদস্য রয়েছে। ফলে বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যদের সমর্থন হারানোর বাস্তব ক্ষেত্রে কোন সম্ভাবনা নেই। এছাড়া প্রধানমন্ত্রী সংসদ ভেঙ্গে দেয়ার কথা বললেই রাষ্ট্রপতি সংসদ ভেঙ্গে দিতে পারেন না। যতদিন সংসদের মেয়াদ আছে ততদিনের জন্য অন্য কোন সংসদ সদস্যের প্রতি সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের সমর্থন আছে কিনা তা তিনি খতিয়ে দেখবেন। বর্তমান ক্ষেত্রে হয়ত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যেভাবে চাইবেন সংসদ সদস্যরা সেভাবেই সমর্থন দেবেন। কিন্তু সেটি হবে সংবিধানের একটি বিধানকে উপেক্ষা করার শামিল। সংবিধানকে সংরক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তা বিধান করা হবে এ মর্মে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী এবং মন্ত্রিগণ শপথ করেছেন।
