জীবন রক্ষাকারী ওষুধ যেমন আছে, তেমনি ওষুধের নামে বিষও আছে! বাজারে দুই ধরনের ‘ওষুধ’ই পাওয়া যাচ্ছে। আসল ওষুধ চেনা ক্রেতার জন্য কঠিন। কারণ অনেক নামিদামি দোকানেও নামিদামি কোম্পানির নামে ভেজাল ওষুধ বিষ বিক্রি করা হচ্ছে। আর এই ভেজাল ওষুধ খেয়ে রোগ নিরাময় তো দূরের কথা আরো জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন রোগী। গর্ভাবস্থায় এ ধরনের ওষুধ খেলে শিশু বিকলাঙ্গও হতে পারে। গতকাল শনিবার র্যাবের ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযানে ধরা পড়েছে এমনি একটি ভুয়া ওষুধ কারখানা। যেখানে নামিদামি অনেক কোম্পানির নাম ব্যবহার করে ওষুধ বানিয়ে প্যাকেটজাত করা হতো। আদালত কারখানার মালিককে দুই বছর কারাদণ্ড দিয়েছে।
ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা গতকাল এ প্রতিবেদককে বলেন, শুধুমাত্র রাজ-ধানীতেই অন্তত সহস্রাধিক ভেজাল ওষুধের কারখানা রয়েছে। আর এসব কারখানায় ওষুধের নামে যা তৈরি করে বাজারে ছাড়া হচ্ছে তাকে বিষই বলা উচিত। এসব নকল বা ভেজাল ওষুধ খেয়ে রোগ তো কমছেই না, বরং তা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে আরো জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন রোগীরা। বিশেষ করে শিশুদের ভেজাল ওষুধ খাওয়ালে খুবই ক্ষতি হতে পারে। এ থেকে পরিত্রাণের উপায় কি? জবাবে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, অপেক্ষাকৃত নামি দোকান থেকে ওষুধ কিনতে হবে। ওষুধ কেনার পর সুযোগ থাকলে চিকিত্সককে দেখিয়ে তারপরই সেবন করতে পারলে ভালো হয়।
নকল ওষুধ কারখানার বিরুদ্ধে ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর কি পদক্ষেপ নিচ্ছে এমন প্রশ্নের জবাবে পরিচালক আবুল খায়ের চৌধুরী ইত্তেফাককে বলেন, প্রতিনিয়তই তারা অভিযান পরিচালনা করছেন। ভেজাল ওষুধের কারখানা আবিষ্কারও করা হচ্ছে। তিনি স্বীকার করেন, রাজধানীসহ সারাদেশেই বিপুল পরিমাণ ভেজাল ওষুধের কারখানা রয়েছে। শুধু ওষুধ প্রশাসন অধিদফতর নয়, সরকারের সব সংস্থাকেই এর বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান তিনি।
দোকানগুলোতে বিক্রি হওয়া ভেজাল ওষুধের ব্যাপারে বাংলাদেশ কেমিস্ট অ্যান্ড ড্রাগিস্ট সমিতির উপ-সম্পাদক মনির হোসেন ইত্তেফাককে বলেন, ব্যবসায়ীদের পক্ষে নকল বা ভেজাল ওষুধ চেনা কোনভাবেই সম্ভব নয়। ওষুধ কোম্পানিগুলোর প্রতিনিধিদের কাছ থেকেই তারা ওষুধ কিনে থাকেন। এছাড়া কোথায় নকল ওষুধ তৈরি হচ্ছে, কারাই বা বাজারে নিয়ে আসছে তার কোন কিছুই ব্যবসায়ীরা জানেন না। তাই ভেজাল ওষুধের ব্যাপারে সব পদক্ষেপ ওষুধ প্রশাসন অধিদফতরকেই নিতে হবে। এখানে ব্যবসায়ীদের কিছুই করার নেই বলে মনে করেন তিনি।
গতকাল নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট এ এইচ এম আনোয়ার পাশার নেতৃত্বে র্যাবের মোবাইল কোর্ট পুরনো ঢাকায় অভিযান চালায়। পাটুয়াটুলীর ওয়াইজ ঘাট রোডের ৯/এ হামিদা মঞ্জিলের দ্বিতীয় তলায় পাওয়া যায় নকল ওষুধের কারখানা। সেখানে পাওয়া গেল বিপুল পরিমাণ নকল এসএমসির ওরস্যালাইন, ৯ ধরনের বিভিন্ন ওষুধ, ওষুধ তৈরির বিপুল পরিমাণ উপকরণ, যন্ত্রপাতি এবং মোড়ক। কারখানার মালিক ভুয়া চিকিত্সক এম এ বারেককেও (৪৫) পাওয়া গেল সেখানে। মোবাইল কোর্ট বারেককে তাত্ক্ষণিকভাবে দুই বছরের কারাদণ্ড প্রদান করেন।
এ এইচ এম আনোয়ার পাশা ইত্তেফাককে বলেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে বারেক স্বীকার করেন তিনি ভুয়া ডাক্তার। কেরানীগঞ্জে তার একটি অবৈধ ক্লিনিক রয়েছে, সেখানে তিনি রোগী দেখেন। পাটুয়াটুলীতে ভেজাল ওষুধ তৈরি করেন। মিটফোর্ডেও তার ওষুধের দোকান রয়েছে। সেখানে তিনি ভেজাল ওষুধ বিক্রি করেন। আনোয়ার পাশা বলেন, এর আগেও এম এ বারেকের ভেজাল ওষুধ কারখানাটি কেরানীগঞ্জে ছিল। সেখানে ধরা পড়ার পর গোপনে পাটুয়াটুলীতে ভেজাল ওষুধ তৈরি করছেন। তিনি বিএসসি পাস করে একটি ওষুধ কোম্পানীতে চাকরি করতেন। সেখানে তিনি ওষুধ বানানো শিখেছেন। এরপর থেকে তিনি ভেজাল ওষুধ তৈরি করেন।
