মিষ্টি চেহারার ছোট্ট ধারা সূদূর নড়াইল থেকে ঢাকায় এসেছে চৌষট্টি জেলার ক্ষুদে বিজ্ঞানীদের সঙ্গে নিজের উদ্ভাবিত যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে প্রতিযোগিতা করতে। নড়াইলে জেলা পর্যায়ে ধারার উদ্ভাবন প্রথমস্থান অর্জন করার পর নতুন উদ্যাম নিয়ে এগিয়ে চলেছে সে। ঢাকায় প্রতিযোগিতা ছিল দেশের প্রত্যেক জেলার বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান অর্জনকারীদের নিয়ে। ধারা ধরেই নিয়েছিল এখানে অংশগ্রহণ করাটাই বড় কথা। আর শুনেছিল ঢাকায় ওদের বিজ্ঞান প্রতিযোগিতা দেখতে আসবেন প্রিয় শিক্ষক ও বিজ্ঞান লেখক জাফর ইকবাল। কয়েকদিন পরেই পরীক্ষা থাকা সত্ত্বেও স্যারের সঙ্গে দেখা করার লোভ সালাতে পারেনি ধারা। কিন্তু স্যার এলেন না। মন কিছুটা খারাপ হয়েছিল। প্রতিযোগিতার সমাপনী দিন মন খারাপ করে মায়ের সঙ্গে বাড়ী ফিরে যাওয়ার অপেক্ষা। কিন্তু মাইকে যখন ঘোষণা করা হল ৩৪তম জাতীয় বিজ্ঞান প্রতিযোগিতার (জুনিয়র) প্রথম হয়েছে বেদৌরা সাবির ধারা। প্রথম খটকা লাগলেও দ্বিতীয়বার শুনতে ভুল হয়নি— প্রতিযোগীদের পেছনে ফেলে সে অর্জন করে ফেলেছে প্রথম স্থান, ৬২ জেলার। ধারা শুধু ডাক্তার হতে চায় না, হতে চায় একজন চিকিত্সা বিজ্ঞানী। ধারাসহ খুদে নারী বিজ্ঞানীদের নিয়ে আমাদের এই প্রতিবেদনটি লিখেছেন— মিজানুর রহমান
মহাকাশ বিজ্ঞানী হতে চায় নাবিলা
লাইট সেন্সর ফায়ার অ্যালার্মিং পদ্ধতির উদ্ভাবক
চট্টগ্রাম ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির ছাত্রী নাবিলা নওশিন। পারিবারিকভাবে বৈজ্ঞানিক আবহে বড় হওয়ার কারণেই বিজ্ঞানী হওয়ার ঝোঁক। ছোট বেলার এ আগ্রহেই বিজ্ঞান বিভাগে পড়া শুরু। ঘরে থাকা পুরনো রেডিও, টিভির রিমোট ভাঙ্গার মাধ্যমে হাতেখড়ি। পাঠ্য বইয়ের সামান্য ধারণা থেকেই উদ্ভাবন করে ফেলেছেন লাইট সেন্সর ফায়ার অ্যালার্মিং সিস্টেম (আলোক সংবেদনশীল অগ্নিসতর্কীকরণ ব্যবস্থা)। জেলা পর্যায়ের বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় নাবিলার উদ্ভাবিত লাইট সেন্সর ফায়ার অ্যালার্মিং সিস্টেমটি প্রথম স্থান পেয়েছে। কয়েকশ’ প্রতিযোগীর মধ্যে প্রথম স্থান অর্জন করায় নাবিলার বিজ্ঞান চর্চার আগ্রহ আরও বেড়ে গেছে। খুব কম খরচে এই অ্যালার্মিং সিস্টেমটি বাড়ি অথবা শিল্প প্রতিষ্ঠানে ব্যবহার করে যে কোন ধরনের অগ্নি দুর্ঘটনা এড়ানো যেতে পারে। সাম্প্রতিক সময়ের তাজরিন গার্মেন্টস অগ্নিকাণ্ড, বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেল এনটিভির অগ্নিকাণ্ড, নিমতলীর অগ্নিকাণ্ডসহ কয়েকটি বড় অগ্নি দুর্ঘটনায় প্রাণহানির ঘটনা খুব নাড়া দিয়েছে ক্ষুদে বিজ্ঞানী নাবিলাকে। নাবিলার মতে, যেহেতু সার্বক্ষণিক বিদ্যুত্ ব্যবস্থা ছাড়াও ছোট পেন্সিল ব্যাটারির মাধ্যমেও এই ফায়ার অ্যালার্মিং সিস্টেমটি চালু রাখা যায়— তাই অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বিদ্যুত্ ব্যবস্থা বিকল হয়ে গেলেও এই ব্যবস্থা চালু থাকবে। তাছাড়া আলোক সংবেদনশীল হওয়ায় আগুন ছড়িয়ে পড়ার আগেই সবাই সতর্ক হতে পারবে। এত করে প্রাণহানির আশংকা থাকবে না।
নাবিলার বাবা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিদ্যা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. এস এম খোরশেদ আলম এবং মা নাসরিন আহমেদ গৃহিণী। ক্ষুদে এই বিজ্ঞানীর অন্যতম উত্সাহদাতা বাবার মতে, ছোটবেলা থেকেই নাবিলা একটু বেশি বিজ্ঞানমনস্ক স্কুলে পড়ার সময় থেকে। ঐ সময় থেকেই সাইন্স ফিকশনধর্মী বইয়ের পোকা নাবিলা ইতোমধ্যেই পড়ে ফেলেছে জুলভার্ন, জাফর ইকবালসহ বিখ্যাত সব লেখকের সাইন্স ফিকশনের বই। চট্টগ্রাম পাবলিক ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক কলেজের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মোহাম্মদ আনিস ফারুক এই শিক্ষার্থীর বিজ্ঞান চর্চার আগ্রহের প্রশংসা করে বলেন, প্রচুর বিজ্ঞান চর্চার পরও তার বিভাগের ৬০জন শিক্ষার্থীর মধ্যে নিয়মিত ভাল ফলাফল করছে নওশিন। প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে সে অবশ্যই ভাল করবে। অদম্য উদ্ভাবনী ইচ্ছার কারণে উচ্চ মাধ্যমিক পাসের পর নাবিলা নওশিন ভর্তি হতে চান বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের যন্ত্রপুরকৌশল বিভাগে। পড়াশোনা শেষ করে যেতে চান দেশের বাইরে। যোগদান করতে চান কোন স্বনামখ্যাত মহাকাশ গবেষণা প্রতিষ্ঠানে। নওশিনের বাবা-মায়েরও একই ইচ্ছা মেয়ে যেন হতে পারে মহাকাশ বিজ্ঞানী।
==
স্টিফেন হকিং-এর মত বড় পদার্থবিদ
হতে চায় নওশিন
অল্প খরচের প্রজেক্টরের উদ্ভাবক
সাভারের পরমাণু গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক কর্মকর্তা সৈয়দ সাবিরুল ইসলামের একমাত্র সন্তান নওশিন তাবাসসুম। বাবার আগ্রহেই বিজ্ঞানী হওয়ার সুপ্ত ইচ্ছার ডানা একটু প্রসারিত করতে হয়েছে। নিজের একার চেষ্টায় শুধুমাত্র মাধ্যমিক পদার্থবিজ্ঞান বইয়ের আলোর প্রতিসরণের ধারণাকে কাজে লাগিয়ে উদ্ভাবন করেছেন খুবই কম খরচে তৈরি করা যায় এমন প্রজেক্টর। গ্রামের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ক্লাব অথবা অন্য কোন প্রতিষ্ঠান চাইলে অনেক টাকা খরচ না করে নিজেদের প্রয়োজনে তৈরি করে নিতে পারেন এই প্রজেক্টর। যা দিয়ে চলচ্চিত্র দেখা হতে শুরু করে ক্লাসে পাঠদানসহ যে কোন কাজ চালিয়ে নেয়া যাবে। মুন্সিগঞ্জ জেলার বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় কয়েকশ’ প্রতিযোগীর মধ্যে ইতোমধ্যে নওশিনের উদ্ভাবিত প্রজেক্টর প্রথম স্থান অর্জন করেছে। মুন্সিগঞ্জ এস কে সরকরি বালিকা বিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের মেধাবী শিক্ষার্থী নওশিন তাবাসসুম প্রচুর বিজ্ঞানচর্চার পরও এই বিভাগের শতাধিক শিক্ষার্থীর মধ্যে ফলাফলের দিক থেকে নওশিন বরাবরই প্রথম। এই স্কুলের শিক্ষক মোহাম্মদ আব্দুর রাজ্জাকের মতে, মনস্তাত্ত্বিক দিক দিয়ে নওশিন অন্য বাচ্চাদের তুলনায় কিছুটা আলাদা। সে বিভিন্ন ধরনের বৈজ্ঞানিক এক্সপেরিমেন্টে অনেক সময় ব্যয় করলেও নিয়মিত পড়াশোনায় আবার অন্য শিক্ষার্থীদের তুলনায় ভাল ফলাফল করছে। ছোট্ট পদার্থবিদ নওশিনের মা গৃহিণী হাসিনা মমতাজ। আর দশটা মেয়ে যখন সপ্ন দেখে ব্যাংকার হবে, ডাক্তার হবে অথবা ইঞ্জিনিয়ার হবে, তখন নওশিন পদার্থ বিজ্ঞান নিয়ে পড়তে চায়। এই আগ্রহ তৈরি হওয়ার কারণ কি জানতে চাইলে তিনি বলেন, বাবাকে দেখেই মেয়ের পদার্থ বিজ্ঞানের প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছে। ছোটবেলা থেকে প্রচুর সাইন্স ফিকশন পড়ার কারণে এই আগ্রহটা এখন জীবনের লক্ষ্য হয়ে গেছে। ক্ষুদে এই বিজ্ঞানী বিশ্ববিখ্যাত পদার্থ বিজ্ঞানী স্টিফেন হকিংস-এর মত জগত্ জোড়া পদার্থবিজ্ঞানী হতে চায়।
==
মা-বাবার ইচ্ছায় ডাক্তার হবে ধারা
ইউ-টার্ন পদ্ধতির যোগাযোগ ব্যবস্থার উদ্ভাবক
বেদৌরা সাবির ধারার বাবা গার্মেন্টস বায়িং ব্যবসায়ী মোহাম্মদ আজহারুল ইসলামের কর্মস্থল ঢাকায়। বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ধারাকে একটু বেশিই নড়াইল থেকে ঢাকায় বাবার কাছে আসতে হয়। আসতে পথে খুব একটা বাধা না পেলেও ঢাকায় প্রবেশের পর থেকে অনেকগুলো সিগন্যালে কয়েকঘন্টার অপেক্ষা যেন নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই অসহনীয় যানজটই ধারাকে যানজটমুক্ত ট্রাফিক ব্যবস্থার উদ্ভাবনে সহায়তা করেছে। ধারার উদ্ভাবিত পদ্ধতিতে শুধু সময় সাশ্রয়ই হবে না। অন্যান্য অবকাঠামোগত খরচের প্রয়োজন না থাকায় সরকারের সাশ্রয় হবে কয়েকশ’ কোটি টাকা। মিষ্টি চেহারার ছোট্ট ধারা নড়াইল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির ছাত্রী। বিজ্ঞানচর্চায় এত মগ্ন থাকে ধারা মাঝে মাঝে খেতেই ভুলে যায়। ধারার স্কুলের বিজ্ঞান নিভাগের শিক্ষক মাসুদুর রহমান জানালেন, ধারা বিভিন্ন উদ্ভাবনি কাজে সময় দিলেও বিজ্ঞান বিভাগের ১২৪ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে ধারা প্রথম স্থান দখল করে আছে। ধারার মা নাজনিন সুলতানা নড়াইল সদরের চারিখাতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা। নিজে শিক্ষিকা হলেও প্রচুর সময় দেন একমাত্র সন্তানকে। তিনি চান তার ময়ে যেন বড় হয়ে ডাক্তার হতে পারে। নাজনিন সুলতানা ধারাকে একজন প্রতিষ্ঠিত ডাক্তার হিসেবে দেখতে চান। যাতে করে মেয়ে বলে তাকে কেউ ছোট করে দেখতে না পারে।
==
মহাকাশ গবেষক হওয়ার স্বপ্ন আশার
কম সেচে অধিক ধান ফলন পদ্ধতির উদ্ভাবক
আয়শা সিদ্দিক আশা। ছোটবেলা থেকেই প্রচণ্ডরকম মেধাবী এই শিক্ষার্থী নিতান্তই মনোযোগের কারণে উদ্ভাবন করে ফেলেছেন কম সেচ দিয়ে অধিক ধান ফলনের পদ্ধতি। উদ্ভাবিত এই পদ্ধতি ইতোমধ্যে রংপুরের জেলা বিজ্ঞান প্রতিযোগিতায় প্রথম স্থান পেয়েছে। বাবা অবসরপ্রাপ্ত সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এম সাইদুজ্জামান। নিজের জমি বর্গা দেন এবং কিছু জমিতে নিজে ধান চাষ করেন। বছর দু’এক আগের ঘটনা। সেবার চাষাদের সঙ্গে নিজেও জমিতে বিআর-২৮ প্রজাতির ধান করেছেন। হঠাত্ করে বিদ্যুতের লোডশেডিং বেড়ে গেলে জমির সেচকাজে বিঘ্ন ঘটে। আশানুরূপ ফলনের ব্যাপারে বেশ সন্দিহান ছিলেন সাইদুজ্জামান। কিন্তু ফলন কয়েকগুণ বেশি হল। রিতিমত আশ্চর্য হওয়ার মত ঘটনা। কিন্তু কারণ খুঁজে পেলেন না। বিষয়টি খেয়াল করেন আশা। রংপুর ক্যান্টনমেন্ট পাবলিক স্কুল এন্ড কলেজের ২য় বর্ষের ছাত্রী আশা বিষয়টি জানান, রসায়ন বিভাগের শিক্ষক সিরাজুল ইসলামকে। সিরাজুল ইসলাম তাত্ক্ষণিকভাবে আশার পর্যবেক্ষণের মধ্যে বৈজ্ঞানিক যুক্তি খুঁজে পেয়ে নিজের প্রায় ৩৩ বিঘা জমিতে ধান চাষের সিদ্ধান্ত নেন। পদ্ধতিটি ব্যবহার করে সিরাজুল ইসলাম ঐ বছর কয়েকগুণ বেশি ফলন পান। তিনি বিআর-২৮ এবং নেপালী স্বর্ণা প্রজাতির ধান চাষ করেছিলেন। পরে তিনি এই পদ্ধতির আরো গবেষণার জন্য আশার কয়েকজন বন্ধুকে নিয়ে একটি গ্রুপ তৈরি করেন। এই গ্রুপটি তাদের উদ্ভাবিদ পদ্ধতির জন্য রংপুর জেলায় প্রথম স্থান পেয়েছে। সিরাজুল ইসলাম আশা করেন, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এই পদ্ধতিটি আরো গবেষণা করে দেখবে। তিন ভাই-বোনের মধ্যে ছোট আশা। হতে চান মহাকাশ গবেষক।
==
প রা ম র্শ
ড. জেসমিন
সহযোগী অধ্যাপক
জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড বায়োটেকনোলজি
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
বিজ্ঞানে কিংবা গবেষণায় আমাদের দেশে নারীদের অবস্থান ধীরে ধীরে সন্তোসজনক পর্যায়ে পোঁছাচ্ছে। এক সময় নারীদেরকে বিজ্ঞানের গবেষণায় খুব একটা দেখা যেত না। কিন্তু বর্তমানে এই অবস্থার পরিবর্তন ঘটছে। পুরুষরা নারীদেরকে এখন অনেক স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছে। এটা ভাল একটা দিক। কিছুদিন আগে ঢাকা বিশ্বদ্যািলয়ের বায়োসাইন্স ফ্যাকাল্টিতে পুরুষ বিজ্ঞানীদের পাশাপাশি দুজন নারী বিজ্ঞানীও পুরস্কার অর্জন করেন। এর মানে আমরা এগিয়ে যাচ্ছি। তবে একটা বিষয় লক্ষ্যণীয় যে কোনো ক্ষেত্রে সফল হতে হলে একজন পুরুষের তুলনায় নারীকে কয়েকগুণ বেশি পরিশ্রম করতে হয়। আমরা যদি সাম্প্রতিক সময়ের এসএসসি, এইচএসসি পরীক্ষা কিংবা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের দিকে তাকায় তাহলে দেখবো মেয়েদের উপস্থিতি অত্যন্ত সরব এবং খুব ভাল করছে তারা। আমি এমন একটা দিনের জন্য অপেক্ষা করছি যেদিন আমরা ‘নারী’ কিংবা ‘পুরুষ’ হিসেবে বিবেচনা না করে প্রত্যেককে মানুষ হিসেবে বিবেচনা করবো।
