বাবা দিবসের গল্পকথা

আপডেট : ০৯ জুন ২০১৩, ২০:০২
বাবা সত্তাটি নির্দিষ্ট কোন দায়িত্ববোধ নয়। এ যেন এক মধুর ভার। সন্তানের সবচেয়ে কাছের বন্ধুটি হলেন বাবা। নগরজীবনে কর্মব্যস্ততার ভিড়ে সন্তান লালন-পালনের ভার বাবা-মা দু’জনেই সমানভাবে ভাগ করে নেন। বাবা দিবসকে সামনে রেখে আমাদের এই প্রতিবেদন। লিখেছেন— প্রিয়রঞ্জিনী পৃথিবীর সব বাবাই প্রেমিক... —ফেরদৌস বাপ্পী ফেরদৌস বাপ্পী! একজন নন্দিত ও স্বনামধন্য উপস্থাপক। অন্যদিকে গ্রামীণ ফোনের উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করছেন দীর্ঘদিন। কিন্তু সব পরিচয় ছাপিয়ে তিনি বিশিষ্ট হয়ে ওঠেন বাবা সত্তায়। দু’জন অপরূপা কন্যা সন্তানের গর্বিত বাবা তিনি। প্রথম বাবা হওয়ার কথা বলতে গিয়ে বলেন, ২০০০ সালের কথা। ১৩ ডিসেম্বর রাত সাড়ে বারোটায় জন্ম নেয় আমাদের প্রথম সন্তান মানতাকা তাহিয়া। আমি মনে-প্রাণে কন্যা সন্তান চেয়েছিলাম। টাওয়েলে পেঁচিয়ে ছোট্ট মানতাকাকে যখন আমার কোলে দেয়া হলো... সত্যি বলতে এমন অদ্ভুত... বিস্ময়কর, অপূর্ব অনুভূতি আমার আগে অজানা ছিল। ছোট্ট বেবীটা যেন চুম্বকের মতন আমাদের সব মনোযোগ, স্বপ্ন, ভালোবাসার পরম আকর্ষণ হতে থাকে। আমি বাইরে থাকলে দেখতাম ছোট্ট মেয়ে আমার প্রায়ই শাড়ি পরে অপেক্ষা করতো আমার জন্য। ২০০৭ সালে আবার বাবা হই। পরিবার, আমার স্ত্রী জেরিন সকলেই চাইছিল এবার ছেলে হোক। কিন্তু আমি মনে-প্রাণে আরেকটি কন্যা চেয়েছিলাম। সত্যিই আল্লাহ আমার কথা শুনেছেন এবং আরেকটি ছোট্ট প্রিন্সেস আমাদের জীবন আলো করে আসল। ওর নাম রাখলাম মাহিরা তাবাসসুম। দুটি কন্যা আমার ও আমার স্ত্রী জেরিনের জীবনের সমস্ত আলোর উত্স। আমার সাথে ওদের শাসনের বিষয় নেই, পুরোটাই বন্ধুত্ব। জেরিনও খুব বেশি কেয়ারিং একজন মা। এক্ষেত্রে আমি বলবো বাবা হিসেবে আমি ভীষণ আবেগপ্রবণ। বড়ো মেয়ে মানতাকা ও ছোট মেয়ে মাহিরা বাবার কোলেই বসেছিল। বাবার কথা বলতে গিয়ে বড় মেয়ে মানতাকা বলে, বাবার উপস্থাপনা আমার ভালো লাগে। আর বাবা তো আমাদের বন্ধু। বাবা আমাদের অনেক সময় দেয়, পড়ায়, কত গল্পই করে। বাবার সাথে সবই বলা যায়। ছোট মেয়ে মাহিরা বলে, বাবার কোলে বসে আমরা স্কুলে যাই, আসিও সেভাবে। আমি আর বাবা কত খেলি। এরপর ফেরদৌস বাপ্পীর স্ত্রী জেরিন আক্তার বলেন, বাপ্পী একজন অসাধারণ বাবা। বাচ্চাদের সব বিষয়ে সে সহযোগিতা করে। জ্বর হলে রাত জেগে ওষুধ খাওয়ানো, পড়ানো, দেখাশোনা সবকিছুই সে শেয়ার করে। বাবা দিবস নিয়ে ফেরদৌস বাপ্পী বলেন, আমার মনে হয়, আমরা বাবাদের ভালোবাসতে দিবস পালন করিনি। নিরন্তর ভালোবাসা বহন করছি। আর এমন একটি স্পর্শকাতর সম্পর্কের যে উপলক্ষ উদ্বেলতা, বিশ্বজুড়ে তার একটি নন্দিত সৌন্দর্যও আছে। আমি নিজে বাবা না হলে আমার বাবার অপার সৌন্দর্যকে উপলব্ধি করতে পারতাম না। সেখানে সহযাত্রী আমার মেয়েরা। ওদের চোখ দিয়ে আমি এক নতুন পৃথিবী দেখি। -- সন্তান জন্মের সময় বাবার কাছে থাকা উচিত —আমিনুল ইসলাম একটি অপরেশন থিয়েটার। সজল স্ত্রী শারমিনের হাত ধরে আছে। ভয় আর উত্কণ্ঠা তার চোখেমুখে। এক সময় ভূমিষ্ট শিশুর কান্নায় হাসি ফোটে শারমিনের মুখে। বাবা সজল প্রথম তার সন্তানকে কোলে নেন। মায়ের আগে দেখেন ছেলেকে। এটা বাবা দিবসের কোন নাটক নয়; সত্যি ঘটনা। আমাদের দেশে সন্তান জন্মের সময় স্বামী স্ত্রীর পাশে থাকার অনুমতি পায় না। তবে এই দম্পতি নাছোড়। তারা ডাক্তারকে বুঝিয়ে ঠিক রাজি করিয়েছেন। বাবা দিবসকে সামনে রেখে আমরা গিয়েছিলাম এই সুহূদ বাবা সম্পর্কে জানতে। আমিনুল ইসলাম। কাজ করেন ইউনেসেফে। শিশু সুরক্ষা বিশেষজ্ঞ হিসেবে। তার স্ত্রী আছেন মন্ত্রী পরিষদ বিভাগের সিনিয়র সহকারি সচিবের দায়িত্বে। দুই ছেলের বাবা আমিনুল ইসলাম সজল তার স্ত্রীকে সন্তান পালনসহ সব কাজে সমান সহযোগিতা করে বলে জানান স্ত্রী শারমিন। আমিনুল বলেন, উন্নত বিশ্বে স্ত্রীর প্রসব যন্ত্রনা অনুভব আর সন্তানের সাথে একটি আন্তরিক সম্পর্কও তৈরি করার জন্য এসময় স্বামীকে স্ত্রীর পাশে থাকতে দেয়, যা জরুরি। শারমিনের কাজে জানা যায় একজন বাবা হিসেবে আর কি জরুরি কাজ করেন সজল। শারমিন বলেন তার প্রথম ছেলে সুদিপ্তের বয়স যখন ৮ মাস তখন শারমিন একটি স্কলারশিপ নিয়ে দুই বছরের জন্য জাপান যান। এই দুই বছর ছেলে লালন পালনের গুরু দায়িত্ব পালন করেন সজল। যদিও সহযোগী হিসেবে এসময় তার শাশুড়ি ছিলেন। তথাপি বাচ্চার গোসল, খাওয়া দাওয়া, ঘুমপাড়ানো সবই নিজেই করেছেন। সেই থেকে আজ অবধি এই কাজ উপভোগ করেন তিনি। সজল বলেন অফিসের কাজে দেশের বাইরে ছিলাম, ফোন করলে শারমিন জানায় আমি বাবা হবো। সেই সময়ের সেই উপলদ্ধি অন্যরকম। তা আমি ভাসায় প্রকাশ করতে পারবো না। স্ত্রীর স্কলারশিপ বিষয় সজল বলেন, আমি একবার পড়াশুনার জন্য বিদেশে গিয়েছিলাম। তখন আমাদের ছেলে পৃথিবীতে আসেনি। সেই সময় শারমিন একা থেকেছে। আমার মনে হয়েছে ওকেও আমার এই সুযোগটা দেওয়া উচিত্। যদিও শুরুতে এত ছোট বাচ্চা রেখে যেতে চাচ্ছিল না । আমি ওকে জোর করি। শারমিন বলেন ও আমকে এভাবে নিশ্চিত করেছে যে আমার মধ্যে কোন অপরাধ বোধ তৈরী হয়নি। আমাদের সমাজে বাবার জন্য অনেক কিছু ছাড় দেওয়া হলেও মাযের পান থেকে চুন খসার জো নেই সেখানে আমি পিএইচডি করে এসেছি। যদিও এই দু’বছরে মাঝে আমিও এসেছি আবারও ছেলেকে নিয়ে গেছে। আর সজলের ছেলে সুদিপ্ত বলে বাবা ভালো পড়ান, মা বোঝেই না কিভাবে পড়াতে হয়। বললেও বোঝে না। বাবা অনেক মজা করে খেলেন। -- বাবা শব্দটার মাঝে আছে এক অদ্ভুত ব্যঞ্জনা —শেখ সাইফুর রহমান ২০০৪ সালে শেখ সাইফুর রহমান এবং সুলেখা রহমানের প্রথম সন্তান সুপর্ণ রহমান জন্মগ্রহণ করে। শেখ সাইফুর রহমান বলেন, সন্তানের মুখ দেখার পর পৃথিবীটাই বদলে যায়। অদ্ভুত ভালোবাসা, দায়িত্ব, সন্তানকে সঠিকভাবে পালন করার প্রচেষ্টা, সুপর্ণ হওয়ার পর আমি ও আমার স্ত্রী দুজনই ভাগ করে নিতাম ওকে দেখাশোনা করার দায়িত্বটা। এটা খুবই জরুরি। প্রতিটি সন্তানের জীবনেই বাবা-মা দুজনেরই স্পর্শ থাকা প্রয়োজন। আমার দ্বিতীয় সন্তান সানন্দ রহমান। ওর বয়স চার বছর। তবে সানন্দ আসায় আমি সুপর্ণ ও সানন্দ তিনজন ভীষণ বন্ধু হয়ে গেছি। প্রথম সন্তানের মতই দ্বিতীয় সন্তানটির প্রতিও আমরা সমান যত্নশীল। বাইরে যত কাজই থাকে বাড়িতে আমি ওদের সহজ বন্ধু। ওদের জন্য নিত্য-নতুন রেসিপি করে রান্না করাটা এক দারুণ অভিজ্ঞতা। সেদিনই ছোট ছেলে বলছিল, বাবা তুমি এতো মজা করে রাঁধো কিন্তু আমি ছাড়া কেউ তোমাকে থ্যাংকস দেয় না। জীবনের সাথে ছন্দ মিলিয়ে ওদের শিক্ষাজীবন অগ্রসর হোক এটা যেমন চাই, তেমনই চাই ওরা ভালো মানুষ হোক। বাবা বোধটা আমার কাছে জন্মান্তরের মনে হয়। সন্তানের জন্মের মধ্য দিয়ে একজন বাবাও এক নতুন জীবন পায়। যে জীবনকে দায়িত্ব-ভালোবাসা দিয়ে অদ্ভুতভাবে সাজিয়ে তোলা যায়। আমাদের বাংলাদেশিদের সৌভাগ্য বাবা দিবসের উত্সব ছাড়াও বাবা-মাকে ভালোবাসি আমরা। তবে একটি দিবস যখন উদযাপিত হচ্ছে বিশ্বময় আমরাও তখন অনেকটা আবেগপ্রবণ, নষ্টালজিক হয়ে পড়ি। সন্তানের প্রতি ভালোবাসার পাশাপাশি বাবার প্রতিও শ্রদ্ধায় প্রণত হই, স্মৃতিকাতর হই। নিজের শৈশবের অনেক কথাই মনে পড়ে যায়। তাই দিবসটি নিঃসন্দেহে শ্রদ্ধার স্থান রাখে। গত দু’বছর যাবত্ আমার ছেলেরা আমাকে বাবা দিবসে উপহার দেয়। অফিসে বসে যে মগটিতে আমি চা খাই সেটিও ছেলেদের দেয়া। যদিও জানি, নেপথ্যে আছে ওদের মা তবুও ভালো লাগে বাবা হিসেবে এই নির্মলতা উপভোগ করতে। ওয়ার্কিং বাবা-মা হওয়াতে আমি মনে করি সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো পিতৃত্বকালীন ছুটি নিয়ে ভাবতেই পারে। এখনকার পারিবারিক কাঠামোতেও এর প্রয়োজন হয়ে পড়েছে।