সংযুক্ত আরব আমিরাতের সাতটি প্রদেশের একটি দুবাইয়ের কেন্দ্রস্থলের ঝলমলে সব নাইট ক্লাব ও গগনচুম্বি অট্টালিকা থেকে অনেক দূরে, বাংলাদেশি শ্রমিক মোহাম্মদ আশরাফ (ছদ্মনাম) তার শ্রম ক্যাম্পের ধাতব নির্মিত দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ফ্যালফ্যাল চোখে। চোখে-মুখে ভীষণ উদ্বেগের ছাপ। তার কোম্পানির ধর্মঘট দূর হয়েছে সত্য; কিন্তু তিনি তার ভবিষ্যত্ নিয়ে চিন্তিত। প্রায় ৬ বছর ধরে করা চাকরিটি আর থাকবে কি-না, তা তিনি জানেন না। অবশ্য ধর্মঘট দূর হয়েছে বলাটা ভুল হবে; বলা উচিত, ধর্মঘট প্রত্যাহার করে নিতে বাধ্য করা হয়েছে। রাষ্ট্রযন্ত্র তথা নিরাপত্তা বাহিনী ও কোম্পানির বসদের চাপের মুখে শেষ পর্যন্ত নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয় শ্রমিকরা। তবুও নিস্তার মিলছে না; চলছে ছাঁটাই আতঙ্ক। ইতিমধ্যে অনেকের হাতে ধরিয়ে দেয়া হয়েছে বহিষ্কারাদেশ। আর সংযুক্ত আরব আমিরাতে কোম্পানি থেকে বহিষ্কার হওয়া মানেই দেশ থেকে বিতাড়িত হওয়া; থাকা যাবে না লুকিয়েও। ঠিকই ধরে ফেলবে পুলিশ।
বিশাল নির্মাণ প্রতিষ্ঠান আরবটেক-এ স্ক্যাফল্ডিং ইনস্টলার হিসেবে নিযুক্ত রয়েছেন মোহাম্মদ আশরাফ। তিনি আলজাজিরা টেলিভিশনের এক সাংবাদিককে নাম গোপন রাখার শর্তে জানান, তাদের প্রকল্পে প্রায় প্রতিদিনই বিশ-পঁচিশজনকে দেয়া হচ্ছে বহিষ্কারের চিঠি। প্রথমে এর প্রতিবাদস্বরূপ তারা সমবেত হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শনের চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু পুলিশ ডেকে আনায় তা আর হয়ে উঠেনি। তাদের জোর করে পাঠিয়ে দেয়া হয় শ্রম ক্যাম্পের ভেতরে। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত অভিবাসী শ্রমিকদের অবস্থা সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শারান বারো বলেন, ‘এটি অমানবিক, অধিকাংশ কোম্পানিই তাদের কর্মীদের অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকতে বাধ্য করে। অনিরাপদ পরিবেশের কারণে অনেকেই মারা যাচ্ছে।’
মধ্যপ্রাচ্যের অন্যান্য দেশের মতোই সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে শ্রমিক ইউনিয়ন ও ধর্মঘট নিষিদ্ধ। চাইলেই সেখানে প্ল্যাকার্ড উঁচিয়ে ধরা কিংবা বিক্ষোভ করা যায় না। আরবটেকের মেগা প্রকল্পে শ্রমিকদের কাজ করতে হয় চল্লিশ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি তাপমাত্রায়। তাদের মাসিক গড় মজুরি ২০০ মার্কিন ডলার। কিন্তু এতে তারা সন্তুষ্ট নয়; দাবি জানিয়ে আসছিলেন ১০০ থেকে ১৩৫ মার্কিন ডলার মজুরি বাড়ানোর। কেউ কেউ প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিনা পয়সায় খাবার দাবি করছিলেন। কিন্তু এগুলো কিছুতেই মানতে নারাজ কর্তৃপক্ষ। তারা বলছে, সব কিছুই করা হচ্ছে চুক্তি অনুযায়ী। চুক্তির কোনো শর্তই অপূর্ণ রাখেনি আরবটেক। কাজেই এখন বাড়তি কিছু দাবি করা অযৌক্তিক। এসব অন্যায্য দাবিকে কখনোই প্রশ্রয় দেয়া হবে না।
আরবটেক দুবাইয়ের সর্ববৃহত্ নির্মাণ ফার্ম। শহরের বিমান বন্দর, আবুধাবির লুভ্যর জাদুঘরের আবুধাবি শাখাসহ বেশ কয়েকটি হাই প্রোফাইল প্রকল্প রয়েছে তাদের। তাদের কোম্পানিতে কর্মরত বিদেশি শ্রমিকের সংখ্যা কয়েক হাজার। জোরপূর্বক ধর্মঘট প্রত্যাহার করিয়ে নেয়া হয়েছে সত্য; কিন্তু শ্রমিকদের মনে অসন্তোষ ঠিকই রয়ে গেছে। এ সত্যটি উপলব্ধি করেই তারা ছাঁটাইয়ের কৌশল বেছে নিয়েছে। নইলে যে ফের তারা বিক্ষোভ করার সাহস দেখাবে। ইউএই’র শ্রম মন্ত্রণালয়, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আরবটেকের বেশ সখ্যতা। সে জন্যই খুব দ্রুততার সঙ্গে পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরেছে। তারা আশা করছে, শ্রমিকদের কিছুদিনের কর্মবিরতি সত্ত্বেও সব প্রকল্প শেষ হবে যথাসময়ে। ঠিক কতোজনকে ছাঁটাই করা হবে সে সংখ্যাটা জানাতে রাজি হননি কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের কেউই।
পুলিশী চাপ:অনির্বাচিত আমিরের কনফেডারেশন সংযুক্ত আরব আমিরাতের অংশ হলেও দুবাই স্বায়ত্তশাসিত। সেখানে গণমাধ্যম নিয়ন্ত্রিত; লোকজনের আন্দোলন অবৈধ। কোনো দাবিতে সমবেত হওয়ার খবর শুনলেই পুলিশ গিয়ে হটিয়ে দেয়। মোহাম্মদ আশরাফ আরবটেকের প্রায় ২৫০০ কর্মীর সঙ্গে তার ক্যাম্পটিতে থাকেন। জায়গাটির নাম সোনাপুর, যার অর্থ বিধাতার ভূমি। এখানকার ২ লাখ লোকসংখ্যার অধিকাংশই অভিবাসী শ্রমিক। রাস্তাঘাট সব নোংরা; শ্রম ক্যাম্পগুলো পাহারা দেয় ব্যক্তিগত নিরাপত্তা প্রহরীরা। কেউ উচ্চবাচ্য করলেই খবর দেয় পুলিশকে। খালেদ নামে (এটিও ছদ্মনাম) বাংলাদেশ থেকে আসা আরেকজন শ্রমিক জানান, তারা পাঁচজন একটি কক্ষে থাকেন; চল্লিশ-পঞ্চাশজন ভাগাভাগি করেন একটি বাথরুম। তার মাসিক আয় মাত্র ১০২ মার্কিন ডলার। দেশে থাকলেই এরচে’ ভালো কামাই করতে পারতেন। তবুও কেনো বিদেশে এসেছেন, এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘দুবাইয়ে কাজের নিশ্চয়তা বেশি। দেশে থাকলে আমি হয়তো এক মাসে হয়তো এরচে’ বেশি আয় করতাম, কিন্তু পরের মাসে যে আবার কাজ খুঁজে পাবো, সে নিশ্চয়তা থাকতো না। তার পরেও আমি মনে করি এখানকার মজুরি আরো বাড়ানো উচিত। ধর্মঘটের বিষয়টিকে আমি সমর্থন করি।’ খালেদ কর্মরত রয়েছেন কনক্রিট মিক্সার হিসেবে।
দাস রাষ্ট্র:ধর্মঘট সমর্থন করলেও অধিকাংশ শ্রমিকই মনে করেন, দুবাইয়ে তারা দেশের চেয়ে বেশি আয় করতে পারছেন। তবে মজুরি আরেকটু বাড়ানো উচিত। পরিবার-পরিজনকে একটু স্বাচ্ছন্দ্যে রাখার স্বপ্ন নিয়েই তারা ভিন দেশে শ্রম বিক্রি করতে আসেন। ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড ইউনিয়ন কনফেডারেশনের সাধারণ সম্পাদক শারান বারো আলজাজিরাকে এ প্রসঙ্গে বলেন, তারা বস্তুত একবিংশ শতাব্দীর দাস রাষ্ট্রে বসবাস করছেন। তাদের দরকষাকষির কোন ক্ষমতা নেই। এটি অমানবিক। অদ্ভুত ‘কেফালা’ পদ্ধতির জন্যই শ্রমিকদের এই অসহায়ত্ব। যে কারণে তারা কোম্পানির অনুমোদন ছাড়া কাজ পরিবর্তন করতে পারে না। পুরো মধ্যপ্রাচ্যে একই অবস্থা। রাষ্ট্র ও কোম্পানিগুলোর শোষণের শিকার বিদেশি শ্রমিকরা। তাদের সাথে বস্তুত অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে।
ফেরারি, আকাশছোঁয়া অট্টালিকা, সাত তারকাবিশিষ্ট হোটেল ও অন্যান্য সম্পদের ঝলকানির জন্য বিখ্যাত সংযুক্ত আরব আমিরাতের ৭৯ লাখ আবাসিক লোকের ২০ শতাংশেরও কম দেশটির নাগরিক। এখানকার নাগরিকত্ব অর্জন করতে চাইলে প্রকৃত বাসিন্দাদের সঙ্গে পিতার দিক থেকে রক্তের সম্পর্ক উপস্থাপন করতে হয়। স্থানীয়রা মনে করে, বিদেশিরা তাদের দেশের চেয়ে বেশি আয় করতে পারে বলেই সংযুক্ত আরব আমিরাতে আসে। এই অভিমত অধিকাংশ অভিবাসী শ্রমিকেরও। দুবাইয়ে রাস্তা পরিষ্কারের কাজে নিযুক্ত বাংলাদেশি শ্রমিক মাহমুদ জামাল বলেন, ‘এটি আমাদের দেশ নয়। দেশের চাইতে তো ভালো রোজগার করতে পারছি এখানে। সবারই এ কথা মনে রাখা উচিত। ধর্মঘটের ফাঁদে পড়ে ভিসা বাতিল হয়ে গেলে আমাদের দুর্দশার সীমা থাকবে না।’
দুবাই মডেল:দুবাই অর্থনৈতিক মডেল সমর্থনকারীদের অভিমত, শ্রমিকদের নিজেদের স্বার্থে সম্মিলিত হওয়ার অধিকার না থাকাটাই তুলনামূলভাবে ভালো। কারণ, এ অধিকার পেলেই তারা কাজের চেয়ে অধিক সময় ব্যয় করবে প্রতিবাদের কাজে। আর তখন এতো বেশি কাজের সুযোগ সৃষ্টি হবে না; ব্যাহত হবে প্রবৃদ্ধি। এতে লাভের চেয়ে ক্ষতিই বেশি হবে। আমদানীকৃত সস্তা শ্রম এবং ইউনিয়ন অধিকার না রাখা দুবাই মডেলের বৈশিষ্ট্য। আরব টেকের কয়েকশ’ শ্রমিককে দেশে ফেরত পাঠিয়ে দিলেও তাদের তেমন ক্ষতি নেই। কেননা তাদের পরিবর্তে দুবাইয়ে আসার লোকের অভাব নেই। চাইলে মাত্র এক সপ্তাহ সময় নিয়েই তাদের স্থান পূরণ করে ফেলা যাবে। এসব যুক্তিতেই দেয়া হচ্ছে না ইউনিয়নের অধিকার।
থিংক-ট্যাংক হেরিটেজ ফাউন্ডেশনের হিসেব অনুযায়ী, সংযুক্ত আরব আমিরাতের বার্ষিক মাথাপিছু আয় ৪৮ হাজার ১৫৮ মার্কিন ডলার। গত ২০ বছরের প্রগাঢ় প্রচেষ্টায় দেশটি পরিণত হয়েছে পর্যটন, রিয়েল এস্টেট ও আর্থিক পরিসেবার তীর্থকেন্দ্রে। কিন্তু আমিরাতি নাগরিক ও পশ্চিমা টেকনোক্রেটদের সঙ্গে তৃতীয় বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসা শ্রমিকদের মজুরির ব্যবধান ক্রমশই বাড়ছে। অনেক শ্রমিকই লেবার এজেন্টদের হাত ধরে সেখানে কাজ করতে আসে ঋণ নিয়ে, বাড়িঘর ও জমিজমা বিক্রি করে। তাদের ভালো থাকার স্বপ্ন হয়তো কোনো দিনই পূরণ হয় না।
