বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলায় বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা এমসিসি’র (মেনোনাইট সেন্ট্রাল কমিটি) তত্ত্বাবধানে ৫টি হস্তজাত প্রকল্প গড়ে উঠেছে। এ প্রকল্পগুলো হচ্ছে- জোবারপাড় এন্টারপ্রাইজ, কালুরপাড় বির্বতন, বড়মাগরা কেয়াপাম, নগরবাড়ি চ্যারিটি ফাউন্ডেশন ও বাগধা এন্টারপ্রাইজ। বর্তমানে ওইসব কেন্দ্রে প্রায় দু’হাজার নারী শ্রমিক কাজ করছে। এদের মধ্যে অধিকাংশ নারী স্বামী পরিত্যক্তা কিংবা সমাজের অবহেলিত অসহায় ও দুঃস্থ। এ সব প্রকল্পে কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে কচুিরপানা,তালপাতা, কেয়াপাতা, মুলিবাঁশ, ছোন, বেত,পাট ও ঘাস। এসব দিয়ে তৈরি হচ্ছে, কাগজ, উন্নতমানের ব্যাগ, এ্যালবাম, বক্স, খেলনা, ওয়ালম্যাটসহ হরেক রকমের সামগ্রী। দেশের সীমানা পেরিয়ে এখানকার উত্পাদিত হস্তজাত শিল্পের পণ্য রফতানি হচ্ছে আমেরিকা, কানাডা, সুইডেন, জাপানসহ উন্নত দেশে। আয় হচ্ছে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা।
জোবারপাড় এন্টারপ্রাইজঃ ১৯৮৪ সালে গড়ে উঠে এ প্রকল্পটি। এখানে হস্তজাত সামগ্রী তৈরির উপকরণ হচ্ছে ডোবা, মজাপুকুর থেকে কচুরিপানা সংগ্রহ করে কাগজ তৈরি করে সেই কাগজ দিয়ে পুতুলবক্স, খেলনাসহ ১৫০টি প্রয়োজনীয় সৌখিন সামগ্রী তৈরি করা হয়।
কেয়াপাম হ্যান্ডিক্রাফটঃ ১৯৮৭ সালে গড়ে তোলা হয় প্রকল্পটি। এ শিল্পের প্রধান কাঁচামাল হচ্ছে- তালপাতা, মুলিবাঁশ, কেয়াপাতা ইত্যাদি। এ প্রতিষ্ঠানে ১০০টির বেশি হস্তশিল্প তৈরি হয়।
বিবর্তনঃ ১৯৯৩ সালে এ প্রকল্পের যাত্রা শুরু। শুরু থেকেই কচুরিপানা প্রধান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহূত হচ্ছে। বর্তমানে এ প্রতিষ্ঠানে ২০০টিরও বেশি শিল্পসামগ্রী তৈরি হয়। এখানে ১৬২ জন নারী শ্রমিক কাজ করছেন। এখানকার সুপারভাইজার নমিতা রায় জানান, কচুরিপানা থেকে কাগজ তৈরির পর তা দিয়ে উন্নত মানের এ্যালবাম, নোটবুক, গিফট বক্স, ব্যাগসহ নানা সামগ্রী তৈরি হচ্ছে। বাগধা এন্টারপ্রাইজঃ ১৯৮৪ সালে এ প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রতিষ্ঠানের তৈরিকৃত সামগ্রীর মধ্যে শন, সুতা, পাট দিয়ে সুতলির ব্যাগ, পার্টস, সাইড ব্যাগসহ ২৭১টি সৌখিন সামগ্রী তৈরি হয়।
চ্যারিটি ফাউন্ডেশনঃ ২০০৪ সাল থেকে প্রকল্পের কাজ শুরু হয়। প্রকল্পটি স্থানীয় কাঁচামাল ঘাস, বাঁশ, বেত, নারিকেল পাতার শলা, শনপাট, কলাগাছের বাকল ইত্যাদি দ্বারা বিভিন্ন হস্তজাত মালামাল তৈরি করে আসছে। এসব প্রকল্পের তৈরিকৃত হস্তজাত সামগ্রী রপ্তানি করা হচ্ছে ইউরোপ-আমেরিকাসহ বিভিন্ন দেশে। তৈরিকৃত সামগ্রী বহির্বিশ্বে ব্যাপক সাড়া ফেলেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। জোবারপাড় এন্টারপ্রাইজে গিয়ে কথা হয় জোবারপাড় গ্রামের মনি বালা (৪০)-র সাথে। মনি বালা বলেন-‘অভাবের সংসারে ছেলেমেয়েকে নিয়ে একসময় অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটাতাম। এমসিসি সমাজের অবহেলিত, স্বামী পরিত্যক্তা, অসহায় ও দুঃস্থ নারীদের জন্য যে মহতী উদ্যোগ নিয়ে ৫টি প্রকল্পের মাধ্যমে কাজ করে যাচ্ছে তাতে করে আমার মতন শত শত স্বামী পরিত্যক্তা, অসহায় ও দুঃস্থ নারীরা এসব প্রকল্পে কাজ করে বিভিন্ন অনুষ্ঠানের উপহার ও বাহারী খেলনা সামগ্রী তৈরি করে আজ তিনবেলা খেতে পারি। বিধবা বীণা হালদার (৪৫) ও বিধবা শিঁউলি বেগম (৩০) বলেন, ‘আমরা যেসব জিনিস তৈরি করছি। সেগুলো দিয়ে দীর্ঘদিন থেকে দেশ-বিদেশের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের জমকালো উপহার, বাহারী খেলনা সামগ্রী অফিস-বাসাবাড়ির সৌন্দর্যবর্ধনের কাজে ব্যবহার হয়ে আসছে।
কালুরপাড় বিবর্তন প্রকল্পের ম্যানেজার সজল কুমার দত্ত জানান, সচেতনভাবেই আমরা সবকিছুকে সাদামাটা, টেকসই করে বানাই এবং কম প্রযুক্তি ব্যবহার করি। কচুরিপানা থেকে কাগজ তৈরি করে সেই কাগজ দিয়ে তৈরি করা হয় নানা উপহার সামগ্রী। রপ্তানিকারক দেশগুলোর মধ্যে আমেরিকা, জাপান, সুইজারল্যান্ড, নেদারল্যান্ডসহ ২০টি দেশে রপ্তানি হয়। এসব প্রকল্প থেকে বছরে ২০ কোটি টাকার পণ্য বিদেশে রপ্তানি হচ্ছে। এ প্রকল্পে ১জন নারী শ্রমিক ৮ঘন্টা পরিশ্রম করে মাসে ২-৩ হাজার টাকা আয় করছেন। এছাড়াও প্রতিবছর তাদের প্রকল্পর অনুকূলে কাজের লভ্যাংশ প্রদান করা হয়। এতে একদিকে যেমন তারা স্বাবলম্বী হচ্ছেন তেমনি অন্যদিকে দেশ প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করছে।
