বরিশালের আগৈলঝাড়ার গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ১২০ বছর পূর্ণ হয়েছে। এ অঞ্চলের সবচেয়ে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপিঠ হচ্ছ গৈলা হাইস্কুল। স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সাবেক মন্ত্রী শহীদ আব্দুর রব সেরনিয়াবাত ও প্রয়াত মন্ত্রী সুনীল কুমার গুপ্ত, সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ব্রিগেডিয়ার এম.এ মালেক (অবঃ), সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, দৈনিক সমকালের সহযোগী সম্পাদক অজয় দাশ গুপ্ত, প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ অমীয় দাশগুপ্ত, কলকাতার বেথুন কলেজের প্রিন্সিপাল তটিনী গুপ্তা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দু’বার পিএইচডি ডিগ্রী অর্জনকারী সুরেন্দ্র নাথ গুপ্ত, সচিব আব্দুল মান্নান হাওলাদারসহ অসংখ্য কৃতীমান ও কীর্তিময় ব্যক্তির স্মৃতিবিজড়িত গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এ ছাড়াও বর্তমানে দেশ-বিদেশে কর্মরত অসংখ্য গুণী ব্যক্তি ছিলেন গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। গত ২৩ জানুয়ারি গৈলা হাইস্কুলের ১২০ বছর পূর্তি উত্সব পালিত হয়েছে। ২০০৮ সালে গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়টি মডেল হাইস্কুলে রূপান্তরিত হয়েছে। বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, এলাকার প্রতিটি ঘরের ছেলে-মেয়েদের শিক্ষিত করে গড়ে তোলার জন্য ১৮৯৩ সনের ২৩ জানুয়ারি ফুলশ্রী গ্রামের শিক্ষানুরাগী কৈলাশ চন্দ্র সেন প্রথমে গৈলা কালুপাড়া গ্রামের ঐতিহ্যবাহী দাসের বাড়িতে বিদ্যালয়টির কার্যক্রম শুরু করেন।্ পরবর্তীতে শিক্ষার্থী বৃদ্ধি পাওয়ায় দাসের বাড়ির সম্পত্তির ওপরেই বর্তমান স্থানে স্কুলটি স্থানান্তর করা হয়। গৌরনদী-গোপালগঞ্জ সড়কের পার্শ্ববর্তী আগৈলঝাড়ার গৈলা নামক স্থানে বর্তমানে এ বিদ্যালয়টির অবস্থান। এ বিদ্যালয়টি এতদাঞ্চলের সর্বপ্রথম মাধ্যমিক পর্যায়ের স্কুল। দাসের বাড়ির সেই বিদ্যালয়টি আজ অত্র এলাকার শ্রেষ্ঠ বিদ্যালয়ে রূপান্তরিত হয়েছে। স্কুলের পার্শ্বেই রয়েছে ১৯৭১ সনের মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন সময় দক্ষিণাঞ্চলে সড়কপথে সর্বপ্রথম সম্মুখযুদ্ধে নিহত শহীদ সিপাহী আলাউদ্দিন ওরফে আলা বক্সের সমাধিস্থল। ষষ্ট থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত এ বিদ্যালয়ে বর্তমানে দেড় হাজার ছাত্র-ছাত্রী অধ্যয়নরত রয়েছে। আর তাদের পাঠদানের জন্য নিয়োজিত রয়েছে ৩৭ জন শিক্ষক-শিক্ষিকা ও কর্মচারী। দীর্ঘদিন থেকে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রতিবছর অষ্টম শ্রেণীর জেএসসি ও এসএসসি পরীক্ষায় গোল্ডেন জিপিএ-৫ সহ আশাব্যঞ্জক ফলাফল করে কৃতিত্ব অর্জন করে আসছে। প্রতিবছর মেধাবী শিক্ষার্থীদের মাঝে সৈয়দ আবুল হোসেন ট্রাস্টের পক্ষ থেকে বৃত্তি প্রদান করা হয়। ১২০ বছর হাঁটি হাঁটি পা পা করে এ বিদ্যালয়টি গোটা জেলার মধ্যে একটি আদর্শ বিদ্যাপীঠ হিসেবে সুনাম অর্জন করেছে। পাঠদানে শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে ২০০৮ সালে বিদ্যালয়টি মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয় হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করেছে। সূত্রে আরো জানা গেছে, এ বিদ্যালয় থেকে পাস করে অনেক শিক্ষার্থী দেশে-বিদেশে প্রচুর সুনাম অর্জন করেছেন। ১৮৯৩ সনে গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় চালু হবার পর ওইসময় অনেক শিক্ষার্থীরা বরিশাল বিএম বিদ্যালয় থেকে গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছিলেন। গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান শিক্ষক ছিলেন ফুলশ্রী গ্রামের কৈলাশ চন্দ্র সেন। তিনি বিএ পাস করে সরকারি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকরি পেয়েছিলেন। কিন্তু অবহেলিত গৌরনদী-আগৈলঝাড়ার জনপদের মানুষের শিক্ষার কথা ভেবে তিনি সরকারি চাকরি ছেড়ে প্রধান শিক্ষকের পদ গ্রহণ করেছিলেন। দীর্ঘ ৩৭ বছর স্কুল পরিচালনার কাজ করে তিনি অবসরগ্রহণ করেন। গৈলা মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার পরে শিক্ষা-দীক্ষায় গৈলার খ্যাতি ভারত বর্ষসহ বিশ্বের সর্বস্তরের মানুষের কাছে ছড়িয়ে পড়ে। এ স্কুলের খন্ডকালীন সময়ের ছাত্র ছিলেন স্বাধীনতার স্থপতি, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, সাবেক মন্ত্রী আব্দুর রব সেরনিয়াবাত, মন্ত্রী সুনীল কুমার গুপ্ত, ব্রিগেডিয়ার এম.এ মালেক (অবঃ), সাবেক যোগাযোগ মন্ত্রী সৈয়দ আবুল হোসেন, দৈনিক সমকালের সহযোগী সম্পাদক অজয় দাশ গুপ্ত। ওই স্কুলের ছাত্রী তটিনী গুপ্তা কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে এন্ট্রান্স পরীক্ষায় গৈলা হাইস্কুল থেকে দ্বিতীয় স্থান লাভ করেন। পরবর্তীতে তিনি পড়াশুনায় সমান কৃতিত্ব দেখান। তিনিই এতদাঞ্চলের প্রথম মহিলা গ্রাজুয়েট ছিলেন। কর্মজীবনে তিনি কলকাতার বেথুন কলেজের প্রিন্সিপাল হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। গৈলা স্কুলের আরেক প্রাক্তন ছাত্র সুরেন্দ্রনাথ গুপ্ত ১৯২০ সনে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ও ১৯২২ সনে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে দু’বার পিএইচডি ডিগ্রী অর্জন করেন। এ এলাকায় তিনিই প্রথম পিএইচডি ডিগ্রিধারী ব্যক্তি। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় তার লেখা ভারতীয় দর্শনের ইতিহাস ৫টি খন্ডে প্রকাশ করা হয়েছিলো। বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মোঃ জহিরুল হক এ প্রতিনিধিকে জানান, গৈলা স্কুলের প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন দেশে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ারসহ বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এ অঞ্চলের শিক্ষা-দীক্ষায় গৈলা স্কুল তার ঐতিহ্য এখনও ধরে রেখেছে।
